কলকাতার ঐতিহাসিক কুমোরটুলিতে একদিন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : এখানে কাউকে বরুণদেব, কাউকে জলদেব, কাউকে পবনদেব বানিয়ে এক ধরনের আত্মতুষ্টির উপায় আবিষ্কার করে



কুমোরটুলি

শিল্পীনিপুন হাতে গড়ে তুলছেন প্রতিমা। ছবি : সুমন্ত গুপ্ত


আদিম গুহাবাসী মানুষের হাতে যেদিন কোনও পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই পাথরে পাথর ঘষা লাগতেই আচমকা আগুন জ্বলে ওঠে, মূলত সেদিন থেকেই সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়। সেদিন আগুনের সংহার রূপ দেখে মানুষ যেমন ভীত হয় তেমনই আগুনকে বশীভূত করার জন্য তার কাছে অবনত হয়। এই অবনত হওয়া থেকেই উপাসনা ও পূজার সূচনা। তাই প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম মানুষ সমুদ্র, পর্বত, সূর্য, চন্দ্র এসবকেও বিশাল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে পূজা দিতে শুরু করে। মাথা নত করে এদের সম্মুখে। অগ্নি, বায়ু, বৃষ্টি, জল, নদী এসবও তাদের উপাস্যের বিষয় ছিল। কিন্তু, কালক্রমে মানুষ এসব প্রাকৃতিক শক্তির ওপর দেবত্ব আরোপ করে মানুষরূপে প্রদান করে কাউকে বরুণদেব, কাউকে জলদেব, কাউকে পবনদেব বানিয়ে এক ধরনের আত্মতুষ্টির উপায় আবিষ্কার করে। বন্ধুরা এতক্ষণ নিশ্চয়ই ভাবছেন এই কথা গুলো কেন বলছি আমি ,আমার মা আর বোন আজ কলকাতা ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনে বের হয়েছি সেই ঐতিহাসিক কুমোর টুলি দেখতে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গা পূজা আর কয়েক দিন পরেই। তাই, আজকে আমাদের গন্তব্য উত্তর কোলকাতার কুমোরটুলি ।

রওনা দিলাম

সকাল হতেই শরতের আকাশে মেঘের আনাগোনা ছিল তাই, আমরা একটু দেরি করেই বের হই। আগে থেকেই আমাদের চার চাকার বাহন এর কর্ণধার টুকাই দা এসে উপস্থিত। আমাদের আজকের যাত্রা শুরু হলো সিঁথির মোড় থেকে। গাড়িতে বাজছে পুরনো দিনের হিন্দি গান। পথে আমাদের সাথে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে যুক্ত হল রোশনির বর শুভদ্বিপ সাথে এক গাঁদা খাবার। আমি বললাম, আমরা তো খেয়ে এসেছি। ও বললও খাবার খেয়েছ তো কি হয়েছে আমাদের এখানের হলদিরাম এর মিষ্টি একবার খেয়েই দেখো, বার বার খেতে ইচ্ছা করবে। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না সাথে সাথে চেঁখে দেখলাম। আসলেই অসাধারণ স্বাদ। আমরা এগিয়ে চলছি, আমি রোশনির বর শুভদ্বিপের কাছে কুমোরটুলির ইতিহাস জানতে চাইলাম। ও বলে, ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করে। গোবিন্দপুর গ্রামে কোম্পানি ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সুতানুটি অঞ্চলে। গোবিন্দপুরের ধনিক সম্প্রদায় পাথুরিয়াঘাটা ও জোড়াসাঁকো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। এর পাশাপাশি গড়ে ওঠে অন্যান্য কয়েকটি অঞ্চলও।কোম্পানির ডিরেক্টরদের আদেশানুসারে জন জেফানিয়া হলওয়েল 'কোম্পানির মজুরদের জন্য পৃথক পৃথক অঞ্চল' বণ্টন করেন। এভাবে কলকাতার দেশীয়দের অঞ্চলগুলি বিভিন্ন পেশাভিত্তিক পাড়ায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এভাবেই শুঁড়িপাড়া, কলুটোলা, ছুতারপাড়া, আহিরীটোলা ও কুমারটুলি প্রভৃতি অঞ্চলের উৎপত্তি ঘটে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বড়োবাজার অঞ্চলের আগ্রাসনের শিকার হয়ে উত্তর কলকাতার মৃৎশিল্পীরা শহর ছেড়ে চলে যান।

সুতানুটি বাজার

কিন্তু, কুমারটুলির পটুয়ারা, যারা গঙ্গামাটি সংগ্রহ করে মাটির পাত্র ইত্যাদি তৈরি করে সুতানুটি বাজারে (অধুনা বড়োবাজার) বিক্রি করতেন, তাঁরা টিকে যান। পরবর্তীকালে, তাঁরা ধনী সম্প্রদায়ের বাড়ির পূজার নিমিত্ত দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণ করতে শুরু করেন। কলকাতা ও বাইরে বারোয়ারি বা সার্বজনীন পূজার প্রচলন হলে পূজা কমিটিগুলি কুমারটুলি থেকে প্রতিমা সংগ্রহ করতে থাকেন। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম কুমোরটুলিতে। গাড়ি থেকে নেমেই সবার কর্মব্যস্ততা চোখে পড়লো, সেই বিশাল আকৃতির প্রতিমা বানানোর কাজ চলছে। আমরা খুব সাবধানে ভেতরে প্রবেশ করে প্রতিমা শিল্পীদের কাজ দেখতে শুরু করি, আর আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে একের পর এক ছবি তুলতে থাকি। এঁটেল মাটির কাজ চলছে, তাই কোথাও কোথাও শুধু কাঁদা, তাই খুব সাবধানে পা বারাতে হবে। কথা হলো মৃৎ শিল্পী সজীব পালের সাথে। উনি বললেন, কুমোরটুল তে কলকাতার অধিকাংশ দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হয়।

দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতি

কলকাতায় দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ ও দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সঙ্গে কুমোরটুলি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কুমোরটুলির শিল্পীদের দুর্গাপ্রতিমার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। বর্তমানে, কুমোরটুলির দুর্গাপ্রতিমা আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকায় প্রবাসী বাঙালিদের কাছে সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৯ সালে প্রথম অমরনাথ ঘোষের তৈরি করা শোলার দুর্গাপ্রতিমা সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়ায় পাঠানো হয়। মাত্র তিন কিলোগ্রামের এই প্রতিমাগুলি বিমানযোগে প্রেরণের ক্ষেত্রে আদর্শ ছিল। ২০০৬ সালে কুমোরটুলি থেকে ১২ হাজার ৩০০টি দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের ৯৩টি রাষ্ট্রে কলকাতার এই পটুয়াপাড়া থেকে প্রতিমা প্রেরণ করা হয়ে থাকে। এই সংখ্যা বর্তমানে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পীরা অনেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে দিনযাপন করেন। কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পীদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় হলেন মোহনবাঁশী রুদ্রপাল ও তাঁর দুই পুত্র সনাতন রুদ্রপাল ও প্রদীপ রুদ্রপাল, রাখাল পাল, গণেশ পাল, অলোক সেন, কার্তিক পাল, কেনা পাল প্রমুখ। বর্তমান যুগে 'থিম শিল্পী'দের রমরমা সত্ত্বেও সনাতন প্রতিমার গুণগ্রাহী আজও কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের দিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করান। আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি কুমোরটুলির পথে পথে, দেখা মিললও বেশ কয়েকজন ফটোগ্রাফার এর সাথে। ওনারা আলাপ করছিলেন, একটু একটু করে বছরের সেই দিন কটা এগিয়ে আসছে, যারা জন্য আমরা প্রায় সকলেই কম বেশি অপেক্ষা করে থাকি। দুর্গাপুজোর আমেজ সময়ের সাথে যতই বদলাক না কেন, একটা জায়গা গত অনেক বছরেও এতটুকু বদলায়নি। তা হল কুমোরটুলি। সেজন্য প্রতি বছর পূজার আগে দলে দলে ফটোগ্রাফাররা ভিড় জমান ক্যামেরায় শিল্পীদের হাতের কাজের একেকটি পর্যায় নতুন করে তুলে ধরতে। সব দিক থেকেই যা অনবদ্য।

যেভাবে যাবেন :

হাওড়া থেকে বাসে করে বাগবাজার। এরপর অটো বা টানা রিক্সা করে কুমোরটুলি। অথবা, ট্যাক্সি করে যেতে পরবেন কুমোরটুলিতে।  

সুমন্ত গুপ্ত    এস এম