চিলিকা হ্রদ : বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভারতীয় উপমহাদেশের সব পরিযায়ী পাখিদের বৃহত্তম আশ্রয় চিলিকা হ্রদ



চিলিকা হ্রদ chilika lake

নিউ ক্যালিডোনিয়ার প্রবাল প্রাচীরের পরে চিলিকা হ্রদ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপকূলীয় লবণাক্ত হ্রদ। ছবি : উইকিমিডিয়া


 হ্রদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য অনুষঙ্গ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে হ্রদের কদর তাই সবসময়ই বেশি। দিগন্ত বিস্তৃত হ্রদের নজরকাড়া জল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন সৌন্দর্যপিপাসুরা। প্রাকৃতিক হ্রদ মানেই অতিথি পাখিদের প্রিয় আবাস। দিগন্তজোড়া হ্রদের আকাশজুড়ে উড়ে চলা পাখির দলের সৌন্দর্য যেকোনো প্রকৃতি প্রেমীকে করে আনমনা। পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনাবিল সৌন্দর্যের অসংখ্য হ্রদ। ভারতেও রয়েছে অনেকগুলো বিশাল আকৃতির হ্রদ। তার মধ্যে চিলিকা হ্রদ (Chilika Lake)  অনাবিল সৌন্দর্যের একটি হ্রদ। আপনি যদি পাখি প্রেমী হয়ে থাকেন তবে আপনাকে যেতেই হবে চিলিকা হ্রদে কারণ এখানে এলে দেখতে পাবেন হাজারো পরিযায়ী পাখিদের নজরকাড়া দৃশ্য। উড়িষ্যার রাজ্যের তিনটি জেলা-পুরী, খুরদা ও গাঞ্জাম এ এই হ্রদটি পড়েছে। চিলিকা হ্রদের পুরনো নাম চিল্কা। এটি ভারতের সর্ববৃহৎ লবণাক্ত হ্রদ। এছাড়া সারা বিশ্বে নিউ ক্যালিডোনিয়ার প্রবাল প্রাচীরের পরে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম উপকূলীয় লবণাক্ত হ্রদ। এই হ্রদটির লম্বায় প্রায় ৪০ মাইল এবং এর আয়তন প্রায় ১,০০০ বর্গকিলোমিটার। তবে বর্ষায় এর আয়তন বেড়ে প্রায় ১,১৭০ বর্গকিলোমিটার হয়।

আরও পড়ুন : বৃহত্তম স্বাদু পানির হ্রদ কাপ্তাই লেক, রাঙ্গামাটি


চিলিকা হ্রদ chilika lake

ভারতীয় উপমহাদেশের সব পরিযায়ী পাখিদের বৃহত্তম আশ্রয় চিলিকা হ্রদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


 বিশাল এই হ্রদটিতে ছোট-বড় প্রায় ৫২টি নদীর পানি এসে মিশেছে। এর খুব কাছেই সমুদ্র। জোয়ারের সময়টাতে এই হ্রদে সমুদের লবণাক্ত জল ঢুকে পড়ে। 'দয়া' নামের একটা সরু নদী দিয়ে এই হ্রদ বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই হ্রদের আকার অনেকটা দেখতে নাশপাতি ফলের মতো। চমৎকার এই জলবিহারটি মনোরম সৌন্দর্যের অধিকারী।

পরিযায়ী পাখিদের বৃহত্তম আশ্রয়

ভারতীয় উপমহাদেশের সব পরিযায়ী পাখিদের বৃহত্তম আশ্রয় হল এই চিলিকা হ্রদ। শীতকালে পুরো ভারত থেকে পরিযায়ী পাখিরা এখানে এসে জড়ো হয়। এখানে প্রায় ১৬০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দেখতে পাবেন। এই হ্রদকে ভারতের পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম গন্তব্য স্থলের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চিলিকা হ্রদে পাখি দেখার সবচেয়ে ভালো জায়গা হল মঙ্গলজোড়ী। এটি হ্রদের উত্তর কোণে একটি ছোট্ট গ্রাম। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির সময়টাতে এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখিরা আসে বহুদূর থেকে। চীন, সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, বৈকাল হ্রদ, ক্যাসপিয়ান সাগর, ইরান এমনকি আফগানিস্তান থেকেও এখানে অতিথি পাখিদের আগমন ঘটে।

আরও পড়ুন : টেবিল ফর ওয়ান : যে রেস্টুরেন্টে যেতে ও খেতে পারবে শুধু একজন


চিলিকা হ্রদ chilika lake

প্রকৃতির মোহাচ্ছন্ন এক রূপের দেখা পাবেন এই দ্বীপে। ছবি : টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া



কি কি উপভোগ করবেন

এই মঙ্গলজোড়ীতে অপার নীরবতায় পাখিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। একেবারে নির্জন এই জায়গাটিতে শুধু একটা সাইনবোর্ড আর কয়েকটা ডিঙি নৌকা বাঁধা দেখবেন। নৌকায় বসে পড়বেন পাখির বই ও বাইনোকুলার হাতে। এছাড়া নৌকায় করে জলচর পাখিদের খুব কাছে যেতে পারবেন। তুলতে পারবেন পাখিদের চমৎকার সব ছবি। কতরকম পাখি যে আছে তা এখানে না এলে বুঝবেন না। বিশাল এই চিলিকা হ্রদের মাঝে নাক উঁচিয়ে জেগে আছে বেশ কয়েকটি দ্বীপ। তাদের মধ্যে আছে সাতপাড়া, নলবন, কালীযাই ইত্যাদি। সব দ্বীপ মিলিয়ে এখানে প্রায় দেড় লাখ মৎস্যজীবীর বাস। এই হ্রদই তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। কাতলা থেকে পুঁটি পর্যন্ত সব আকারের মাছ আছে এই হ্রদে।

আরও আছে বড় বড় কাঁকড়া এবং পাঁচ ছয় রকমের চিংড়ি মাছ, বড় বড় গলদা চিংড়ি। এই মাছগুলো স্বাদের দিক থেকে অতুলনীয়। এই দ্বীপগুলোর কোনটিতে আছে হিন্দু মন্দির, কোথাও আছে পক্ষী নিবাস, আবার কোথাও গড়ে তোলা হয়েছে ডলফিন গবেষণা কেন্দ্র। সাতপাড়া দ্বীপে নৌকা ভাড়া করে কাছেই ইরাবতী ডলফিনের দেখতে যেতে পারবেন। এই ডলফিনের সংখ্যা বর্তমানে কমে গেলেও এই জায়গাটাতে এখনো অল্প সংখ্যক দেখা যায়। এখানে পাখিদের সংখ্যা বেশ কম। শুধু অল্প কিছু সাহসী বক, ঈগল ও পানকৌড়ি দেখতে পাবেন। সাতপাড়া থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে চিলিকা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনা। এখানকার মোটর লাগানো নৌকাগুলির চেহারা জরাজীর্ণ হলেও দু- তিন ঘণ্টার মধ্যে আপনি এই মোহনায় পৌঁছে যাবেন।

যেখানে থাকবেন :

এখানে থাকার জন্য উড়িষ্যা সরকারের পান্থনিবাস বাংলোগুলো সবচেয়ে ভালো। চমৎকার সুন্দর এই বাংলোগুলোতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে খোলামেলা বিরাট ঘর, বারান্দা, চারিধারে বাগান ও হ্রদের দৃশ্যের অপার সৌন্দর্য পাবেন । এখানে থাকার খরচও মোটামুটি কম। সাথে পাবেন মুখরোচক বাঙালি খাবার।

যেভাবে যাবেন :

পুরী থেকে নতুন মেরিন ড্রাইভ ধরে সাতপাড়া যাবেন। পুরী থেকে সাতপাড়ার দূরত্ব মাত্র ৪৯ কিলোমিটার। গাড়িতে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টার মতো। পুরী মিউনিসিপ্যাল বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসে চড়েও আসতে পারেন। এই বাস স্ট্যান্ড থেকে আধা ঘণ্টা পর পর বাস সার্ভিস আছে।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম