শয়তানের বন আওকিগাহারা : সবুজেঘেরা আত্মহননের ভয়ানক এক বন
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : প্রতিবছর এই বন থেকে গড়ে ৫০টি মৃতদেহ পাওয়া যায়

ভাবুন তো আপনি হেঁটে যাচ্ছেন চমৎকার নিবিড় সবুজ একটি বনের মাঝখান দিয়ে। নির্জনতা যেখানে খুব গাঢ়। চারপাশে শুধু ঘন গাছের সারি। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখতে পেলেন গাছে ঝুলে আছে লাশ। সেসময় গাঁ শিউরে উঠলে আপনার ভেতরে কেমন অবস্থা হবে? ভাবতেই হৃদয় কেঁপে উঠছে তাই না? এমনই প্রচণ্ড ভয়ানক দৃশ্যের দেখা মিলে আওকিগাহারা (Aokigahara) বনে। আত্মহত্যার বন হিসেবে পরিচিত জাপানের আওকিগাহারা বন এক ভয়ানক জায়গা। যেখানে মানুষ যায় তার জীবনের ইতি টানতে। জাপানের হনশু দ্বীপের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ফুজি পর্বতমালার পাদদেশে এই বনটি অবস্থিত। এর আয়তন ৩০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি। এই বনটিকে 'সি অফ ট্রিজ' বা 'গাছের সমুদ্র' বলা হয়ে থাকে।
আবার কেউ কেউ ডাকেন 'শয়তানের বন' বলে। নিবিড় এই বন হৃদয় কাঁপানোর মত পরিবেশ বিরাজ করে। এই বনটিতে নেই কোনও বন্যপ্রাণীর বসবাস। তাই এখানে পরিবেশটা খুব বেশি নির্জন। সবুজের সমারোহের পা ফেলতেই এক ধরনের লোমহর্ষক পরিবেশের অনুভব হয়। প্রকৃতির এই সুন্দরের বেড়াজালে নির্মমতার অজানা আভাস পাওয়া যায়। এখানকার জানা-অজানা গাছগুলো খুব নিবিড়ভাবে একটি আরেকটির সাথে দাঁড়িয়ে আছে। দুর্গম পাথুরে পথ আর ঘন গাছপালার কারণে পথ হারাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি। বনটিতে ঢুকতেই অজানা শিহরণে গায়ে কাঁটা দেয়। এখানকার থমথমে পরিবেশ অজানা এক ভয়ের উদ্রেক করে। সবুজের এই নিবিড় সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে শেষ করে দিতে এখানে আসেন আত্মহনন কারীরা। এই বনটি আত্মহত্যার জন্য একটি জনপ্রিয় জায়গা। এখানে আঁধার আর মৃত্যুর নিবিড় আলিঙ্গন। বিশ্বে আত্মহত্যার স্থান হিসেবে আওকিগাহারা বনের অবস্থান দ্বিতীয়।
এই বনে ঢুকতেই চোখে পড়বে হৃদয়বিদারক সব সাইনবোর্ড। যার একটিতে লেখা আছে, 'আরেকবার চিন্তা করুন, পরিবারের কথা ভাবুন, ব্যর্থতাই জীবনের শেষ নয়'। এই বানীগুলোকে উপেক্ষা করেই প্রতিবছর এখানে অসংখ্য মানুষ আসেন জীবন থেকে ছুটি নিতে। কে জানে কোন হতাশায়, কোন তীব্র কষ্টে এখানে মানুষগুলো আসে জীবনের ইতি টানতে। এই বনের ভেতরে প্রবেশ করলে আত্মহত্যাকারীদের ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। বনের গভীরে দেখা যায় ঝুলে থাকা লাশ। গাছের ডালে ডালে দেখা যায় ফাঁসির দঁড়ি। আত্মহত্যা করার আগে অনেকেই এখানে তাঁবু খাটিয়ে কিছুদিন অবস্থান করেন। এরপর হয়ত অবশেষে সিদ্ধান্ত নেন পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার। আবার যারাই এই বনের মধ্যে প্রবেশ করেন তারা রঙিন ফিতা চিহ্ন হিসেবে গাছগুলোর গায়ে বেঁধে দেন যাতে পথ হারিয়ে না ফেলেন। তবে রহস্যময় বিষয় হল অনেকেই ফেরার সময় গাছে বাঁধা এই ফিতাগুলো আর খুঁজে পান না। এই ঘটনার পেছনের কারণ কেউই খুঁজে পান নি আজও। স্থানীয়রা মনে করেন, এখানে যারা আত্মহত্যা করে তাদের আত্মারা এই ফিতাগুলোকে সরিয়ে ফেলে যাতে এখানে আগতরা পথ হারিয়ে ফেলে।

ষাটের দশক থেকে এই বনে কত মানুষ যে আত্মহত্যা করেছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। ২০০২ সালে এই বনে ৭৮টি মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৩ সালে পাওয়া যায় ১০০টি মৃতদেহ। ২০০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৮-এ। ২০১০ সালে ২৪৭ জন ব্যক্তি এখানে এসে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন এবং ৫৪ জন অবেশেষে আত্মহত্যা করেন । এই আত্মহত্যার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছেই, কমছে না মোটেই। প্রতিবছর এই বন থেকে গড়ে ৫০টি মৃতদেহ পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালের পর থেকেই পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতি বছর এই বনে একবার করে মৃতদেহের সন্ধান করেন। এই বনে আত্মহত্যা শুরুর পেছনে কিছু বিষয়ের প্রভাব রয়েছে। ১৯৬০ সালের কথা। সেইচো মাতসুমোতোর নামের এক জাপানি লেখক 'কুরোই জুকাই' নামে একটি উপন্যাস বের করেন।
প্রকাশিত হওয়ার পর এটি দারুণ জনপ্রিয় হয় জাপানে। উপন্যাসটিতে প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসার করুণ সমাপ্তি ঘটে এই আওকিগাহারা বনে। গল্পটিতে এই বনে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই উপন্যাসটি সেই সময়ে জাপানিদের মনে বেশ প্রগাঢ় প্রভাব ফেলেছিল। এই উপন্যাসটি পড়ে অনেক যুবক-যুবতী প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এই জঙ্গলে এসে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। সেসময় এই বনে অনেক যুগলের লাশ গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এরপর ১৯৯৩ সালে আরেকজন জাপানি লেখক ওয়াতারু তসুরুমুই 'দ্য কমপ্লিট সুইসাইড ম্যানুয়াল' নামে একটি বই প্রকাশ করেন। এই বইটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিতর্কিত এই বইটি বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকাতে চলে আসে খুব সহজেই। বহুল পঠিত এই বইটিতে আত্মহত্যার নানা উপায় বর্ণনা করা হয়েছে। এই বইটিতে আওকিগাহারা বনকে আত্মহত্যার জন্য খুবই উপযুক্ত জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বইটিতে এভাবে বলা হয়েছে যে, এই বন আত্মহননের এক সহজ পথ। এই বনে গিয়ে সবুজের মধ্যে হারিয়ে যাও। তারপর কোনও গাছে দঁড়ি বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ো।

এরপর আস্তে আস্তে সবুজের মাঝে মিশে গিয়ে নিজেকে সমর্পণ করো প্রকৃতির কাছে। এই লেখায় প্রভাবিত হয়ে অনেকেই এই বনে আসত আত্মহত্যা করতে। কেউ গলায় ফাঁসি দিয়ে ঝুলে পড়ত আবার কেউবা পথ হারিয়ে না খেয়ে মারা যেত এই বনের মধ্যে। তাদের অনেকেরই মৃতদেহের পাশে তসুরুমুইয়ের এই বইটি পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। এই বনটিকে নিয়ে জাপানে অনেক মিথ প্রচলিত আছে। স্থানীয়দের মতে, এই বনে আত্মহত্যার শুরু হয় অনেক বছর আগে থেকেই। সেসময় জাপান এখনকার মতো এত সম্পদশালী দেশ ছিল না। এই দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্ভিক্ষ হতো। অনাহারে মারা যেত অনেকেই। সেসময় অনেক পরিবার অনাহারের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের এই বনে ফেলে আসতো।
যাদের বনে রেখে আসা হতো তারা না খেয়ে এই বনের মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেত। তাই স্থানীয়রা বিশ্বাস করে এই মানুষগুলোর অতৃপ্ত আত্মারা ঘুরে বেড়ায় এই বনে। তারাই এখানে আগতদের প্ররোচিত করে আত্মহত্যা করতে। এ আত্মহত্যার প্রবণতার পেছনের মূল কারণ জানতে গবেষকরা চেষ্টা করে আসছেন অনেক বছর ধরে। যদিও এখন পর্যন্ত তারা কোনও শক্ত-পোক্ত কারণ উদঘাটন করতে পারেননি। আত্মহত্যার কারণ যেটাই হউক তবে এটি সত্যি যে সমৃদ্ধ দেশ জাপানে আত্মহত্যার প্রবণতা খুব বেশি। প্রতিবছর এই দেশটিতে গড়ে ৩০ হাজারের বেশি লোক আত্মহত্যা করে থাকে । আর এই সংখ্যা প্রতিবছর বেড়েই চলছে। বিখ্যাত এই বনটিকে ঘিরে দেশ বিদেশের মানুষের আগ্রহের শেষ নেই।
বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এই বনে ঘুরতে আসেন। সাহসী পর্যটকরা এডভেঞ্চারের জন্য বনের মাঝে তাঁবু গেড়ে রাত্রিযাপন করেন। আবার অনেকে তার ভিডিও ধারণ করেন ইউটিউবে প্রচার করার জন্য। এই বনকে ঘিরে অনেক ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে চলচ্চিত্রও। ২০১৫ সালে 'দ্য সি অফ ট্রিস' নামে একটি মুভির শুটিং হয় এই বনে। তার পরের বছর 'দ্য ফরেস্ট' নামে আরও একটি মুভি এই বনকে নিয়ে নির্মাণ করা হয়। এছাড়া আরও অনেক বই এই বনকে ঘিরে লেখা হয়েছে। আলোচিত রহস্যময় এই বনটি তাই সাহসী পর্যটকদের জন্য দারুণ এক রোমাঞ্চের জায়গা। চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন গা ছমছমে এই বন থেকে। তবে যতই সাহসী হউন না কেন এই বনে প্রবেশের পর গা শিউরে ওঠাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বনের মাঝে আত্মহত্যা করা মানুষগুলোর পড়ে থাকা জুতো, ব্যাগ, কাপড়-চোপড়, ক্যাপ, ঘড়ি, তাঁবু, দঁড়ি ইত্যাদি দেখলে ভয় এবং বিষাদগ্রস্থতা যেকারো উপরই ভর করবে।
রুবাইদা আক্তার এস এম