পরিত্যক্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ এভাবে পড়ে আছে পুরো কুলধারা গ্রামে, জয়সলমীর; ছবি : ফ্লিকার
আনুমানিক ১২৯১ সালের দিকে থর মরুভূমির কোল ঘেঁষে যোধপুরের পালি সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণরা তৈরি করেছিলেন কুলধারা (Kuldhara) গ্রাম। লোকমুখে শোনা কৃষি এবং ব্যবসায় তাদের সমান দক্ষতার কথা।
অবস্থান
রাজস্থানে অবস্থিত এই গ্রাম জয়সলমীর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে। ৮৪টি ছোট ছোট সম্প্রদায় ভিত্তিক গ্রাম এবং প্রায় ১,৫০০ মানুষের বেশ সমৃদ্ধ এক জনপদ ছিল কুলধারা। এখনও সেখানে প্রাচীন মন্দির, আবাসস্থল এবং গ্রামের অবশিষ্টাংশের দেখা পাওয়া যায়।
ইতিহাস
ঘটনার শুরু অন্য জায়গায়। ১৮২৫ সালের দিকে জয়সলমীরে সেলিম সিং নামে এক অত্যাচারী দেওয়ান ছিলেন। তার নজরে আসে কুলধারার গ্রাম প্রধানের সুন্দরী কন্যা। সে ওই মেয়েকে জোর করে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু ব্রাহ্মণদের প্রতিবাদের মুখে তা সম্ভব হয় না।
সেলিম সিং ওই মেয়েটির জন্য খুবই বেপরোয়া হয়ে উঠে। আচমকা ঘোষণা দিয়ে বসে ওই মেয়েকে তার হাতে তুলে না দিলে অস্বাভাবিক করের বোঝা মাথায় নিয়ে বাঁচতে হবে কুলধারার ৮৪টি গ্রামকে।
গ্রামের বাসিন্দারা একরাতের সময় চেয়ে নেয় সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য। দেওয়ান রাজি হয়ে যান।
এখনও অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে কুলধারার অনেক বাড়িঘর, মন্দির এবং স্থপনা; ছবি : সংগৃহীত
প্রায় সাত শতক ধরে কুলধারায় বসবাস করে আসা বাসিন্দারা ওই এক রাতের মধ্যেই মিলিয়ে যান। কেউ কেউ ধারণা করেন এইসব বাসিন্দারা এরপরে পশ্চিম রাজস্থানের যোধপুর শহরের কাছাকাছি কোনও একটি স্থানে বসতি গেড়েছিল। কিন্তু যাবতীয় কোনো সূত্রমতেই তা প্রমাণ করা যায়নি।
তারা কোথাও আশ্রয় নিলেও তাদের উত্তরাধিকারদের চিহ্ন থাকা উচিত ছিল যা পাওয়া যায়নি। বরঞ্চ পুরো ভারতেই কুলধারা গ্রামের পালি সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণদের আর দেখা পাওয়া যায় নি।
দেওয়ান এসে দেখেছিলেন, গ্রামের পর গ্রাম ফাঁকা পড়ে আছে। জিনিসপত্রও আছে যথাস্থানে। কিন্তু কারো দেহাবশেষের চিহ্নও ছিল না। রাতারাতি হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে বাসিন্দারা।
এই ঘটনার প্রায় দুইশ বছর কেটে গেলেও কেউ এখন অবধি নতুন করে থাকার সাহস করে উঠতেন পারেনি। স্থানীয়দের মতে গ্রামের বাসিন্দাদের অভিশাপের ফলস্বরূপ পরবর্তীতে কুলধারায় যারা রাত কাটিয়েছেন, কোনও না কোনও বিপদের মুখে পড়েছেন।
কুলধারায় রাত কাটিয়ে পাড়ি দিতে হয়েছে মৃত্যুর দিকে, এমন কাহিনীও শোনা যায়। পরবর্তীতে অবশ্য বিভিন্ন সোসাইটি এবং গবেষকরা এই জায়গা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। এরমধ্যে ২০১৩ সালে দিল্লির প্যারানরমাল সোসাইটির বেশ কিছু সদস্য রাত কাটাতে গিয়েছিল কুলধারায়।
ভারত সরকার কুলধারাকে হেরিটেজ নগরী হিসেবে হিসেবে ঘোষণা করে; ছবি : ট্র্যাভেল এন্ড লেইজার ইন্ডিয়া[
তাদের মতে, রাতে কুলধারার পরিবেশ খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। হঠাৎই কনকনে ঠাণ্ডা আবার মুহূর্তের মধ্যেই আগুন গরম নেমে আসে। কয়েকজন সদস্যকে ধাক্কা দেয় কেউ! পেছনে ফিরে দেখা যায়- ধারেকাছে কেউ নেই! রাত বাড়লে শোনা গিয়েছিল কান্নার আওয়াজ।
সকাল বেলায় উঠে তারা দেখতে পান, গাড়ির কাঁচে কোলের শিশুর হাতের ছাপ! প্রায় ৫০০টি জায়গায় গবেষণা চালানো হয়েছিল যার ফলাফলও ছিল অনুরূপ। তবে, অনেক গবেষকের ধারণা, যুদ্ধের প্রয়োজনে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল গ্রামবাসীদের। এবং ঐতিহাসিক ও গবেষকদের বড় অংশের বিশ্বাস, খরার কারণেই জনহীন হয়ে পড়ে কুলধারা ও তার সংলগ্ন অন্যান্য গ্রাম।
পরবর্তীতে অবশ্য ভারত সরকার কুলধারাকে হেরিটেজ নগরী হিসেবে হিসেবে ঘোষণা করে। কোন এক রাতের অজানা ইতিহাস এখনও পুরো গ্রামকে অবিকল একই রূপে রেখে দিয়েছে। রাজস্থানকে বলা হয়ে থাকে সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের নগরী। তার মাঝেই হাতে নিয়ে কিছু অজানা রহস্য অক্ষয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুলধারা।