হলস্ট্যাট ভিলেজ : পর্যটকদের মোহিত করা অতুলনীয় সৌন্দর্যের এক গ্রাম

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: ইউরোপের ছোট্ট দেশ অস্ট্রিয়ার নান্দনিক সোন্দর্যের গ্রাম হলস্ট্যাট

 

Hallstatt Village-হলস্ট্যাট ভিলেজ

অপূর্ব সৌন্দর্য ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের লেক টাউন হলস্ট্যাট; ছবি : দ্যা কালচার ট্রিপ


 ইউরোপ ভ্রমণের স্বপ্ন কার না থাকে। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে ইউরোপ হচ্ছে স্বর্গরাজ্য। জীবনে একবার হলেও ইউরোপে ভ্রমণ করা যেন সকল ভ্রমণপিপাসুর স্বপ্ন। ইউরোপের দেশগুলোতে রোমান্টিক জায়গা থেকে শুরু করে অ্যাডভেঞ্চার, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, ঐতিহ্যসহ সবকিছুর স্বাদ পাবেন। ইউরোপের ছোট্ট একটি দেশ হল অস্ট্রিয়া। পর্যটকদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় এই দেশটি আপনার ইউরোপ ভ্রমণে কিছুতেই মিস করবেন না। নজরকাড়া প্রকৃতির এই দেশটিতে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এখানকার নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী থেকে শুরু করে পাহাড়ঘেরা প্রকৃতি ভ্রমনপ্রেমীদের বার বার ফিরিয়ে নিয়ে আসে এই দেশটিতে। অপার সৌন্দর্যের অস্ট্রিয়ার সম্মোহিত করা এক গ্রাম হল হলস্ট্যাট (Hallstatt Village)। যেনও শিল্পীর আঁকা ছবি থেকে টুপ করে বাস্তবে চলে আসার মতো এই গ্রামে কি কি আছে আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক।

আরও পড়ুন : হাউজ অব ব্রেড বা পাউরুটি জাদুঘর, অষ্ট্রিয়া

সারা বছর পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকা অস্ট্রিয়ায় দারুণ জনপ্রিয় একটি জায়গা হল এই হলস্ট্যাট ভিলেজ। দু-দিকে পাহাড়। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এক হ্রদ। আর এই হ্রদের ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে হলস্ট্যাট ভিলেজ। এক নজরেই এই গ্রামের অতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্মোহিত করে ফেলে যেকোনো পর্যটককে। বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এই জনপদটি উত্তর অস্ট্রিয়ার সালসকামার্গাট লেক জেলার পাহাড়ের কোলজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট এই গ্রামটি শীতে ঢেকে যায় তুষার-শুভ্র বরফের চাদরে। আর গ্রীষ্মকালে বরফ গলে গিয়ে তার সকল চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য নিয়ে জেগে উঠে। রূপের বন্যায় এখানে যেনও সময় থমকে দাঁড়ায়। পাহাড়ি প্রকৃতি আর নান্দনিক স্থাপত্যের মিশ্রণ এই ছোট্ট গ্রামটিকে করে তুলেছে স্বপ্নময়।

Hallstatt Village-হলস্ট্যাট ভিলেজ

ঋতুভেদে গ্রামটি সম্মোহনী এক মায়ার সৌন্দর্যে ছেয়ে যায়; ছবি : উইকিপিডিয়া


হলস্ট্যাট গ্রামটি কিন্তু নতুন নয়। এর ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রায় ৩,৫০০ বছরের পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে এই গ্রামের। প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকেও এই গ্রামটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৪৬ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত এই গ্রামে খননের ফলে এক অজানা সভ্যতার খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। এখানেই ব্রোঞ্জ যুগের সমাপ্তি ও লৌহ যুগের আরম্ভ হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখানকার বিভিন্ন জায়গায় খনন করে ব্রোঞ্জ এবং লোহার তৈরি অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পেয়েছিলেন। এখানে আছে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাকৃতিক লবণ খনি। যা বিশ্বের প্রথম লবণ খনি হিসেবে পরিচিত। এই খনি থেকে লবণ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে এখানকার অর্থনীতি গড়ে উঠছিল। এই লবণের খনির পাশেই প্রায় ২,০০০ মানুষের সমাধি পাওয়া গিয়েছিল। সমাধিগুলোতে পাওয়া গিয়েছিল মানুষের কঙ্কাল ও দেহাবশেষ। এই সমাধিগুলি খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ থেকে ৮০০ সাল এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৪৫০ সালের।

আরও পড়ুন : মিউজিক্যাল বাকেট লিস্ট : ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৫টি শহর

কৃষিকাজের উপর ভিত্তি করে এখানে সভ্যতা গড়ে উঠলেও ধাতু শিল্পে এই এলাকাটি ছিল বেশ উন্নত। ভূ-মধ্যসাগরীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যোগাযোগ ছিল এখানকার মানুষদের। প্রাথমিক লৌহ যুগের এই সংস্কৃতির নাম এই জায়গার নামে দেয়া হয়েছে হলস্ট্যাট সংস্কৃতি। এখানকার কালচারাল হেরিটেজ মিউজিয়াম (Cultural Heritage Museum) এবং (The Beinhaus - Bone house)-এ গেলে এই জায়গার ইতিহাস সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য জানতে পারবেন। রূপকথার এই গ্রামের পরতে পরতে সৌন্দর্য দিয়ে মোড়া। হ্রদ আর হ্রদের চারপাশ জুড়ে সবুজ পাহাড়ের মিতালি। এখানকার পাহাড়গুলোকে বলা হয় হ্রদের অভিভাবক। হ্রদের পাড় থেকে আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের ওপর দিকে। রাস্তার দু-পাশে শত শত বছরের পুরনো বাড়ি।

Hallstatt Village-হলস্ট্যাট ভিলেজ

হলস্ট্যাটের একটি সাধারণ রাস্তার দৃশ্য; ছবি : ট্রাভেল এওয়েটস


পাহাড়ের ধাপে ধাপে নান্দনিক উপায়ে বারোক শৈলীতে গড়ে তোলা হয়েছে এ সকল বাড়ি-ঘর। গাছের গুড়িকে শৈল্পিক আকৃতি দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে গির্জা, ক্যাফে ও হোম-স্টেগুলো। এগুলোর নজরকাড়া রূপ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এখানকার প্রতিটি বাড়ি, দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁগুলি সবুজ অর্কিড ও নানা রঙের ফুল দিয়ে সবসময় সাজিয়ে রাখা হয়। এই গ্রামের সবকিছুই অত্যন্ত সাজানো-গোছানো ও নান্দনিক। ছবির মতো এই সাজানো গ্রামটিকে দেখলেই এখানকার মানুষের নান্দনিক রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

পাহাড়ের যত উঁচুতে উঠতে থাকবেন ততই হলস্ট্যাটের সৌন্দর্য আরও বাড়তে থাকবে। এ ছাড়াও এখানে আপনি চমৎকার কিছু লবণ গুহা এবং হোর্নারওয়ের্ক গুহা দেখতে পারবেন। আরও আছে বরফে জমে যাওয়া জলপ্রপাত, লবণের খনি। সাথে আছে হ্রদের জলে বোটিং ও পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ট্রেকিং এর অপূর্ব সুযোগ। এছাড়া হলস্ট্যাট থেকেই চলে যেতে পারবেন ইউরোপের অন্যতম সুন্দর গুহা Mammut Cave দেখতে। এই গুহাটি প্রায় ১,১৭৪ মিটার গভীর।

আরও পড়ুন : ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : ইউরোপ মহাদেশ (নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ড)

১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো হলস্ট্যাট এবং ডাশ্চটেইন সালসকামার্গাট অঞ্চলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। তারপর থেকেই এখানে পর্যটকদের ভিড় লেগেই আছে। প্রতিবছর প্রায় দশ লাখ পর্যটক এখানে আসেন। এখানে থাকার খরচ অনেক বেশি। তাই বেশিরভাগ পর্যটকরাই সালসবার্গ থেকে এখানে এসে দিনে দিনে ঘুরে ফিরে চলে যান।

যেভাবে যাবেন

ভিয়েনা-সালসবার্গ লাইনের ট্রেনে উঠে পড়বেন। এরপর Attnang-Puchheim স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে Bad Ischl -Obertraun লাইনের ট্রেনে চড়ে হলস্ট্যাট স্টেশনে নামবেন। Hallstättersee হ্রদের পূর্বপাশের তীরে এই স্টেশনটি অবস্থিত। স্টেশন থেকে বেরিয়ে ঢালু রাস্তা ধরে হ্রদের ধারে চলে যাবেন। সেখান থেকে হলস্ট্যাটে যাওয়ার বোট ছাড়ে। এই বোটে করেই পৌঁছে যাবেন হলস্ট্যাট গ্রামে।

রুবাইদা আক্তার   এস এম


Click Here To See More