ইউরোপ মহাদেশের বৈচিত্র্যের যেন শেষ নেই। পশ্চিম ইউরোপের যেমন রোমান ধ্যানধারণা রাজত্ব করে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলে তেমনই রাজত্ব করে অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আবার একটু সরে এসে পূর্ব ইউরোপে বাল্টিক সাগরের পাড়ে লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়ার মত দেশে আসলে আপনি দেখতে পাবেন শ্রমজীবী মানুষের তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের ফসল।
বাল্টিক পাড়ের দেশগুলোর মাঝে আছে লিথুনিয়া, লাটভিয়া, এস্তোনিয়া, কিছুক্ষেত্রে রাশিয়ার অংশবিশেষ এবং নরওয়েকেও এই অঞ্চলে ধরা হয়। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের ধারাবাহিক ইউরোপ পর্বে আজ থাকছে পূর্ব ইউরোপের বাল্টিক অঞ্চলের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য স্থানের বিবরণ।
বারো শতকের গথিক স্থাপনা ও ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যুগোল এক অভিজ্ঞতা পাবেন ভিলনিয়াসে; ছবি : ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ জার্নি
লিথুনিয়ার রাজধানী শহর ভিলনিয়াসের লিথুনিয়া তো বটেই সমগ্র পূর্ব ইউরোপের প্রতিচ্ছবি বলা চলে। ১৩২৩ সালে গোড়াপত্তন হবার পর থেকেই ভিলনিয়াস এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে বিরাজ করে আসছে। আশপাশের অনেক শহর আর বন্দরের প্রেরণা হিসেবে ছিল ভিলনিয়াস।
এখানে এসে যে কেউ বারো শতকের গথিক স্থাপনা যেমন পাবেন, ঠিক তেমনভাবে পাবেন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের দর্শনটাও।
সেই সাথে একেবারেই নান্দনিক এবং নিজস্ব কিছু স্থাপনার দিকে যে কারো চোখ আটকে যেতে বাধ্য।
এতসব বৈচিত্র্যময় আয়োজনের জন্যই ১৯৯৪ সালেই ইউনেস্কোর কাছে স্বীকৃতি পেয়ে যায় শহরটি। লিথুনিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য নিয়ে জানার জন্য আপনাকে ভিলনিয়াসে পা রাখতেই হবে। এবং শহরের পুরাতন অংশে তো অবশ্যই। জাদুঘর এবং বিশ্বের সেরা কিছু রেস্টুরেন্টের বাইরে আরও অনেক অসাধারণ কিছুই আছে এই শহরে।
প্রাচীন স্থাপত্যের দর্শন পেতে লাটভিয়ার পুরাতন রিগা শহর; ছবি : ল্যাটভিয়া ট্রাভেল
বেশ কয়েক শতক ধরেই লাটভিয়ার উত্থান পতন জড়িয়ে আছে এই রিগা শহরের উপর ভিত্তি করে। এটি লাটভিয়ার অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু বললে মোটেই অত্যুক্তি হবেনা। অনেকের মতেই পুরাতন রিগা শহরেই আছে পূর্ব ইউরোপের সেরা কিছু স্থাপনা।
শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে একেবারেই আধুনিক ডিজাইনের শত শত বাড়ি। স্থাপত্যবিদ্যার পোকা হয়ে থাকলে লাটভিয়ার পুরাতন রিগা শহর আপনার জন্য আদর্শ ঘোরার জায়গা। আর আধুনিক দালান বাদ দিলে ইতিহাসের নানা গল্পের জন্য রিগার সরু রাস্তা ও প্রাচীন ভবনগুলো তো থাকছেই।
পৃথিবীতে প্রথমবারের মত সঠিকভাবে আহ্নিক রেখা নির্ধারণ করে এই স্ট্রুভ জিওডেটিক আর্ক; ছবি : ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
নরওয়ের হেমারফেস্ট থেকে কৃষ্ণসাগর। মাঝে ১০টি দেশ। ২,৮২০ কিলোমিটার জায়গা। এটি মূলত দূরত্ব পরিমাপক। কিন্তু এই পরিচয় পাবার পর যদি মনে হয় এ আর এমন কি! তবে জেনে রাখুন, এই স্ট্রুভ জিওডেটিক আর্ক পৃথিবীতে প্রথমবারের মত সঠিকভাবে আহ্নিক রেখা নির্ধারণ করেছিল।
রাশিয়ার বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক জর্জ উইলহেম ভন স্ট্রুভ পৃথিবীর সঠিক আকার এবং আকৃতি নির্ণয়ের জন্য এই সার্ভে করেছিলেন।
মোট আটটি স্থানে এখনও সেই প্রাচীন গবেষণার স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গিয়েছে। যদিও এর সৌন্দর্য দেখতে বা এ সম্পর্কে জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে এস্তোনিয়াতে।
তারতু অবজেভেটরিতে আপনি দেখতে পাবেন ১৯ শতকের বৈজ্ঞানিক যাত্রার এই স্মারকটিকে। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ থাকলে আপনার ইউরোপ যাত্রায় এটি অবশ্যই থাকা উচিত।
প্রাচীন স্থাপনা, দুর্গ ও প্রত্নতত্ত্বের এই ভান্ডার লিথুনিয়ার এই পুরাতন রাজধানী কেরনাভ; ছবি : সংগৃহীত
লিথুনিয়ার পূর্ব রাজধানী কেরনাভ। প্রচুর ধ্বংসাবশেষ, দুর্গ আর স্মৃতিস্মারকে ঠাসা এই শহর। একেবারে প্যালিওলিথিক যুগ থেকে মধ্যযুগ! সবই আছে এই শহরের মাঝে। এখনও প্রতিবছর উৎসবের রঙে রঙিন হয় এই শহরটি। রাজধানী সরে গেলেও কেরনাভ এখনো আছে লিথুনিয়ার অন্যতম বড় আকর্ষণ হয়ে।
তালিন, এস্তোনিয়া (Tallinn, Estonia)
ঐতিহাসিক নানান স্থাপনায় পূর্ণ এস্তোনিয়ার তালিন শহর; ছবি : ট্রাফালগার
ভিলনিয়াস বা রিগার চেয়ে ইতিহাস ঐতিহ্যের দিক থেকে এই শহরটি কোনভাবেই পিছিয়ে নেই। তালিন শহরটি এত বেশি ইতিহাস ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ যে, এর কোনো অংশ আলাদাভাবে শনাক্ত করা দুষ্কর। যুদ্ধের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও এস্তোনিয়ার মানুষ এই শহরকে এত নিপুণভাবে সংরক্ষণ করেছে, যা দেখে বিস্মিত হতে হয়।
ত্রয়োদশ শতক থেকেই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক বিবেচনায় তালিন শহরের জুড়ি ছিল না। বিশেষ করে শহরের বিভিন্ন চার্চ এবং টাউন হলের সৌন্দর্য আজো পর্যটকদের মুগ্ধ করে রাখতে সক্ষম।
পূর্ব ইউরোপে বাল্টিক পাড়ের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ কুরোনিয়ান স্পিট; ছবি : এয়ারপানো
শুধুমাত্র মানুষ চাইলে যে প্রকৃতি কত সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা যায় তার আদর্শ নিদর্শন রাশিয়ার কুরোনিয়ান স্পিট। বাল্টিক সাগরের ঢেউয়ে এখানকার বিশাল সব বালুকাময় পর্বত ভাঙলেও স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় এটি পরিণত হয়েছে পূর্ব ইউরোপে বাল্টিক পাড়ের সবচেয়ে সুন্দর স্থান হিসেবে।
শুধুমাত্র সৌন্দর্যের বাইরে গিয়েও স্থানীয় জনগণের প্রচেষ্টার সম্মান হিসেবে ২০০০ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় একে অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেস্কো।