ঐতিহাসিক কল্যাণ দীঘি : রাজবাড়ী

রাজা সীতারামের সৈন্যদল রাজার আদেশে দীঘির খনন কাজ করতো


কল্যাণ দীঘি

ছবি : সংগৃহীত



ইতিহাস-ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ঢাকা বিভাগের অন্যতম একটা জেলা রাজবাড়ী। নানান সময় এই জেলার বিভিন্ন অংশ ফরিদপুর, রাজশাহী ও যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলও। ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কৃষিভিত্তিক এই জেলাটিকে ঘিরে বয়েছে প্রমত্তা পদ্মা, চন্দনা, গড়াই ও হড়াই নদী। অঞ্চলটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজার শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিলও। আর এইসব রাজার আমলের নানান ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে একটি কল্যাণ দীঘি (Kalyan Dighi)। ঐতিহাসিক কল্যাণ দীঘি রাজবাড়ী শহর থেকে ৬ মাইল পশ্চিমে নবাবপুর ইউনিয়নের রাজধারপুর গ্রামে অবস্থিত। প্রায় ১৬ খাদা জমির ওপরে এই দীঘিটি অবস্থিত। (খাদা জমি মাপার একক। ১৬ বিঘা জমি নিয়ে ১ খাদা এবং ১ বিঘা বা পাখিতে জমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ)। বিশাল এই দীঘির খননের ইতিহাস নিয়ে দুটি মতভেদ রয়েছে। একটির সাথে জড়িত রয়েছে রাজা সীতারাম ও অন্যটির সাথে জড়িত আছেন খান জাহান আলী। দুই মতবাদের যেকোনো একটার হিসেব ধরলেও দীঘিটা ৪০০ থেকে ৬০০ বছর আগে খনন করা হয়। চলুন এই দুটি মতবাদ নিয়েই বিস্তারিত জেনে আসা যাক।


ইতিহাস ও মতবাদ

ইতিহাস হতে জানা যায়, এক সময় এই অঞ্চল শাসন করতেন রাজা সীতারাম। দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল রাজা সীতারাম রায়ের। তিনি এক সময় মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। রাজা সীতারামের রাজধানী ছিলও মহম্মদপুরে বা বর্তমান মাগুরা অঞ্চলে। মহম্মদপুরে রাজা সীতারাম রাজ্যের পানি সমস্যা দূরীকরণে বেশ কয়েকটি দীঘি খনন করেন। তাঁর খননকৃত দীঘির মধ্যে রাম সাগর, সুখ সাগর, কৃষ্ণ সাগর দীঘি উল্লেখযোগ্য। ধারনা করা হয়, সীতারাম এখানে তাঁর সৈন্যদের দিয়ে কল্যাণ দীঘি খনন করিয়ে নেন। এখানে বেল গাছিতে রাজা সীতারামের খনন করা একটি পুকুর ও রয়েছে। উল্লেখ্য যে, রাজা সীতারামের সৈন্যদল যুদ্ধের সময় ব্যতীত অন্যান্য সময়ে রাজার আদেশে দীঘির খনন কাজও করতো।


রাজা সীতারামের খননকৃত হলে কল্যাণ দীঘির বয়স আনুমানিক চারশত বছর

অন্য সূত্র মতে, বিখ্যাত মুসলিম ধর্ম প্রচারক ও বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক হযরত খান জাহান আলী (র.)-এর আমলের অন্যতম কীর্তির একটি এই কল্যাণ দীঘি। খান জাহান আলী বাগেরহাট ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন দীঘি খনন করেন। খান জাহান আলী ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কয়েকজন ধর্ম প্রচারককে এই অঞ্চলে পাঠান। ধারণা করা হয়, ঐ সময়েই এই দিঘী খনন করা হয়। অনেকেই দীঘির আয়তনের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করছেন কল্যাণ দীঘি খান জাহান আলীর সময়েরই। কেননা রাজা সীতারাম রায়ের আমলের খননকৃত অন্যান্য দীঘির সাথে খান জাহান আলীর খননকৃত দীঘির আয়তনের দিক থেকে বেশ পার্থক্য রয়েছে।

খান জাহান আলী কর্তৃক খননকৃত দীঘি গুলো তুলনামূলক ভাবে বেশ বড় আর কল্যাণ দিঘীও রাজা সীতারাম কর্তৃক খননকৃত দীঘির তুলনায় আয়তনে অনেক বড়। খান জাহান আলীর সময়ের দিঘী হলে কল্যাণ দীঘির বয়স প্রায় ছয়শ বছর। আয়তনের দিক বাদেও সুলতানি আমলে এই অঞ্চলে মুসলিমদের প্রাধান্য ছিল। কল্যাণ দীঘির পার্শ্ববর্তী অঞ্চল বর্ধিষ্ণু অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং এখানে বিভিন্ন আউলিয়ার আগমনের তথ্য পাওয়া যায়। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে এখানে দুজন পীর আউলিয়ার আগমনের তথ্য রয়েছে। তারা হলেন পীর শাহ পাহলোয়ান ও শাহ সাদুল্লা। অর্থাৎ রাজা সীতারাম রায়ের আগেও এই অঞ্চলে মুসলিমদের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দীঘিটি হযরত খান জাহান আলীর আমলেই খননকৃত বলে ধারণা পোক্ত হয়।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকার গাবতলি থেকে বেশ কয়েকটি বাস রাজবাড়ী যাতায়াত করে। রাজবাড়ী পরিবহন, রাবেয়া, সাউদিয়া, সপ্তবর্ণ পরিবহনের বাস রয়েছে এখানে। এছাড়াও বি আর টি সি বাসে পাটুরিয়া এসে লঞ্চে নদী পার পুনরায় বাসে চড়ে রাজবাড়ী যেতে পারেন। এভাবে যাওয়াটা অনেকটা সাশ্রয়ী। রাজবাড়ী শহরে পৌঁছে ইজিবাইক বা নসিমনে কল্যাণ দীঘি।  

সাখাওয়াত হোসেন   এস এম