নয়নাভিরাম সোনাইছড়িতে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : 'সরু গুহার ভেতর সাঁতরে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে সবার চোখ চড়কগাছ'

দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ 

আমি ভালো নাইরে। আমি ভালো নাই। আমার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণের সংগঠন দে-ছুট এর বন্ধুরাও ভালো নেই। আমি ভালো নাই কারণ, দেহের ওজন আবারও প্রায় ১১৩ কেজি ছুঁইছুঁই। দৈহিক এত ওজন নিয়ে পাহাড় ট্র্যাকিং সত্যিই বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু মনতো মানে না। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র দামালদের ভ্রমণে প্রথম পছন্দই পাহাড়, ঝিরি, ঝর্ণা কিংবা ঘুটঘুটে অন্ধকারছন্ন কোন গুহার প্রান্তর। বেশ কিছুকাল গ্যাপ যাবার পর মন যখন পুরাই উথলপাথল, তখন সব ভুলে ছুটে যাই সোনাইছড়ি ট্রেইলে।

প্রথম দিন

রাত্রের প্রথম প্রহরেই গাড়ি ছাড়ি। চট্টগামের ফাঁকা সড়কে মাইক্রো ছুটছে ধুমছে। পথিমধ্যে নানান জায়গায় টি-ব্রেক মারতে মারতেও রাত পৌনে তিনটায় পৌঁছে যাই মিরসরাই মুরগীর ফার্ম। গাইডকে ফোন দিতেই সে এসে হাজির। তাকে নিয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে, হাদি-ফকির হাট দিয়ে গিয়ে-রেললাইনের ধারে গাড়ি পার্কিং করা হয়। তখন রাত প্রায় শেষের দিকে। স্থানীয় জনৈক খাবার দোকানীকে ডেকে তুলে, সঙ্গে নেয়া বাড়তি মালছামানা তার ঘরে রাখা হয়।দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

এরপর ভ্রমণসঙ্গী স্বেচ্ছাসেবক রফিক, মেহেদি, হাসিব ও নাজমুল পেঁয়াজ, মরিচ কাটাকুটিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। চড়িয়ে দেয়া হয় লাকড়ির চুলায় খিচুড়ি। রাঁধতে রাঁধতে সুবহ্ সাদেক। ওয়াক্ত অনুযায়ী ফজর নামাজ পড়ে, গরমগরম খিচুড়ি খেয়ে ট্র্যাকিং করার প্রস্তুতি। কিছুটা আলো ফুটতেই পাহাড়ঘেরা মেঠো-পথে হাঁটতে শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় পাথুরে ঝিরি, বোল্ডারের সান্নিধ্যে চলে যাই। শুরু হয় পাথুরে পিচ্ছিল পথে হাইকিং-ট্র্যাকিং। ট্রেইলটা সোনাইছড়ি নামে পরিচিত। তবে শুরুতেই দেখব বাদুইজ্জাখুম। যা এই ট্রেইলের অন্যতম আকর্ষণ। বেশ কিছুটা সময় চড়াই-উৎরাই শেষে,বাদুইজ্জাখুমের সামনে পৌঁছি। ওমা! একি দেখছি? হাজার হাজার বাদুরের উড়া-উড়ি। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝখানটা ফাঁকা করে, দু-পাশে উঠে গেছে খাঁড়া পাহাড়। গুহার ভেতর হতে বহমান পানীয় ধারা। কিছুটা পা বাড়াতেই কোমর পর্যন্ত পানি। পায়ের তলায় কর্দমাক্ত মাটি। [caption id="attachment_24576" align="alignnone" width="2560"]দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ[/caption] হাই ভোল্টেজের টর্চের আলোয়, সাহস করে আমরা আগাতে থাকি। মাথার ওপর বৃষ্টির ধারার মত বাদুরের বিষ্ঠা পড়তে থাকে। দম বন্ধ হবার মত উটকো গন্ধ। এরই মধ্যে আমাদের কেউ একজন সাঁতার দিয়ে, আরও এগিয়ে গিয়ে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করল। আর ওমনি আমরা আরও কয়েকজন দিলাম সাঁতার। সরু গুহার ভেতর সাঁতরে গিয়ে যা দেখলাম,তাতে সবার চোখ চড়কগাছ। এক ফালি আলোয় যৌবনা ঝর্ণা ধারা। উচ্ছ্বাস আর অপ্রত্যাশিত ঝর্ণার সৌন্দর্য দেখে, যারপরাণই আনন্দে বিগলতি হয়ে যাই। দুঃখের ব্যাপার, দাড়িয়ে ছবি তোলার মত পরিস্থিতি ছিল না। থাক নাইবা তুললাম ছবি। না চাইতেই প্রকৃতির যে রূপ দেখেছি,তাইবা কম কি? [caption id="attachment_24580" align="alignnone" width="960"]ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ[/caption] এরপরে কিছুটা পথ ঘুরে এসে,আবারও হাইকিং-ট্র্যাকিং। একের পর এক বেশ বড়সড় পাথুরে বোল্ডার, অতিক্রম করে এগিয়ে চলছি। কিছুক্ষণ আগে যে গুহার ভিতরে ছিলাম,এখন সেই বাদুইজ্জাখুমের ঠিক উপরেই। দৃষ্টির খুব কাছাকাছি হাজার হাজার বাদুড়ের উড়া-উড়ি। তখন ভাবছিলাম গুহায় প্রবেশের কারণে হয়তো, তারা বিরক্ত হয়ে অনবরত উড়ছে আর কিচিরমিচির করছে। কিন্তু এখন দেখলাম বাদুড়ের দল এমনিতেই সারাক্ষণ,নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যেই আপন মনে ঘুরেঘুরে উড়ছে। চলতি পথে অনেক দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যে চোখ আটকায়। কখনও কখনও সেসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য থমকে দাঁড়াই। বুক ভরা নিশ্বাস আর ভালোলাগার স্মৃতি নিয়ে, আবারও হাঁটা শুরু করি। চলতে চলতে ছোটবড় কিছু ক্যাসকেড, ঝিরি ও বুনো পথ পারি দিয়ে পৌঁছে যাই সোনাইছড়ি ঝর্ণায়। [caption id="attachment_24581" align="alignnone" width="960"]

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম। ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
ঝুম বর্ষা মৌসুম থাকায়, ঝর্ণায় বেশ পানি প্রবাহ ছিলো।সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়ায়,আমরা ছাড়া আর কোন পর্যটকের ভিড় ছিলো না। তাই ঝর্ণার পরিবেশটাও ছিল বেশ নিঝুম। হালকার উপর ঝাপসা স্যুপ খেয়ে, নেমে যাই ঝর্ণার পানিতে অবগাহনে। সোনাইছড়ি ঝর্ণার উচ্চতা খুব বেশি নয়। বড় জোড় ৪০/৫০ ফিট হবে হয়তো। তবে এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। ইচ্ছেমত দেহ ভিজাতে ভিজাতে, আড্ডাও চলে সমান তালে। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা বাড়তে থাকলে, আমরাও ফিরতি পথ ধরি। ও হ্যাঁ আগেই জানিয়ে রাখি।

দে-ছুট বেশিরভাগ ভ্রমণেই যে পথে যায়, সে পথে আর ফিরে না। তাতে প্রকৃতির নতুনত্ব কোন সৌন্দর্য দেখার সুযোগ মিলে। তাই বরাবরের মত সোনাইছড়ি হতেও ভিন্ন পথে আগালাম। জঙ্গলপূর্ণ পথে যেতে যেতে, ঢালা পাহাড় সামনে পড়ে। সেটাকে টপকেই তবে লোকালয়ে ফিরতে হবে। খানিকটা বিরতি দিয়ে শুরু হল ট্র্যাকিং। উঠতে উঠতে মনে হল,পাহাড়ের কিছুটা অংশ প্রায় ৯০ ডিগ্রী খাঁড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এর উচ্চতা প্রায়, ৮০০ হতে ১০০০ ফিট হবার সম্ভাবনা রয়েছে। লক ডাউনে পর্যটকদের পদচারণ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায়,ঢালা পাহাড়ের প্রকৃতি বেশ নয়নাভিরামভাবে সেজে রয়েছে। পাহাড়টি আপন বলয়ে গুছানোর সুযোগ পেয়েছে। বন্ধুর পথই তার সাক্ষর।

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
দে-ছুট বন্ধুরা খাঁড়া পিচ্ছিল পথে জঙ্গলি ফুলপাতার গন্ধ শুকতে শুকতে চূড়ায় যখন পৌঁছি, তখন বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা। এরপর প্রখর রৌদ্রে হাইকিং। কোন বাতাস নেই। পুরো একটা গুমোট পরিস্থিতি। গাছের একটি পাতাও নড়ছে না। এমন অবস্থায় হঠাত করে বড় এক গাছের মূল মাথা মটমট করে ভাঙ্গার আওয়াজ। জসীম আমাকে গাছটা দেখালও। তাকে বললাম দেখতও কোন বন্য জন্তু দেখা যায় কিনা। আমিও গাছের আরও কিছুটা কাছাকাছি গিয়ে, ভালো করে খেয়াল করলাম।

কিন্তু কিছুই চোখে পড়ল না। টনক ফিরল যখন দে-ছুটের কেউ একজন বলল, ভাই আপনি কি এখনো বুঝতে পারেন নাই। ব্যাস যা বুঝার বুঝে নিয়ে, দ্রত দোয়া দরুদ পড়ে সটকে পড়লাম। ঘটনাটা আমাদের মন্থর গতির হাঁটায়, স্পিড যুগিয়েছিল বেশ। লোকালয়ে ফিরে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে ঘটনার সত্যতা পেলাম। এরপরে ফেসবুকেও পোস্ট দিয়ে, সোনাইছড়ি ট্রেইলে জ্বিনের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হলাম। সোনাইছড়ি এমন একটা রোমাঞ্চকর ট্রেইল, যেখানে এক ট্রেইলে গুহা, ঝর্ণা ও পাহাড় ট্র্যাকিংয়ের আনন্দ উপভোগ করা যায়। আর যদি কিসমত ভালো থাকে, তাহলে হরর মুভি বাস্তবেও দেখা যেতে পারে।

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

ছবি : দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
যাতায়াত :
ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল হতে চট্টগ্রামের বাস ছেড়ে যায়। নেমে যেতে হবে মিরসরাই। সেখান হতে অটো/সিএনজি করে হাদি ফকির হাট রেল লাইন। এরপর হাঁটা। রেললাইন হতে সব মিলিয়ে ৬ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসা সম্ভব।

টিপস :

সোনাইছড়ি ঝর্ণা খুব বেশি বড় নয়। সাধারণত এসব আকারের ঝর্ণা বান্দরবানের ট্রিপে ভালোভাবে খেয়ালও করি না। কিন্তু সোনাইছড়ি ট্রেইলটা ঢাকার ধারেকাছে হিসেবে বেশ চমৎকার। যার অন্যতম ভালোলাগার মত হবে বাদুইজ্জাখুমের ভেতরে প্রবেশ। তবে সাতার না জানা ও সাপ বিচ্ছু ভয় পাওয়া পর্যটকরা এড়িয়ে চলুন। কারণ সাপের অন্যতম পছন্দের খাবার হল বাদুড়। অবশ্যই স্থানীয় গাইড নিয়ে যাবেন। নতুবা পথ হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। রেললাইনের পাশে থাকা দোকানীদের সঙ্গে আলাপ করে,গাইড যোগাড় করে নেয়া যাবে।