সরেজমিনে তাঁতশিল্প : জীবন যেখানে ঐতিহ্য রক্ষা আর জীবিকার আড়ালে বন্দি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প ভ্রমণ, শত বছরের ঐতিহ্য রক্ষাকারীরাই যেখানে অস্তিত্বসংকটে


জীবিকার সাথে লড়াই করেও শত শত বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন তাঁতশিল্পের এমন কারিগরেরা।

জীবিকার সাথে লড়াই করেও শত শত বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন তাঁতশিল্পের এমন কারিগরেরা। ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন


মোগল-সুলতানী আমলে বেড়ে ওঠা শিল্প উপনিবেশিক আমলে খুইয়েছে তার স্বর্ণালী অধ্যয়, বর্তমানে এসে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। একসময়কার প্রতাপশালী ঐতিহ্যের তাঁতশিল্প আজ কেবল টাঙ্গাইল জেলাতেই টিকে আছে, এজন্য তাঁতের নগরী বলা হয় এই জেলাকে। বিশ্বায়ন, প্রযুক্তি, বণিক এবং মধ্যসত্বভোগীদের পরে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কেমন আছে দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতপল্লী, টাঙ্গাইল ঘুরে এসে তা আমাদের জানাচ্ছেন তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন।

ঢাকা বিভাগের সব থেকে বড় জেলা টাঙ্গাইল, ঐতিহাসিক এবং প্রাকৃতিক নিদর্শন দেখতে এর আগেও টাঙ্গাইল যাওয়া হয়েছে বেশ কয়েকবার। এবার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন, তাঁতের শাড়ি কিনতে গিয়ে তাঁত শিল্পের যতটা কাছে যাওয়া যায়। টাঙ্গাইল জেলার যেমন অনেক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে তেমনই এ জেলার একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক তাঁতশিল্প।

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের রাজধানী বলা পাথরাইল যাওয়ার এক পথ

টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের রাজধানী বলা পাথরাইল যাওয়ার একটি পথ। ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন


তাঁতশিল্প যেন এক গোলকধাঁধা

জিনিসটা আমার কাছে একটা গোলকধাঁধা মনে হয়েছে, টাঙ্গাইল শহরে যেতে প্রধান সড়ক দিয়ে না গিয়ে পাকুল্লা থেকে মাদারকোল-দেলদুয়ার রাস্তা ধরে সোজা এগোলে পাথরাইল বাজার, পাথরাইলকে নাকি টাঙ্গাইলের রাজধানী বলা হয়, মূললত সবচেয়ে বড় তাঁতের শাড়ি'র বাজার এখানেই, এছাড়াও করটিয়া বেলতা আলোকদিয়ায় রয়েছে প্রচুর তাঁত ব্যাবসায়ী।

টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পের অবস্থা জানতে কিংবা বুঝতে শুধুমাত্র পাথরাইল ঘুরলেই হবে, এখানে তাঁতের সাথে জড়িত দুই ধরনের মানুষ রয়েছে, তাঁতশিল্পি এবং তাঁত ব্যাবসয়ী। আমার প্রথমে গিয়ে মনে হয়েছে তাঁত শিল্পের সাথে কেমন ধোঁয়াশা একটা ব্যাপার রয়েছে এখানে। কাউকে তাঁতী বা তাঁতী'র বাড়ি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেই টাইলস করা ঝকঝকা দোকান দেখিয়ে দেয়, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁতশিল্পের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত কাউকে পাওয়া যায় না এখানে।

তাঁতের কারখানা

তাঁতের কারখানা। ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন

 আমরা প্রথমে গেলাম পাথরাইল, অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁতের কারখানা বা তাঁতী'র কোন খোঁজখবর পেলাম না, সেখান থেকে এক বন্ধুর ভাইয়ের তাঁতের কারখানা আছে জানতে পেরে গেলাম বেলতা নামক একটা গ্রামে, জায়গাটা পোড়াবাড়ি নামেও পরিচিত, টাঙ্গাইলের বিখ্যাত পোড়াবাড়ি'র চমচম এখানেই পাওয়া যায়।

শিল্পকে টিকি রাখা শিল্পীর জরাজীর্ণ আবাস

শিল্পকে টিকি রাখা শিল্পীর জরাজীর্ণ আবাস। ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন


বেলতা গ্রাম

বেলতা গ্রামে গিয়ে দেখি আজব ব্যাপার, যেদিকে তাকাই সেদিকেই তাঁত, কোথাও মেশিনের ঘটঘট শব্দ, কোথাও সূতায় রং মাখা হচ্ছে, প্রতিটি ঘরে ঘরেই তাঁত, তবে এই তাঁত আমাদের চেনাজানা তাঁত নয়, এখানে সবই ইলেকট্রিক তাঁত, তাঁত দু'ধরনের হয় একটা হ্যান্ডলুম অন্যটা পাওয়ারলুম।

বেলতায় ঘরে ঘরে পাওয়ারলুমের ছড়াছড়ি দেখে পুরো ব্যাপারটা আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল যে বাজারে নয় তাঁতী খুজতে হবে গ্রামের ভেতরে, বেলাতা'য় কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে শাড়ি কিনে, তাঁতী'দের সাথে গল্পগুজব আড্ডা দিয়ে আমরা আবার চলে আসলাম পাথরাইল, এবার আমরা পাথরাইল বাজার থেকে গ্রামের দিকে ঢুকলাম, গ্রামে ঢুকতেই দেখি বেলতার মত অবস্থা, তবে এখানে পাওয়ারলুমের পাশাপাশি হ্যান্ডলুম দেখতে পাওয়া যায় অনেক, হ্যান্ডলুমের শাড়িগুলো মানে ভালো এবং দামেও একটু বেশি।

পাওয়ার লুমে চলছে তাঁতের শাড়ি বোনার কাজ

পাওয়ার লুমে চলছে তাঁতের শাড়ি বোনার কাজ। ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন


তাঁতশিল্পে সামাজিক বৈষম্য

তাঁতীর বাড়ি বা কারখানায় শাড়ির দাম অনেক কম, যেকোনো তাঁতী'র বাড়ি গেলেই এখানের তাঁতশিল্পি এবং তাঁতব্যাবসায়ী'র মধ্যে সামাজিক বৈষম্য খুব ভালভাবে বোঝা যায়। যেখানে তাঁতশিল্পি'র বাড়িতে ফুটো হওয়া টিনের ঘর, বৃষ্টি এলে পানি পরে, অভাবের তাড়নায় নিজেদের এ শিল্প থেকে সরিয়ে নিচ্ছে, সেখানে রাস্তার পাশে টাইলস করা বড় বড় ঝকঝকে শাড়ির শোরুমগুলো দিনদিন আরও বড় হচ্ছে।


ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন

আমাদের চেনাজানা আড়ং-এর একটা ৪/৫ হাজার টাকা দামের হ্যান্ডলুম শাড়ি এখানে তাঁতীর বাড়ি থেকে কিনলে হয়তো ১৫'শ টাকায় পাওয়া যাবে। হ্যান্ডলুম একটা শাড়ি বানাতে তিন-চারদিন সময় লাগে, সূতা'র খরচ, তাঁতে'র খরচ তাঁতী'র খরচ সব বাদ দিয়ে আসলে তাদের প্রাপ্য কতটুকু এবং তারা পায় কতটুকু আমি জানিনা, এই হিসাব আমি করতে পারিনি।

এসব বড় বড় ব্যাবসায়ীর কারনে বিগত বছরগুলোতে আমাদের তাঁত শিল্পের যতটা ক্ষতি হয়েছে তার থেকে বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে এই চলমান মহামারির প্রভাবে। যতটুকু আয় হতো, হয়তো খেয়েপরে বেঁচে থাকা যেতো নিশ্চয়। কিন্তু  বিগত তিনমাসে সেটুকু রাস্তাও বন্ধ হয়ে ছিল, তাই অনেকে বাধ্য হয়ে জীবিকার ধরণ পরিবর্তণ করছেন।



ছবি : তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন


এখানে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত যেসব সংস্থা আছে, এসব সংস্থা তৈরি হয় তাঁত ব্যাবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার্থে, তাঁত শিল্পীদের স্বার্থরক্ষায় কোনো সংস্থা বা কোনো সংগঠন কাজ করে কিনা আমি জানিনা, আর করলেও তারা কি করে সেটা নিয়ে হাজারটা প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে একটা কথা বলা যায়, যেভাবে চলছে এভাবে চললে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য তাঁতশিল্প খুব তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে।

 তালুকদার মেজবাহ্ উদ্দিন   এস এম


Click Here To See More