ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট : ইউরোপ মহাদেশ (ফ্রান্সের পথে প্রান্তরে)

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ ও সর্বাধিক ভ্রমণ করা দেশ





মন্ট সেইন্ট মাইকেল, ফ্রান্স। ছবি : ব্রিটানিকা


 অন্নদাশঙ্কর রায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা। অনিন্দ্য সৌন্দর্য্যের দেশ, নেপোলিয়নের দেশ, ক্যাফে আর সুগন্ধির দেশ। পর্যটনের জন্য ফ্রান্সের জুড়ি মেলা ভার। পশ্চিম ইউরোপের এই দেশে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সংখ্যা ৪২টি। অসাধারণ সেসব সাইটের গুটিকয়েক থাকছে এবারের পর্বে।


মন্ট-সেইন্ট-মাইকেল

ফ্রান্সের উত্তর পশ্চিমে নরম্যান্ডি উপকূলের প্রায় ৬০০ মিটার দূরে এক অনবদ্য জায়গা মন্ট-সেইন্ট-মাইকেল। প্রাচীন এই জায়গাটি আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে অষ্টম শতকের দিনগুলোতে। প্রতিরক্ষার জন্য নির্মিত দূর্গ সদৃশ এই জায়গাটি সত্যিকার অর্থে কখনোই দখলের হাতে পড়েনি। আর এজন্য ধন্যবাদ দিতে হয় নরম্যান্ডি উপকূলের জোয়ার ভাটাকে।




মন্ট সেইন্ট মাইকেল, ফ্রান্স। ছবি : উইকিপিডিয়া


ভিক্টর হুগোর ভাষায় যাকে বলা চলে, 'দ্রুতগামী ঘোড়ার মত যা নিজেকে বদলে নিতে পারে'। সন্ন্যাসীরদের মঠ, দূর্গ, কয়েদীদের জন্য জেলখানাসহ এককালে এর সবই ছিল মন্ট-সেইন্ট-মাইকেলে। আর এখন এটি ফ্রান্সের অন্যতম এক দর্শনীয় স্থান। ফ্রান্সের মধ্যযুগীয় পার্থিব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবার জন্য মন্ট-সেইন্ট-মাইকেলের বিকল্প নেই বললেই চলে।

সীন নদী তীরের প্যারিস

সীন নদীর তীরের প্যারিস যুগে যুগে মানুষকে মুগ্ধ করেছে। ভালবাসার শহর (The city of love) হিসেবে খ্যাতনামা এই শহর ভাবতে শিখিয়েছে। প্যারিস মানেই বাস্তবের বুকে ঠাঁই করে নেয়া এক রূপকথা। এরমাঝে আইফেল টাওয়ার থেকে সীন নদীর তীর ধরে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে নটরডেম ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত জায়গাটি বিশ্বের কাছে ফ্রান্সের মহিমা বাড়িয়েছে আরও হাজারগুণ।




সীন নদী থেকে নান্দনিক আইফেল টাওয়ার। ছবি : সংগৃহীত


এই পুরো জায়গাটি ঠাঁই পেয়েছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়। এই ৫ কিলোমিটার জায়গার মাঝেই পাবেন জগতবিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, গ্র্যান্ড প্যালেস আর সিটি হল। আর ল্যুভর মিউজিয়ামে গেলে নিশ্চিতভাবেই আপনার দেখা হতে পারে জগতের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক সব কীর্তির সাথে।

পাথরের শহর কারকাসোন

প্রায় দুহাজার বছরের পুরাতন এই শহরটি নির্মিত হয়েছিল ফ্রান্সের বাইরের অধিবাসীদের মাধ্যমে। কারকাসোন মূলত ফ্রান্সের দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত এক পাথরে নির্মিত শহর। ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী আটলান্টিক মহাসাগর আর ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি অঞ্চলে অবস্থিত।




ভিলা থেকে পাথরের শহর কারকাসোন। ছবি : উইকিপিডিয়া


 শহরের গঠন দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারনা, শহরটি খুব সম্ভব দুইদিকের সাগর থেকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে কারকাসোন শহরটি কেবলমাত্র এর গাঠনিক সৌন্দর্য্যের জন্যই না, একইসাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্যেও দর্শকের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে।

ভার্সাই নগরীর প্রাসাদ এবং পার্ক

ভার্সাই নগরীর নাম বললেই আমাদের মনে চলে আসে বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তী মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা, কিংবা দুনিয়ার বিখ্যাত সব চুক্তির কথা। ইউরোপে গিয়ে ফ্রান্সের এই ভার্সাই নগরীতেই ছিলেন মধুসূদন দত্ত। এই শহরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তিতে শান্তি চুক্তিটি হয়েছিল। ফ্রান্সের ভার্সাই নগরী বেশ রাজকীয় নগরী বলা চলে।




বিখ্যাত ভার্সাই নগরী। ছবি : সংগৃহীত


 এখানকার ভার্সাই প্রাসাদই ছিল ফ্রান্সের সর্বশেষ রাজা লুইসের আবাস্থল ছিল এখানেই। সপ্তদশ শতকের সেরা স্থাপত্যবিদদের তৈরি এই প্রাসাদটি পুরো ফ্রান্সের রাজসিক ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের দর্পণ বলা চলে। সামনের বাগান থেকে হল অফ মিরর পর্যন্ত যেতে যেতে আপনার কেবলই মনে, এটি বাস্তবের মাঝে এক অপার্থিব জগতের অংশ।

চার্ট্রেস ক্যাথেড্রাল

ফ্রান্সের অন্যতম সেরা ক্যাথেড্রাল যদি বলা হয় চার্ট্রেস ক্যাথেড্রালকে, তবে তা কোনভাবেই বাড়াবাড়ি হবে না। ১২ শতকের শুরু থেকে ১৬ শতক পর্যন্ত ফ্রান্সে গড়ে ওঠা গথিক স্থাপত্যবিদ্যার একেবারেই প্রথম দিকে নিদর্শনেই ক্যাথিড্রালটি।




নটর ডেম ক্যাথিড্রাল চাট্রেস। ছবি : উইকিপিডিয়া


রাজধানী প্যারিস থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত এই ক্যাথেড্রালটি বিখ্যাত এই উঁচু চূড়ার জন্য। এই দুইটি উঁচু চূড়ার উচ্চতা যথাক্রমে ১০৫ এবং ১১৩ মিটার। শুধুমাত্র বাইরে থেকে এই ক্যাথেড্রালের জানালার যে সৌন্দর্য্য দেখা যায়, তাতেও যে কারো চোখ কপালে উঠতে পারে।

অ্যাভিগনানের হিস্ট্রিকাল সেন্টার

চতুর্দশ শতকে যখন ভ্যাটিকান সিটি ক্রমাগত ভাঙ্গাগড়ার মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পোপের আবাস স্থান ছিল ফ্রান্সের অ্যাভিগনান শহরে। পরবর্তীতে দুনিয়াজোড়া এই শহরের পরিচয় হয় প্রাচীন পপের শহর নামে। পুরো শহরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঐতিহাসিক সব স্থাপনা। যার মাঝে প্যাপাল প্যালেস বা পোপের বাসস্থান ছাড়াও উল্লেখ করা যায় নটরডেম দেস ডোম ক্যাথেড্রাল।




অ্যাভিগনান শহর, ফ্রান্স। ছবি : সংগৃহীত


 এছাড়া, ইউনেস্কোর আরেকতি হেরিটেজ সাইট সেইন্ট-বেনেজেত ব্রিজের অবস্থানও এখানেই। ফ্রান্স ভ্রমণে এসে ফ্রান্সের ইতিহাস ঐতিহ্য জানার আগ্রহ থাকলে এই প্রাচিন অ্যাভিগনান শহরে আপনাকে একবার অন্তত পা রাখতেই হবে।

আর্লস শহর

পশ্চিম ইউরোপের আর সব দেশের মতই ফ্রান্সের বুকেও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন। ফ্রান্সের অন্যতম বড় দুই শহর মন্টেপিলিয়ার আর মার্সেই এর মাঝের শহর আর্লসে আপনি দেখা পাবেন সেই কাঙ্খিত স্থাপনাগুলোর।




আর্লস শহর, ফ্রান্স। ছবি : উইকিপিডিয়া


খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৮০০ বছর আগে লিগুরিয়ানদের হাতে এই শহরের পত্তন ঘটে। পরে তাতে নিজেদের সাম্রাজ্যের ছাপ রাখে রোমানরা। সু-প্রাচীন এই শহরে রোমান সম্রাজ্যের আগে থেকেই আছে অসাধারণ সব স্থাপনা। যার মাঝে অন্যতম আর্লস এম্ফিথিয়েটার, কনস্ট্যান্টিনের আবাসস্থল, সেইন্ট থ্রম্পির চার্চ সহ আরও অনেক স্থাপনা।  

জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম