ছবির মতো সুন্দর, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইতালির সিনকে তেরে। ছবি : ব্রিটানিকা
ইতিহাস, সভ্যতা, খাবার, ঐতিহ্য, ক্রীড়া! কি নেই ইতালিতে! পিজ্জার স্বাদে মোহিত হতে চান? ঘুরতে চান ভেনিস, ফ্লোরেন্সের মত ইতিহাসের অলিগলিতে? দেখতে চান অসাধারণ ফুটবল কিংবা ঘোড়দৌড়? সবই পাবেন ইতালির মাঝে।
সভ্যতার একেবারে শুরুতেই যাদের উদ্ভব আর বিকাশ। পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্য যেখানে বীজ বুনেছিল। এটা সেই দেশ। এখানে ধর্মের, চিত্রের আর ইতিহাসের বহু দ্বন্দ্বও ঘটে গিয়েছে।
একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৫৫টি বিশ্ব ঐতিহ্যের অধিকারী ইতালি। ইতালির সেই ৫৫টি স্থান থেকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু এবার দেখা যাক।
পুরো রোম শহরকেই বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। ছবি : কন ট্রাভেল
রোম
রাজধানী থেকেই বরং শুরু করা যাক। ইতালির সবচেয়ে দর্শনীয় শহর কিংবা সভ্যতার সূতিকাগার বলেই না, রোমের পথে-প্রান্তরে যে বিপুল পরিমাণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য জমা রয়েছে তা বর্ণনা করা বেশ কঠিন।
প্রতিবছর প্রায় ৪ মিলিয়ন পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত থাকে রোম। এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করা হয় এমন তালিকাতেও বেশ উপরেই আছে রোম।
এর পিছনে কারণটাও সোজা। রোমের রাস্তায় এতবেশি ইতিহাসের ছড়াছড়ি যে, ইউনেস্কো আলাদা স্বীকৃতির বদলে পুরো রোম শহরকেই ঠাঁই দিয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। এরমাঝেও আলাদা করে বলতে হয় রোমান কলোসিয়াম নিয়ে।
রোমান সভ্যতার আইকনিক কলোসিয়াম। ছবি : উইকিপিডিয়া
কলোসিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছিল মূলত নিরো-র রাজপ্রাসাদের জায়গায়। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকে এর কাছেই নিরোর একটি বিশালাকার ব্রোঞ্জের মূর্তি নির্মিত ছিল। কলোস্যিয়ামটিতে প্রায় ৮০টি প্রবেশপথ রয়েছে।
এটি বিনোদনের একটি ক্ষেত্র হিসাবেও ব্যবহৃত হত, এর মধ্যে প্রাচীন রোমের মল্লযোদ্ধাদের (গ্ল্যাডিয়েটর) ও পশুর লড়াই, সর্বসাধারণের মৃত্যুদন্ডও অন্তর্ভূক্ত রয়েছে।
এরিনা বা মল্লভূমিতে বালির সঙ্গে প্রলিপ্ত এক বিশাল কাঠের মেঝে ছিল। অন্তর্ভৌম প্রস্থান পথটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সুড়ঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত, যা রঙ্গভূমিতে লড়াইয়ের জন্য ব্যবহৃত বন্য জন্তু-জানোয়ারদের প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হত।
রোমের ক্যাথিড্রালের অভ্যন্তরীণ দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত
ভেনিস
এটিকে বলা চলে জলে ভাসা এক স্বপ্ননগরী। পৃথিবীর সবচেয়ে রোমান্টিক জায়গা হিসেবেও ভেনিসের সুখ্যাতি রয়েছে। চারটি সেতু দ্বারা বিস্তৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খাল গ্রান্ড ক্যানাল (বৃহত্তম খাল) সহ এখানে ১৫০টিরও অধিক খাল রয়েছে যেগুলো এই শহরজুড়ে পরিবহন করার প্রধান মাধ্যম।
এটি ভেনিসের গুরুত্বপূর্ণ 'স্ট্রিট' নামে পরিচিত এবং পর্যটকরা গ্রান্ড ক্যানাল-এ পরিভ্রমণ করলে, এটি সম্বন্ধে বেশী জানার সুযোগ পায়। কিছু কিছু সেতু যেমন 'ব্রিজ অফ সাই' বেশ বিখ্যাত।
ভাসমান ভেনিস। ছবি : ব্রিটানিকা
ভেনিসের এই খালগুলো পরিবহনের একটি প্রধান মাধ্যম হওয়ায় হয়তো জলপথ হিসেবে ঘিঞ্জি মনে হতে পারে। তবে নৌকার আকারের কারণেই এই ভ্রমণে আলাদা মাদকতা আছে।
ভেনিসের এই খাল ইউরোপের সেরা আকর্ষণ এবং এই শহরের সৌন্দর্য এবং স্বতন্ত্রতা অন্বেষণ করার একমাত্র উপায় হল এই খালের মধ্যে দিয়ে নৌকা সফর।
ঐতিহ্যগত ভেনিসীয় রোয়িং নৌকা গন্ডোলা ভেনিসে অত্যন্ত প্রচলিত, তবে বর্তমানে এসব প্রতিযোগিতা ও পর্যটকদের বহন করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার পর্যন্ত এই ভেনিসের প্রতি বিমোহিত হয়ে বেশ কিছু অমর কীর্তি রেখে গিয়েছিলেন। যার মাঝে মার্চেন্ট অফ ভেনিস বেশ বিখ্যাত।
গ্রান্ড ক্যানাল। ছবি : ব্রিটানিকা
ফ্লোরেন্স
ইতালি নিয়ে কথা হবে, অথচ ফ্লোরেন্সের নাম থাকবে না এটি ভাবাটাও বেশ কষ্টকর। বিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্ম এই শহরেই। ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূচনাও ছিল এই শহর থেকেই।
ফ্লোরেন্সের খ্যাতি আর ঐতিহ্য নিয়ে লিখতে বসলে সম্ভবত গোটা একটা উপন্যাসই করা যাবে। তাই শহরের বর্ণনা দিতে এক শব্দে বলা যায় 'অতুলনীয়'।
রেনেসাঁর শহর ফ্লোরেন্স। ছবি : সংগৃহীত
মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ভুবন বিখ্যাত ডেভিড এর মত রেপ্লিকা কিংবা গ্যালারিয়া দেল আকাদেমিয়ার অনন্য স্থাপনা... কি নেই ফ্লোরেন্সে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, চিত্রকলা, দার্শনিকতা! সবই যেন মিলেমিশে আছে এই ফ্লোরেন্সে।
ইতালির সবচেয়ে বিখ্যাত গ্যালারিয়া ইউফিজি কিংবা ফ্লোরেন্স ক্যাথিড্রালের মাঝে থাকা অগণিত ফ্রেসকো পৃথিবীর ইতিহাসের বড় অংশ।
রেনেসাঁর শহর ফ্লোরেন্স। ছবি : পিন্টারেস্ট
পম্পেই
ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলতে গেলে সবসময় আক্ষেপ জাগে, সময়ের সাথে সবই বদলে যায় বলে। কিন্তু ইতালির পম্পেই নগরী হয়ত একমাত্র স্থান যা একইরকম আছে প্রায় ২,১০০ বছর ধরে।
প্রকৃতি সময়ে সময়ে নির্মম হয়। তার এক জলজ্যান্ত সাক্ষী পম্পেই নগরী। আগ্নেয় পর্বত ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরির কারণে খ্রিস্টপূর্ব ৭৯ সালে এই শহরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এবং শহরের প্রায় ২,০০০ অধিবাসী চাপা পড়েন আগ্নেয়গিরির লাভায়।
পম্পেই, ইতালি। ছবি : উইকিপিডিয়া
শহরটি এরপর পরিত্যক্ত ছিল অনেকটা সময়। ১৭৪৮ সালে কয়েকজন গবেষক প্রথম একে আবার সামনে নিয়ে আসেন। এবং এরপর থেকেই এটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর গবেষণার এক অন্যতম দিক হয়ে আছে। আর কোন শহরের পক্ষে এই স্বাদ দেয়া সম্ভব নয়, যা একটি মৃত নগরী পম্পেই আপনাকে দিতে সক্ষম।
আমাল্ফি উপকূল। ছবি : সংগৃহীত
আমাল্ফি উপকূল
ইতালি ভাষায় এর নাম কোস্টিয়েরা আমালফিতানা। বিখ্যাত সালেরনো প্রদেশে অবস্থিত আমালফি উপকূল সোরেন্টাইন উপদ্বীপের দক্ষিণে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
আমালফি গ্রামের একটি সম্প্রদায় এই উপকূলকে গ্রামের নামানুসারে আমালফি নাম দিয়েছে। যদিও জেনে রাখা দরকার, সোরেন্টো আমালফি উপকূলের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এই উপকূল বরাবর হাঁটাকালীন উপকূলের অত্যাশ্চর্য দৃশ্য এবং লেবু গাছের সুবাস আপনাকে মুগ্ধ করে তুলবে। সমগ্র এলাকার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বলা চলে এখানকার লেবু উৎপাদনকে।
এমনকি পর্যটক দোকানগুলোও লেবুর বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে। আমালফি উপকূল যাবার সৌভাগ্য যদি হয়েই থাকে, তবে মিষ্টি লিমনসেলো লেবু পানি পান করতে ভুলবেন না।
আমাল্ফি উপকূল, ইতালি। ছবি : কন্দে দে ট্টাভেল
দর্শকরা দিগন্ত ও ভূমির মিলিত ঐন্দ্রজালিক দৃশ্য উপভোগ করতে এই উপকূলের চারপাশে পায়ে হেঁটে ঘুরতে পারেন। এই সমুদ্রের খাড়া ঢালে পা ডুবে যায়।
সমুদ্রের মধ্যে বালির সংকীর্ণ অঞ্চল প্রসারিত বলে সাতারের জন্য আমালফি কখনোই খুব একটা উপযোগী নয়। আরেকটি কারণ হল গ্রামের এই সৈকত ছোট এবং পাথুরে।
এখানকার ঘর বাড়ির নম্বর প্লেটগুলিও লেবু দিয়ে সুসজ্জিত করা। আমালফি যাবার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় নভেম্বর মাস। কারণ সে সময়েই মূলত ঘরে ঘরে লেবু তোলা হয়। যা রীতিমতো এক উৎসব।
আমাল্ফি উপকূলের বিখ্যাত লেবু। ছবি : সংগৃহীত
দ্য লাস্ট সাপার
এটি কোন স্থান নয়, তবে এটি এমন কিছু যা সারা বিশ্বকে শতাব্দীর পর শতাব্দী মুগ্ধ করেছে, ভাবিয়েছে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বিক্রিত বই দ্য ভিঞ্চি কোডের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে 'দ্য লাস্ট সাপার'।
দ্য লাস্ট সাপার একটি চিত্রকর্ম। এটি করেছেন বিখ্যাত চিত্রকর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। ১৪৯৫-৯৬ সাল নাগাদ এটি আঁকা হয় বাইবেলের গসপেল অফ জনের অনুসারে।
যেখানে ক্রুশবিদ্ধ হবার আগে যীশু খ্রিস্টের সবশেষ খাবার গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। আর এই খাবারের সময় তার সাথে ছিলেন তার অনুসারীরা।
দ্য লাস্ট সাপার। ছবি : পিন্টারেস্ট
যাদের মধ্যে অন্যতম ম্যারি মাগদালিন। ম্যারি মাগদালিনের এই চিত্রের অবস্থান খ্রিস্ট ধর্মের এক পুরাতন এবং অবিচ্ছেদ্য দিকও তুলে ধরে। বর্তমানে দ্য লাস্ট সাপার চিত্রকর্ম রয়েছে মিলানের সান্তা মারিয়া দেল্লে গ্রাজিতে। এবং এটি দেখতে আপনাকে বেশ আগেভাগেই বুকিং দিতে হবে।
আগেই যেমনটি বলা হয়েছে, ইতালিতে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই। সাসি দি মাতেরা, রাইটিয়ান রেলওয়ে কিংবা আলবেরোবেলো এমনকি পিসার হেলানো মিনারের মত অনেক দর্শনীয় স্থানে ভরপুর পশ্চিম ইউরোপের দেশ ইতালি। ইউরোপ ভ্রমণের ইচ্ছে যদি আসলেই থাকে, তবে ইতালি হতে পারে আপনার প্রথম পা রাখার জায়গা।