হাজার বছরের নিদর্শন ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ
ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ। ছবি : সংগৃহীত
ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া মহকুমা থেকে কালের পরিক্রমায় আজকের চুয়াডাঙ্গা জেলা। এই সুদীর্ঘ সময় এখানে স্থাপিত হয়েছে নানান স্থাপনা। যেগুলো পরবর্তীতে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন রূপে চিহ্নিত হয়েছে। আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রামের ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ তেমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। কথিত আছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া (কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা)-এর প্রথম মসজিদ এটি। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রথম সহস্রাব্দের কোনো একসময়ে হযরত খাইরুল বাশার ওমজ (রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু) ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা আসেন। ঘোলদাড়ী গ্রামে তিনি স্থায়ীভাবে আস্তানা গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসারের কাজ শুরু করেন। এক সময় তিনি গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং আনুমানিক ১০০৬ (বাংলা ৪১৩) সালের দিকে ঘোলদাড়ী গ্রামে ঘোলদাড়ী জামে মসজিদ নির্মাণ করেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির নদীয়া বিজয়ের অনেক আগেই ঘোলদাড়ী মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। হযরত খাইরুল বাশার ওমজ (রহঃ)-এর মৃত্যুর পর তাকে মসজিদের পাশেই সমাহিত করা হয়। উনিশ শতকে গ্রামে একবার আগুন লাগলে গ্রামবাসী অন্যত্র সরে যায়। যার ফলে ধীরে ধীরে মসজিদটি গভীর জঙ্গলে ঢেকে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে জঙ্গল পরিষ্কার করে মসজিদটি আবারও নামাজ আদায়যোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। সেই থেকে এখনও নিয়মিত মসজিদটিতে নামাজ আদায় করা হচ্ছে। পরবর্তীতে একাধিকবার সংস্কারের ফলে মসজিদটির অসাধারণ নির্মাণশৈলী কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং এর সামনের অংশ কিছুটা বর্ধিত করায় এর প্রাচীন রূপ বুঝতে সামান্য অসুবিধা হয়। এছাড়া, বর্তমানে মসজিদের চারপাশে গাছপালা বড় হয়ে যাওয়ায় এক নজরে পুরো মসজিদটি নজরে আসে না। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটির নির্মানশৈলী অসাধারণ। এটি স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। মসজিদের ওপর চারটি ছোট ছোট মিনার রয়েছে।
ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ দিকে জানালা এবং দু-পাশে দুটো দরজা রয়েছে। মসজিদের গাঁথুনির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ইট, টালি এবং চুন-সুরকি। এছাড়া মেহরাবে রয়েছে ৬টি কুঠোরি। মসজিদের দেয়ালগুলোতে রয়েছে লতা পাতা ফুলের অসাধারণ কারুকাজ। চমকপ্রদ একটি তথ্য হলো, মসজিদের গাঁথুনির সময় চুন-সুরকির সাথে মুসুরির ডাল মেশানো হয়েছিল। তবে দুঃখজনক হলো মসজিদটির শিলালিপি বর্তমানে প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। মসজিদের ভেতরে ২ কাতার এবং বাইরে ৩ কাতার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত
মসজিদের অনন্য স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী দেখে ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন যে, মসজিদটি ১০০৬ সালের দিকে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক পর্যটক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ দেখতে আসেন। কেউ কেউ মানতের উদেশ্যেও আসেন। হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রামে এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ।
কীভাবে যাবেন : বাংলাদেশের রংপুর ও রাজশাহী বাদে বাকিসব বিভাগীয় শহর থেকে সরাসরি চুয়াডাঙ্গা যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল হতে প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যানার এর বাস ছেড়ে যায় চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে। মানভেদে এগুলোর ভাড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। চুয়াডাঙ্গা এক্সপ্রেস, পূর্বাশা, শ্যামলী পরিবহন,স্কাই লাইন তেমনই কয়েকটা পরিবহন। ট্রেনে করেও সহজেই ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়া যায়। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া চিত্রা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন চুয়াডাঙ্গা হয়েই খুলনা যায়। এক্ষেত্রে চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত যেতে ট্রেনের শ্রেণিভেদে খরচ পড়বে প্রায় ৩৫০-৭০০। চুয়াডাঙ্গা এসে ওখান থেকে বাসে বা ট্রেনে যেতে হবে আলমডাঙ্গা। সেখান থেকে রিকসা বা ভ্যানে করে ঘোলদাড়ী বাজার। ঘোলদাড়ী বাজার থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদ।
থাকার ব্যবস্থা: ঘোলদাড়ী শাহী মসজিদের আশেপাশে ভালো মানের তেমন আবাসিক হোটেল নেই। এক্ষেত্রে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরত আসতে হবে চুয়াডাঙ্গায়। চুয়াডাঙ্গাও কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে যা বেশ সাধারণ মানের। এগুলোর খরচ মানভেদে ১ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যেই। উল্লেখযোগ্য কিছু হোটেল হলো প্রিন্স হোটেল, হোটেল অবকাশ, হোটেল সোনার বাংলা, সানড্রিয়াল হোটেল ইত্যাদি।
খাওয়া-দাওয়া : খাওয়া-দাওয়ার জন্য ঘোলদাড়ী বাজারে কিংবা আলমডাঙ্গায় সাধারণ মানের কিছু খাবার হোটেল রয়েছে। তবে ভালো রেস্টুরেন্ট বা খাবার হোটেলে খেতে চাইলে চলে আসতে হবে চুয়াডাঙ্গার কলেজ রোডে। কলেজ রোডে ভালো মানের কিছু রেস্টুরেন্ট ও হোটেল রয়েছে।