এক নজরে দেখে নিই কোলকাতার সেরা স্থাপত্যসমূহ

ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোলকাতা




ফোর্ট উইলিয়াম, কোলকাতা।

ফোর্ট উইলিয়াম। ছবি : সংগৃহীত



 ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশের রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কোলকাতা। এই শহরটির প্রতি তাই বাংলাদেশিদের টান অনেক অতীতের। সীমানা দিয়ে স্থান ভাগ করা গেলেও দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যকার যে টান তা তো বিভক্ত করা যায় না। ১৯৪৭ এ দেশ বিভাগের আগে দুটি অঞ্চল একই সীমানায় ছিল, এখন আলাদা হলেও এপার বাংলার প্রতি ওপার বাংলার মানুষের যে আগ্রহ ঠিক তেমনই ওপার বাংলার প্রতি এপার বাংলার মানুষের একই পরিমাণ আগ্রহ। আর তাই আমাদের কাছে ওপার বাংলার কোলকাতা যেন খুবই পরিচিত এক নাম। কোলকাতা এমন এক শহর যাকে ‘সিটি অফ জয়’ বলে ডাকে বিশ্ববাসী। কোলকাতা ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। বহু বছর ধরে কোলকাতা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে চিহ্ণিত হয়েছে। সংস্কৃতির সাথে সাথে কোলকাতা একটি ঐতিহাসিক শহর হিসেবেও বিশ্বে গুরুত্বপূর্ন স্থান অর্জন করেছে। তাহলে আজ আমরা ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদেরকে কোলকাতার কিছু ঐতিহাসিক এবং গৌরবান্বিত স্থান সম্পর্কে জানাবো।

ফোর্ট উইলিয়াম

কোলকাতার সবচেয়ে প্রাচীনতম ইমারত হিসেবে পরিচিত ফোর্ট উইলিয়াম, ইংরেজদের দ্বারা এটাই সবার আগে নির্মিত। ১৬৯৬ সাল থেকে ১৭০৬ সালের মধ্যে ফোর্ট উইলিয়ামটি নির্মাণ করা হয়। এই ঐতিহাসিক ইমারতটি তৃতীয় উইলিয়াম নামে নামকরণ করা হয়। ১৭৫৬ সালে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ উদ দৌল্লা ফোর্ট উইলিয়ামে আক্রমন করেন। তারপর ইংরেজরা ইমারতটি ময়দানে অপসরণ করে। পুরনো ইমারতটি আবার ১৭৫৬ সালে দখল করে ইংরেজরা। এখন সেই ফোর্ট উইলিয়ামটি ময়দানের কাছে দেখা যায়। সেটি আসলে ভারতীয় সেনা দ্বারা অধিকৃত। সাধারণ মানুষজন ফোর্ট উইলিয়ামে ঢুকতে পারেন না কিন্তু হুগলী ঘাট থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের এক অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়।


কোলকাতা, মহাকরণ

মহাকরণ। ছবি : সংগৃহীত



মহাকরণ

১৭৭৭ সালে ইংরেজদের দ্বারা নির্মান শুরু হয়েছিল মহাকরণের, যা রাইটার্স বিল্ডিং নামেও পরিচিত। ইংরেজরা যখন এই দেশে শাসন করতে আসে তখন রাজকর্মচারীদের কাজ কর্মের জন্যে এই ইমারতটি স্থাপিত করা হয়। বর্তমানে এইটি মহাকরণ নামে নামাঙ্কিত হয়। এই রাইটার্স বিল্ডিং বিখ্যাত হয়ে আছে ১৯৩০ সালের বাংলার বিপ্লবী বিনয়-বাদল-দীনেশ কর্তৃক অলিন্দ যুদ্ধের জন্য। ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর কুখ্যাত ইন্সপেক্টর জেনারেল-ইন-চিফ কর্নেল এন. এস.সিমসনকে হত্যা করেন বিনয় -বাদল-দীনেশ। এই যুদ্ধের ফলে ইংরেজরা উৎখাত নাহলেও তাদের সাম্রাজ্যবাদী ভিত নড়ে গিয়েছিল। তাদের সেই ঐতিহাসিক এবং আত্মবলিদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বিনয়-বাদল-দীনেশের মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এই স্থানটি  বি-বা-দি বাগ নামে পরিচিত। স্বাধীনতার পরে এই রাইটার্স বিল্ডিং মন্ত্রী,আমলা এবং সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থল রূপে পরিগণিত হয় এবং নামকরণ হয় মহাকরণ। যদিও ২০১৩ সাল থেকে মহাকরণের সংস্কারের জন্য এটি স্থানান্তরিত হয়েছে হাওড়া জেলার নবান্নতে।


ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সৌধটি ইংরেজ আমলে রানী ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। সেই সময়কার ভাইসরয় লর্ড কার্জনের মস্তিষ্ক প্রসূত হলো এটি । এই স্মৃতি সৌধটি মাকরানা মারবেল পাথর দিয়ে বানানো। বৃহৎ সবুজ বাগানের মাঝে এই স্মৃতি সৌধটি এক মনোরম দৃশ্য যোগায় দর্শনার্থীদের জন্য। ভিতরে একটি বিরাট সংগ্রহশালা রয়েছে যার মধ্যে ইংরেজ আমলের মুদ্রা,বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র,মানচিত্র,তৈলচিত্র,ভাস্কর্য ইত্যাদি সংরক্ষিত আছে।


মার্বেল প্রাসাদ

মার্বেল প্রাসাদ। ছবি : সংগৃহীত


 

মার্বেল প্যালেস

১৮৩৫ সালে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক দ্বারা নির্মিত এই মার্বেল প্যালেস। প্রাসাদটি দুগ্ধ স্বরূপ সাদা মার্বেল দিয়ে নির্মিত। প্রাসাদটির ভিতর একটি ছোট চিড়িয়াখানাও আছে যা ভারতের প্রথম চিড়িয়াখানা। প্রাসাদটি সেই সময়কার বাংলার আভিজাত্যের সাক্ষ্য বহন করে। মার্বেল প‍্যালেসের ভিতর অভিজ্ঞ এবং বিখ্যাত শিল্পীদের দ্বারা অঙ্কনচিত্র প্রদর্শিত আছে। বর্তমানে রাজপরিবারের বংশধরেরা এই মার্বেল প্যালেসে বসবাস করে। এই মার্বেল প‍্যালেসের ঢোকার জন্য ২৪ ঘন্টা আগে থেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্যুরিজমের দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়া দরকার।

ন্যাশনাল লাইব্রেরি

কোলকাতার আলিপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল লাইব্রেরি হলো ভারতের বৃহত্তম গ্রন্থাগার। ন্যাশনাল লাইব্রেরি ১৯৫৩ সালে পুনঃ স্থাপন হয় করা হয়। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে অন্তত ২.২ মিলিয়ন বই সংরক্ষিত করা আছে। স্বাধীনতার পর ন্যাশনাল লাইব্রেরি হলো পশ্চিম বাংলার এল.টি. গভর্নর জেনারেলের বাসস্থান। এই গ্রন্থাগারে ভারতের মোটামুটি সবকটি ভাষার বইয়ের অগাধ ভান্ডার। বিভিন্ন ধরণের বই সংরিক্ষিত করা আছে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে।


কোলকাতা, ন্যাশনাল লাইব্রেরি

ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ছবি : সংগৃহীত


কোলকাতার মত শহরে প্রচুর ঐতিহাসিক জায়গার মধ্যে গুটিকয়েক স্থানের বিষয়ে লিখলাম। কোলকাতার অনেক ঐতিহাসিক স্থান রক্ষনা বেক্ষনের অভাবে জীর্ণ হয়ে পরে আছে। এই সব স্থানের সঠিক দেখভালের প্রয়োজন আছে যাতে এই স্থানগুলি দেখে আমাদের প্রজন্ম গৌরবান্বিত  বোধ করে। কিন্তু যাই হোক না কেন আমরা সহজেই কোলকাতাবাসী হিসেবে বলতে পারি যে কোলকাতা আমাদের ভালোবাসার এবং প্রাণের শহর।  

নাবিলা বুশরা    এস এম