বাংলাদেশের মানুষের অহংকার ইলিশ মাছ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল :আদিকাল থেকে আদ্যবদি মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে জড়িয়ে আছে ইলিশ মাছ

ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পরা ইলিশ। ছীব : পরিবেশ ডট কম

 ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। বাংলাদেশের মোট মৎস উৎপাদেন উন্মুক্ত জলাশয়ের অবদান প্রায় শতকরা ৪২ ভাগ এবং ইলিশ মাছের অবদান এককভাবে শতকরা ১২ ভাগ। একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশ মাছ সর্ববৃহৎ এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ।

  • লোকজ সাহিত্য সংস্কৃতিতে ইলিশ মাছের সম্পৃক্ততা :
প্রাচীন বাংলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং লোকজ সংস্কৃতির ইতিহাসের দিকে তাকালে সেই নির্দশন মেলে। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ইলশে গুড়ি কবিতা এখনও আমাদের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
  • কর্মসংস্থানে ইলিশ মাছের ভূমিকা :
কর্মসংস্থানেও ইলিশ মাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশের ৪০টি জেলার ১৪৫টি উপজেলার ১৫০০টি ইউনিয়নের ৪ লাখা ৫০ হাজার জেলে ইলিশ মাছ ধরে থাকে (২০১১-১৩ সমীক্ষা অনুসারে)। উক্ত জেলেদের মধ্যে গড়ে ৩২ শতাংশ সার্বাক্ষনিকভাবে এবং ৬৮ শতাংশ খণ্ডকালীন সময়ে ইলিশ মাছ আহরণ করে। ইলিশ ধরা ছাড়াও বিপনন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি, জাল-নৌকা তৈরি ইত্যাদি কাজে সার্বিকভাব্র প্রায় ২০-২৫ লাখ লোক জীবন-জীবিকার জন্যে এই মাছের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের ৬টি বিভাগের মধ্যে বরিশাল বিভাগেই ইলিশ জেলের সংখ্যা সর্বাধিক এক-দেড় লাখ এবং এই বিভাগের প্রায় ৬৫ শতাংশ জেলে সার্বক্ষণিকভাবে ইলিশ মাছ আহরণ করে।

  • ইলিশ মাছের বিশেষ সংরক্ষন পদ্ধতি ও রপ্তানি :
প্যাকেটজাত ইলিশ। ছবি: সংগৃহীত

 ইলিশ মাছের কৌটাজাতকরণ বা ক্যানিং এর ফলাফল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশ মৎস গবেষনা ইনষ্টিটিউট এর নদীকেন্দ্রিক পরীক্ষামূলকভাবে উচ্চ চাপ ও তাপ প্রয়োগেই মাছকে কাটামুক্ত করে সফলভাবে কৌটাজাত করা হয়েছে। উক্ত কৌটাজাত করণ পদ্ধতি বানিজ্যিকভাবে প্রচলন করা সম্ভব হলেও কৌটাজাত মাছ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সুগম হবে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশে ইলিশ মাছের লবণাক্ত ডিমের ব্যাপক চাহিদা এবং উচ্চ বাজার মূল্য রয়েছে (প্রতি কেজি ৬০-৭০ আমেরিকান ডলার)। আমাদের দেশ হতে কিছু পরিমাণ ইলিশ মাছ মালয়েশিয়াতে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে রপ্তানি করা হয়। তবে লবণাক্ত ডিম মালয়েশিয়াতে রপ্তানি করা হয় না। এ প্রেক্ষাপটে ইলিশ মাছের লবণাক্ত ডিম প্রস্তুত করে রপ্তানি করা হলে অধিক পরিমানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কতা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ হতে প্রতিবছর ২,০০০-৮,০০০ মেট্রিকটন ইলিশ মাছ বরফ দিয়ে ভারতে এবং হিমায়িত মাছের সাথে ৮০০-৯০০ মেট্রিক টন ইলিশ মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপের অন্যান্য দেশের মধ্যে অষ্ট্রেলিয়াতেও রপ্তানি করা হয়। উল্লেখিত দেশগুলোতে ইলিশ মাছের ব্যাপক চাহিদা ও উচ্চ বাজার মূল্য পরিলক্ষিত হয়।

নোনা ইলিশ। ছবি : দেবজানি

 বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতিবন্ধকতা ও ব্যবস্থাপনা কৌশল হিসেবে নিন্মলিখিত পদক্ষেপ সমূহ গ্রহন করা যেতে পারে ।

  • অধিক ডিম/পোনা উৎপাদনের জন্যে ইলিশ মাছ সংরক্ষন ও অবাধ প্রজনন সুবিধা সৃষ্টি।
  • জাটকা সংরক্ষণ করা।
  • ইলিশ মাছের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া।
  • ইলিশ মাছের অতি আহরণ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা।
  • ইলিশ মাছের আবাস্থল ও পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা।
  • সকল স্তরের জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
  • ইলিশ মাছের আহরণ পরিসংখ্যান নির্ণয় পদ্ধতির উন্নয়ন করা।
  • প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
  • ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার জন্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
  • ইলিশ ব্যবস্থাপনার জন্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ গ্রহন করা।
  • ইলিশ মাছ পরিবহন, বাজারজাতকরণের পদ্ধতি উন্নয়ন এবং মান নিয়ন্ত্রণ।
  • ইলিশ মাছের বিভিন্ন প্রোডাক্ট তৈরি ও রপ্তানি বৃদ্ধি।
ইলিশ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে এবং সার্বিকভাবে সকল স্তরের জনসাধারণ ইলিশ সম্পদ উন্নয়নে আরও আগ্রহী হবে।   
তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট fri.gov.bd