টিবিডি ইন্টারভিউ উইকলি : গ্যারেজ থেকে শুরু করে দেশসেরা পর্যটন শিল্পের মালিক!
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দেশের বর্তমান ভ্রমণবান্ধব, নিরাপদ পরিবেশ বিদেশী পর্যটকদের এখনও অজানা
সম্প্রতি ট্রাভেলবিডির মুখোমুখি হয়েছে বেঙ্গল ট্যুরসের প্রধান রফিকুল ইসলাম নাসিম, তার কাছ থেকে ট্রাভেলবিডি জানতে চেয়েছে দেশের পর্যটনখাত এবং তার প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্যুরস নিয়ে। পাঠকের জন্য সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে ধরা হলো
ট্রাভেল বিডি : শুরুতেই জানতে চাইবো পর্যটন ব্যবস্থাপনায় প্রবেশের গল্প।
রফিকুল ইসলাম নাসিম : ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে। গাইড ট্যুর নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি। যদিও খুব বেশিদিন সেখানে কাজ করা হয়নি। তিন বছরের অভিজ্ঞতা নিয়েই ১৯৯৯ সালে শুরু করি নিজের একটি প্রতিষ্ঠান। সাথে ছিল প্রাক্তন দুইজন সহকর্মী, মাসুদ হোসেন, যিনি এখন বেঙ্গল ট্যুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মাসুদুর রহমান সাহেব, যিনি ব্যবস্থাপক হিসেবে ছিলেন বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। তিন জনে মিলে প্রতিষ্ঠানটির নাম দিলাম বেঙ্গল ট্যুরস।
ট্রাভেল বিডি : কেন এ পথটা বেছে নিলেন?
রফিকুল ইসলাম নাসিম : গাইড ট্যুরে তিন বছর কাজ করার পর আমার আসলে অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছা করেনি। পরিবার বন্ধুবান্ধব সবাই বিসিএস, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করার জন্য চাপ দিত। সুযোগও এসেছিল কয়েকবার। আমার মনে সায় দেয়নি। মনে হল, বিদেশী পর্যটকদের নিয়ে কাজ করছি। বিষয়টায় আমি আগ্রহ পাচ্ছি যেহেতু, আমার দ্বারা হয়তো এই খাতেই কিছু করা সম্ভব। আমার কাছে কোম্পানিতে কাজ করার চেয়ে ব্যবসায় বিস্তার অনেক বেশি মন হওয়াতে এখানেই থেকে গেলাম।

রফিকুল ইসলাম নাসিম : একদম ছোট পরিসরেই শুরু করেছিলাম। আর্থিক সামর্থ্য সেরকম ছিল না। এক পরিচিত বড় ভাইয়ের গ্যারেজ ছিল বনানীতে। সাহায্য চাইতেই উনি গ্যারেজে একটা অংশে এসি লাগিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। এই ছিল আমাদের প্রথম অফিস। পরিচিতদের মাঝেই প্রচারণা চালালাম। বেশ ভালো সাড়া পেলাম। মূলত ব্যবসা প্রসারের সাহসটা সেখান থেকেই এলো। অন্যান্য দেশ থেকে যারা আমাদের দেশে ভ্রমণ করতে চান মূলত সেসব পর্যটকদের সার্বিক সাহায্য করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রথমে জাপান মার্কেট দিয়ে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে ইউরোপিয়ান মার্কেটের সাথে যোগাযোগ শুরু হল। ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত বেশ ভালোই চলছিল। যদিও রাজনৈতিক, বৈশ্বিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। সব বাঁধা পেরিয়েও আমাদের ব্যবসা বেশ ভালো চলছিল।
আরও পড়ুন : 'সমাজের নানা প্রতিবন্ধকতা থেকেই ভ্রমণের অনুপ্রেরণা এসেছে'
৬৫ জন কর্মী, ঢাকাতে দুইটা অফিস, দুইটা জাহাজ মোটামুটি বিশাল পরিসরে বাংলাদেশের সেরা পর্যটন শিল্প হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলাম, এখনও আছি। কিন্তু ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেই অভ্যন্তরীণ পর্যটনের প্রসার অনেকটাই কমে যায়। যেহেতু শুরুতেই বলেছি বৈদেশিক পর্যটকদের নিয়েই আমাদের ব্যবসা, প্রতিবছর তিন সাড়ে তিন হাজার পর্যটকদেরকে নিয়ে আমরা কাজ করি। ৪০-৪৫ টা গ্রুপ থাকতো।

ট্রাভেল বিডি : আপনারা গ্রাহকদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করেন এবং কি ধরণের সেবা আপনারা তাদেরকে প্রদান করেন তা একটু বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি।
রফিকুল ইসলাম নাসিম : আমরা আসলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন মাধ্যমের সাথে জড়িত। এছাড়া, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যটন খাতে বাংলাদেশকে উপস্থাপনের জন্য বিদেশে বিভিন্ন পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ করে, যেমন : আইটিবি বার্লিন, আইডব্লিইউটিএ লন্ডন, জাটা টোকিও, ফিটো স্পেন, বিট মিলান- প্রতিটি মেলায় আমরা অংশগ্রহণ করি। এখানে বিভিন্ন ট্যুর অপারেটররা আসেন আমাদের বুথে। পরিচিত হই, মতের মিল হলে আমরা তাদের সাথে এমইইউ চুক্তিবদ্ধ হই। এভাবেই গত বিশ বাইশ বছর ধরে আমরা আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় গিয়ে গ্রাহকদের সামনে আমাদের সেবাগুলো তুলে ধরছি। আর বেঙ্গল ট্যুরসের গ্রাহকসেবা নিয়ে যদি কথা বলেন তাহলে বলব, যেহেতু আমরা অভ্যন্তরীণ পর্যটন নিয়ে কাজ করি তাই আমাদের কাজের পরিসর বিশাল। ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে গ্রাহকদের অভ্যর্থনা জানানো থেকে শুরু করে ভ্রমণ শেষে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত সবটাই আমরা খেয়াল রাখি। পর্যটকের থাকার জায়গা, পরিবহন ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা মোটের ওপর ভ্রমণে যা যা দরকার সবটাই আমাদের তত্ত্বাবধানে থাকে।
ট্রাভেল বিডি : দেশে যারা ডকুমেন্টারি বানাতে আসেন বা সুন্দরবনে ঘুরতে আসেন আপনারা তাদেরকে নিয়েও কাজ করেন৷ বিষয়টা বেশ কৌতুহলপূর্ণ৷ এরকম কাজে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?


ট্রাভেল বিডি : দেশের বাইরে থেকে তারা এদেশে ঘুরতে আসেন, নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি -তাদের কি ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় বা এদেশ থেকে তাদের প্রত্যাশাই বা কি থাকে?
রফিকুল ইসলাম নাসিম : আমি ইতিবাচক দিক থেকেই বলবো আমাদের গ্রাহকদের ৬০ শতাংশ জাপান মার্কেট থেকে আসেন, বাকি ৪০ শতাংশ ইউরোপিয়ান মার্কেট, ইউএস মার্কেট থেকে। যারাই আসেন তাদের কারোই কিন্তু বাংলাদেশ থেকে খুব একটা বড় ধরণের প্রত্যাশা থাকেনা। তারা আসলে জানেন আমাদের প্রতিবন্ধকতা কি কি। এটা আমাদের জন্য বিরাট সুবিধা। বরং দেশে আসার পর তাদেরকে প্রত্যাশার চাইতে বেশি কিছু পেয়ে যেতেও দেখেছি।


আরও জানতে : দেশের পর্যটন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারলে ব্যাপক উন্নতি সম্ভব
কিন্তু, যদি একজন ব্যাকপ্যাকার আসতে চায়, তার জন্য কিন্তু অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ একজন ব্যাকপ্যাকার যখন বাংলাদেশে আসবে, কোনো ট্যুর গাইড ছাড়া, একটা ব্যক্তিগত পরিকল্পনা নিয়ে, তখন কিন্তু সে কোথায় থাকবে? একক ট্যুরে কিন্তু সবশেষ তথ্য নেই। সেই পনের বছরের পুরনো তথ্য। তারা এখনও নবাবপুরের হোটেল প্রমোট করছে। অথচ আমার নতুন শহরে অনেক ভাল হোটেল আছে বেশ কম খরচের মধ্যে। সে একটা বাসের টিকেট কেটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাবে, সেটা খুব সহজ না। বাইরের দেশে দ্রুত গিয়ে ট্রেনের টিকেট কাটা যায়, আমাদের এখানে ট্রেনের শিডিউল, ট্রেনের টিকেট খুবই অদ্ভুত একটা পদ্ধতি। এই যে ব্যাকপ্যাকারদের যে সীমাবদ্ধতা, সেটা আসলে বড় সীমাবদ্ধতা। কিন্তু, যারা গাইড ট্যুরে আসে, তাদের যেহেতু আমরা সহায়তা প্রদান করি, তাদেরকে খুব একটা বেগ পেতে হয়না। কিন্তু ব্যাকপ্যাকারদের জন্য আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গিয়েছে। এখানে সরকারের বেশ কাজ করার সুযোগ আছে।
ট্রাভেল বিডি : এই বিষয়গুলো বেশ কৌতূহল জাগিয়ে তোলার মত। অনেক কিছু জানা সম্ভব হলো। একটা জিনিস জানতে চাই, এখন অনেকেই নতুন ভাবে ট্যুর আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, সবাই ইন্টারনাল ট্যুরিজম বিষয়টাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটা করোনা হোক বা তার আগে। আন্তর্জাতিক যারা পর্যটক আছে তাদেরকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা এই বিষয়ে কেউ একজন যদি কাজ করতে চায়, এমন একজনের প্রতি আপনার পুরো উপদেশ যদি ছোট পরিসরে দেয়া সম্ভব হয়
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ঐশ্বর্য মীম এস এম