একসময় এটিই ছিল দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার রাজধানী। বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম পবিত্র এই স্থানটি ছিল শ্রীলঙ্কার প্রথম পরিকল্পিত শহর। উত্তর মধ্য প্রদেশের এই শহরটি শ্রীলঙ্কা রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে খ্যাত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৫ শতক থেকে ১১শ' খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লম্বা সময় ধরে এখানেই লঙ্কা রাজদের আবাস ছিল। ৩৭৭ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১০১৭ সাল পর্যন্ত ১,৪৪০ বছরে এখানে ১৩০ জন রাজা এসেছিলেন।
স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্য বিবেচনায় অনুরাধাপুরের তুলনা অসামান্য। বৌদ্ধ ধর্মের অজস্র নিদর্শন আর ঐতিহ্যের বিবেচনায় অনুরাধাপুর ১৯৮২ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও স্থান করে নিয়েছে।
অনুরাধাপুরে দেখার মত স্থাপনার অভাব নেই। দীর্ঘদিনের বেড়ে ওঠার পরিকল্পনা হিসেবে এখানে এসে যুক্ত হয়েছে হাজারো নিদর্শন।
অনুরাধাপুরের তেমন কিছু অসাধারণ দর্শনীয় স্থান নিয়ে জেনে নিন এক নজরে...
রুয়ানয়েলি বিহার, অনুরাধাপুর। ছবি : সংগৃহীত
রুয়ানয়েলি বিহার, অনুরাধাপুর
খ্রিস্টপূর্ব ১৪০ সালে রাজা দুতুগামুনুর সময়ে শুরু হয় রুয়ানয়েলি বিহার নির্মাণ কাজ। রুয়ানয়েলি বিহার মূলত একটি বৌদ্ধ প্যাগোডা। এটি রুয়ানয়েলিসেয়া নামেও পরিচিত। সিংহল ভাষা থেকে বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায় স্বর্ণ মাটির তৈরি বৌদ্ধমন্দির। আকারে অর্ধ গোলাকার এই প্যাগোডার কাজ রাজা দুতুগামুনুর সময়ে শুরু হলেও তিনি এর শেষ দেখে যেতে পারেননি। তার ভাই সাদ্ধাতিসা এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন। এটি মূলত ভারত থেকে আসা বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক আহাত মহা মাহিন্দা থিরু-এর নির্দেশেই নির্মাণ করা হয়েছিল।
রুয়ানয়েলির নির্মাণশৈলী যেকোনো ব্যক্তির চোখ কপালে উঠতে বাধ্য করবে। প্রায় ২৯০ মিটার পরিধি নিয়ে গড়ে তোলা এই বৌদ্ধ মন্দিরের উচ্চতা ১০৩ মিটার। প্রাচীন লঙ্কান মানুষের স্থাপত্যবিদ্যার জ্ঞান যে কত বেশি উন্নত ছিল তা এই মন্দির দেখা ছাড়া অনুধাবন করা কষ্ট।
চাইলে রুয়ানয়েলি বিহারের সমস্ত খুঁটিনাটিও আপনি জেনে নিতে পারবেন। শ্রীলঙ্কার অন্যান্য সব বৌদ্ধ মন্দিরের মতই এই মন্দিরে রাজা দুতুগামুনু এবং রাজা সাদ্ধাতিসার নেয়া সব উদ্যোগের কথা লিপিবদ্ধ করা আছে। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ও প্রচারের ক্ষেত্রে রুয়ানয়েলি বিহারের আলাদা একটি অবদান সবসময়ই ছিল।
শ্রী মহা বোধি, অনুরাধাপুর, শ্রীলঙ্কা। ছবি : সংগৃহীত
শ্রী মহা বোধি
বৌদ্ধ ধর্মে বোধি বৃক্ষের একটি আলাদা সম্মান ও কদর সবসময়ই ছিল। ধারণা করা হয় বোধি বৃক্ষের নিচে ধ্যান করেই গৌতম বুদ্ধ বিশেষ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরের বোধি বৃক্ষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে অনুরাধাপুরের এই বোধি বৃক্ষের আলাদা কদরের সবচেয়ে বড় কারণ, এটি সেই একই গাছের চারা যার নিচে ধ্যান করে গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। মূল গাছেরই অংশ হবার কারণ এই গাছের আলাদা সম্মান রক্ষা করা হয়।
এই গাছটি শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরে আনা হয় খ্রিস্টপূর্ব ২৮৮ সালে। এবং বর্তমানে মানুষের হাতে লাগানো অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বয়সের গাছ এটিই। ভারতের বুদ্ধগায়া থেকে এটিকে নিয়ে আসেন বোন শঙ্খমিতা। শঙ্খমিতা ছিলেন বৌদ্ধধর্ম প্রচারক আহাত মহা মাহিন্দা থিরু এর বোন।
অর্ধশায়িত গৌতম বুদ্ধ। ছবি : পিন্টারেস্ট
শঙ্খমিতা নিজেও পরে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিলেন। শ্রী মহা বোধির পাশেই আছে ব্রজেন প্রাসাদ এবং রুয়ানয়েলি স্তূপ। বিগত ২০০০ বছর ধরে এই বোধি বৃক্ষ এবং এর আশেপাশের অঞ্চলকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে রক্ষা করে আসছেন শ্রীলঙ্কার অধিপতিরা।
ইসুরুমুনিয়া মন্দির
ইসুরুমুনিয়া মন্দিরের অবস্থান অনুরাধাপুরের তিসাওয়েয়া অঞ্চলে। এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন মহারাজা দেবনামপিয়াতেসা। এটি সাধারণের কাছে ইসুরুমুনিয়া বিহার নামেও। ইসুরুমুনিয়া বিহার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে। এটি একটি গুহার সাথে সংযুক্ত। আর সেই গুহার উপর আরেকটি বৌদ্ধ স্তূপের অবস্থান। ইসুরুমুনিয়া মন্দিরে পা রাখলে শ্রীলঙ্কার বুনো সৌন্দর্য নিয়ে বেশ ভাল এক ধারণা পাওয়া যায়। এই বিহারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ইসুরুমুনিয়া লাভার নামের একটি মাটির ফলক এবং হাতির পুল।
ইসুরুমুনিয়া মন্দির, শ্রীলঙ্কা। ছবি : পিন্টারেস্ট
ইসুরুমুনিয়া লাভার মূলত পাথরে খোঁদাই করা মূর্তি। শ্রীলঙ্কার রাজ বাগানে এটি পাওয়া গিয়েছিল এবং পরে এখানে নিয়ে আসা হয়। এই পাথরের খোঁদাই কাজের নানারকমের ব্যাখ্যা রয়েছে। এখানে মূলত রাজকুমার সিলিয়া এবং তার স্ত্রী অশোকমালাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
সিলিয়া এবং অশোকমালারই সন্তান ছিলেন রুয়ানয়েলা মন্দিরের দুই পৃষ্ঠপোষক রাজা দুতুগামুনু এবং সাদ্ধাতিসা। নিচু বর্ণের অশোকমালাকে বিয়ে করে রাজ্যের অধিকার হারানোর শঙ্কা থাকলেও রাজপুত্র সিলিয়া তাকেই বিয়ে করেন। আবার অনেকের মতে, এটি মূলত হিন্দু দেবতা শিব এবং দেবী পার্বতী।
ইসুরুমুনিয়া খুবই পবিত্র একটি মন্দির বলে বিবেচিত। এখানে ভারত থেকে আনা গৌতম বুদ্ধের একটি দাঁত সংরক্ষিত আছে। পুরো মন্দিরটাই একটি মাত্র পাথরের ওপর নির্মিত। মন্দিরের প্রবেশপথটি মূলত একটি পুকুর। যেখানে গোসলরত হাতিদের মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। এখান থেকেই এর নাম হয়েছে এলিফ্যান্ট পুল। এই মন্দিরটি বৃষ্টির দেবতার উপাসনালয় হিসেবেও ব্যবহার করা হত বলে জানা যায়।
ইসুরুমুনিয়া মন্দিরের হাতি। ছবি : পিন্টারেস্ট
ধাপুরে ঘুরতে চাইলে অবশ্য আরও বেশ কিছু নিদর্শন দেখার আছে। এর মাঝে অভয়গিরি আশ্রম, সান্দাকাদা পাহানা, লঙ্কারমায়া, রত্নপ্রসাদেও ঘুরে আসা যেতে পারে। এই সবকিছু নিয়েই মূলত ইউনেস্কোর ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল অনুরাধাপুর।
জুবায়ের আহমেদ এস এম