কিয়োটো : হাজার বছরের ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অবিশ্বাস্য শহর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাটকীয়ভাবে বেঁচে যায় শহরটি


কিয়োটো জাপান

নয়নাভিরাম কিয়োটো, জাপান। ছবি : গেটি ইমেজ


প্রশান্ত মহাসাগরের একদম পূর্ব কোণে প্রায় ৭ হাজার দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা ছোট্ট একটি দেশ জাপান। আয়তনে ক্ষুদ্র এই দেশটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের অসীম বিস্ময়। একসময়ে যুদ্ধপ্রবন দেশটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তছনছ হয়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে এমনভাবে যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সেই শিক্ষা থেকে জাপানিরা এখন বিশ্বের কাছে শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। বিশ্বকে প্রযুক্তির মুন্সিয়ানায় মাতিয়ে রেখেছে জাপানিরা, কিন্তু তাদের সাফল্যের দৌড় কেবল কাঠখোট্টা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, শিল্প সাহিত্যে চিত্রকলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ঈর্ষণীয় বিচরণ। জাপানের চলচ্চিত্র অস্কার পেয়েছে, কুস্তির জগতে যুক্তরাষ্ট্রের পর তাদের দেশেই সবচেয়ে বেশি প্রসার!


কিয়োটো

মন্দিরের শহর কিয়োটো, জাপান। ছবি : জাপান টাইমস


সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের রয়েছে অসংখ্য বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট, প্রাকৃতিকভাবে সুনামি আর আগ্নেয়গিরির তাণ্ডবে থাকা সাগরে ভাসমান দেশটি ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে অন্যতম এক আগ্রহের দেশ। ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ দেশটির ঐতিহ্যবাহী কিয়োটো নিয়ে জানানো হবে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে কালজয়ী, মার্জিত, শান্ত এই কিয়োটো প্রতি বছর প্রায় চার মিলিয়ন আন্তর্জাতিক পর্যটককে আকর্ষণ করে। অষ্টম থেকে উনিশ শতকের জাপানের রাজধানী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শহরটি বড় ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছিল এবং এটির স্থাপত্য ঐতিহ্য এবং পুরানো-ইতিহাস অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে।


প্রাকৃতিক ও স্থাপত্যের বিস্ময়কর মেলবন্ধন ঘটে জাপানের এই শহরে

প্রাকৃতিক ও স্থাপত্যের বিস্ময়কর মেলবন্ধন ঘটে জাপানের এই শহরে। ছবি : সংগৃহীত


আজকের কিয়োটোতে একবিংশ শতাব্দীর মহানগরীর সাথে গভীর-শিকড়ের ঐতিহ্যগুলি সমৃদ্ধ হয়ে জড়িয়ে আছে। প্রাচীন মন্দিরগুলো, অনুপ্রেরণামূলক প্রকৃতি, আলোড়িত বাজার, সমসাময়িক শিল্পের দৃশ্য এবং রন্ধনসম্পর্কীয় সংস্কৃতি ভ্রমণকারীদের জন্যে লুকানো সম্পদের পসরা সাজিয়ে ইশারা করছে। কিয়োটো অববাহিকায় প্রথম ৭ম শতাব্দীতে বসতি স্থাপন করা হয়েছিল এবং ৭৯৪ সালের মধ্যে এটি জাপানের রাজধানী হিয়ান-কিয়াতে পরিণত হয়েছিল। পূর্বের রাজধানী নারার মতোই এই শহরটি গ্রিড প্যাটার্নে তৈরি করা হয়েছিল যা চীনা তাং রাজবংশের রাজধানী চাংগান (সমসাময়িক শি'আন)-এর আদলে তৈরি হয়েছিল।


কিয়োটোর মন্দিরের আলোকিত প্রবেশপথ

কিয়োটোর মন্দিরের আলোকিত প্রবেশপথ। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


যদিও এই শহরটি ৭৯৪ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত জাপানের রাজ পরিবারের আবাসস্থল হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে মেইজি পুনরুদ্ধারটি রাজ পরিবারকে নতুন রাজধানী টোকিওতে স্থানান্তরিত করে। শহরটি সবসময় জাপানি রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল না। কামাকুরা সময়কালে (১১৮৫-১৩৩৩), কামাকুরা জাতীয় রাজধানী হিসাবে কাজ করেছিল এবং এডো সময়কালে (১৬০০-১৮৬৭), টোকুগা শাগুনেট এডো (বর্তমানে টোকিও) থেকে জাপান শাসন করেছিলেন। নবম শতকে যেয়ে সমস্যা দেখা দেয়, তখন রাজ পরিবার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক শক্তির যান্ত্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দেশটি প্রধানত সামরিক পরিবার বা শাগুনেট দ্বারা শাসিত হতে শুরু করে। যদিও কিয়োটো তখনও নামে রাজধানী ছিল এবং জাতির সাংস্কৃতিক প্রতিবিম্ভ ছিল তবে সাম্রাজ্য শক্তি ছিল বেশিরভাগ সময়ে বিকেন্দ্রিত এবং প্রতীকী। এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবসায় প্রায়শই পরিচালিত হতো অন্যত্র থেকে।


কিয়োটো, ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদের মডেল

কিয়োটোর ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদের মডেল। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


সাম্রাজ্যের ভাগ্য যেমন নষ্ট হয়ে গেছে এবং ঠিক তেমনই নগরের ভাগ্যও নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করেছে। অনিন যুদ্ধের সময় (১৪৬৬-৬৭), যা মুরোমাচি আমলের সমাপ্তি চিহ্নিত করেছিল, কিয়োটো গোশো (ইম্পেরিয়াল প্যালেস) এবং বেশিরভাগ শহর ধ্বংস হয়েছিল। কিয়োটোতে আজ যা দেখা যায় তার বেশিরভাগ অংশ এডোর সময়কাল থেকেই। যদিও রাজনৈতিক শক্তি এডোতেই বাস করে, তবে কিয়োটোকে পুনর্নির্মাণ এবং একটি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আচমকা পার্ল হারবার আক্রমণ করে বসে জাপান, ফলে মার্কিন ক্রোধে জ্বলে তছনছ হয়ে যায় জাপান।


অবিশ্বাস্য কিয়োটো

অবিশ্বাস্য কিয়োটো। ছবি : ন্যাশনাল জিওগ্রাফি


দেশটির অধিকাংশ অঞ্চলে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র, বিমান হামলার মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয় জাপানকে। আর তাতে মাত্রা যোগ করে ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের নির্দেশে দেশটির দুই অঞ্চলে পারমাণবিক হামলা চালানো হয়, যার ক্ষত আজও জাপানিরা সারিয়ে উঠতে পারেনি। তবে, ভাগ্যক্রমে এসব হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছিল কিয়োটো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে দ্রুত শিল্পায়ন ঘটলেও কিয়োটো দেশটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাগত কেন্দ্র হিসাবে রয়ে গেছে। এটিতে জাপানের জাতীয় কোষাগারগুলোর প্রায় ২০ শতাংশ এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সম্পত্তির ১৫ শতাংশ রয়েছে। এছাড়াও, শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ২৪টি যাদুঘর এবং ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ।


জিনকাগুজি মন্দির, কিয়োটো

জিনকাগুজি মন্দির, কিয়োটো। ছবি : পিন্টারেস্ট


 যে কোনও মরসুমে এই শহর আপনাকে নতুন কিছু উপহার দেয়ার জন্য সদাপ্রস্তুত। গ্রীষ্মে সাংস্কৃতিক উদযাপন এবং আতশবাজি উত্সবগুলোর একটি তরঙ্গ নিয়ে আসে। এর পরে ম্যাপেল পাতার রঙ পরিবর্তন হয়ে এক দৃশ্য ধারণ করে শরতে আবার শীতকালে আরেক সৌন্দর্য। তার ওপর শহরজুড়ে মন্দিরগুলো লেপ্টে থাকে বরফের আস্তরণ। বসন্ত আসে আরও দারুণ চমৎকার নিয়ে, সাকুরা (চেরি ফুল) ফোটা, মার্চের শেষের দিকে প্রস্ফুটিত হওয়া। তাই বছরজুড়েই এই শহরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে যেতে পারবেন। যদিও শীতে বেশি পর্যটক থাকে শহরজুড়ে।


চেরি ফুলে রাঙানো কিয়োটো

চেরি ফুলে রাঙানো কিয়োটো। ছবি : সংগৃহী


প্রায় ১০ হাজার মন্দিরের এই শহর ভ্রমণ করার জন্য আবাসিক এবং গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে সাইকেল বা বাইক ভাড়া নিন, তারপর ঘুরে ঘুরে এর অপার সৌন্দর্য দর্শন করতে পারবেন। ঐতিহ্যবাহী ভবন, বাঁশের বন এবং ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটগুলো দেখে নিতে পারেন। এখানে কম করে হলেও ১০-১৫টি অতিরিক্ত দর্শনীয় স্থান রয়েছে, রয়েছে উপভোগ করার মতো দারুণ অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ যা আপনি কিয়োটোতে গিয়ে কোনোভাবেই মিস করতে পারেন না।  

নাবিলা বুশরা   এস এম