শত বছরের পুরনো গৌরারং জমিদার বাড়িতে একদিন
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : গৌরারং জমিদার বাড়ি
শতক আসে শতক যায় কিন্তু জমিদার বাড়ি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে স্যাঁতস্যাঁতে শ্যাওলা মেখে, কাল থেকে কালান্তরে গন্ধ ছড়িয়ে! জমিদার বাড়ির ঝরাপাতা, পুরনো ধুলো, রহস্যমাখা হাওয়া মাড়িয়ে ছুটে চলে জীবন ধারা। মহাকাল ছিন্ন করে বের হওয়া মানুষটা খুঁজে বেড়ায় অতীত ঐতিহ্যের । আমার ও সেই অবস্থা , পুরনো কোন স্থান , তার ইতিহাস জানার আগ্রহ আমার সেই ছোট বেলার থেকেই। অনেক দিন ধরে কোন জমিদার বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া হয় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সিলেটের সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি নাম চোখে পড়লো। সাথে সাথেই আমার গ্রুপের ছেলে নিলয় কে ফোন দিলাম। গৌরারং জমিদার বাড়ি চিনো নাকি? ও বললো নাম শুনেছি , ওখানে বুঝি ভূতের বাস কিন্তু যাওয়া হয় নাই কখনও।
চইলেন ভাই আমি আর আপনি ঘুরে আসবো। আমি ও সাথে সাথে প্লেন করে ফেলি আসছে শুক্রবারেই বেড়িয়ে পড়বো সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি দেখতে। বারে বৃহস্পতিবার তাই অফিস থেকে বের হতে হতে রাত নয়টা। যানজট পেড়িয়ে বাসায় ঢুকতে ঢুকতে রাত দশটা। আগামীকাল সকালবেলা বের হতে হবে তাই দেরি না করেই রাতের আহার সেরে শুয়ে পরলাম। শুয়ে সেই গতানুগতিক অভ্যাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢু মারা। এদিকে ঘড়ির কাঁটা চলছে এগিয়ে কিন্তু নিদ্রা দেবীর আগমনের কোন খবর নাই।
গৌরারং জমিদার বাড়ি
কি আর করা দেরিতে ঘুম ধরলে, ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হবে। এদিকে আমি ঘুমে কিনা দেখতে এসে মা বললেন এখনও ঘুমাস নাই। কাল সকাল সকাল বের হবি কি করে? আমি বললাম ঘুম না ধরলে কি করবো ? মা বললো এক কাজ কর পেছন থেকে এক থেকে একশ গুণতে থাক তাইলেই ঘুমাতে পারবি। মা'র কথা মত আমি ১০০... ৯৯...৯৮...৯৭...৯৬...৯৫ গুনতে লাগলাম। ঠিক কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টেরই পেলাম না। সেই সাত সকালে মার ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। ঘুম থেকে উঠেই নিলয় কে ফোন দিলাম ।কারণ ও আমার থেকে ও অলস বেশি তাই ওকে ঘুম থেকে না তুললে আমাদের গন্তব্যে পৌছাতে দেরি হয়ে যাবে। আমার অনুমান ঠিক দুইবার ফোন দিলাম নিলয় কে ফোন ধরার কোন নাম গন্ধ নাই। শেষ পর্যন্ত ফোন ধরলেন জনাব আমি বললাম কি ঘুমে নাকি? উত্তরে বললো, না আমি এই মাত্র উঠলাম। আমি তো কাহিনী বুঝতে পারছি ও এখনও বিছানায় শুয়েই কথা বলছে। আমি বললাম দেরি করো না দ্রুত তৈরি হয়ে চলে আসো। সকাল আঁটটা বাজতে চললও নিলয়ের দেখা নাই। দিলাম আবার ফোন কোথায় তুমি... দাদা আমি চলে এসেছি আর মিনিট দশেক। শেষ পর্যন্ত নিলয়ের দেখা পেলাম।
আমরা বেড়িয়ে পড়লাম গন্তব্য পানে। প্রথমে আমাদের যেতে হবে চৌহাট্টাতে, সেখান থেকে কার অথবা মাইক্রো করে সুনামগঞ্জ শহরে যেতে হবে। চৌহাট্টাতে গিয়ে কার এর জন্য অপেক্ষা করছি , আমি আর নিলয় আর মা মিলে তিন জন যাত্রী। শেষ পর্যন্ত একজন ড্রাইভার এর দেখা পেলাম। আমরা রওনা দিলাম সুনামগঞ্জ পানে। সিলেট শহর থেকে লামাকাজি, গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার , পাগলা বাজার ধরে আমাদের চার চাকার গাড়ি চলছে যেতে যেতে মনে হলো পৃথিবীর সবুজ রঙ ছাড়া আর কোন রঙ নেই। আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল গাছের পাতাই তার সাক্ষী। আমরা চলছি শান্তিগঞ্জ বাজার পেড়িয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ শহরে।
গৌরারং জমিদার বাড়ি
এদিকে পেটে চলছে রাম রাবণের যুদ্ধ কোথাও খোঁজাখুঁজি না করে সরাসরি সাইনবোর্ড বিহীন এক খাবারের দোকানে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম সবে মাত্র গরম গরম মিষ্টি সিরার থেকে উঠিয়ে তোলা হয়েছে পরিবেশনের জন্য। দেখে লোভ আর সামলাতে পারলাম না। রুটি আর গরম মিষ্টি দিয়ে সেরে নিলাম পেট পূজা। গরম গরম মিষ্টি স্বাদে দারুণ আর খাঁটি দুধের তৈরি তাই স্বাদ টা ও ভিন্ন। যাই হোক পেট পূজা শেষ করে দোকানের একজন এর কাছে জানতে চাইলাম গৌরারং জমিদার বাড়ি কি ভাবে যাবো? বলতেই বললেন রিক্সা নিয়ে চলে যান নতুন ব্রিজে সেখান থেকে সিএন জি করে যেতে পারবেন। আমরা বেরিয়ে রিকশা করে নতুন ব্রিজে গেলাম সেখান থেকে এক সিএন জি ড্রাইভার কে বললাম গৌরারং জমিদার বাড়ি বলতেই উনি বললেন চলেন স্যার। আমরা জমিদার বাড়ির দিকে ধাবিত হলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম জমিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ির ফটক থেকে ভেতরের দিকে প্রবেশ করলাম আমরা। পুরনো ভবনের প্রতিটি স্থানে আছে অসাধারণ শৈল্পিক কাজ। অনেক বড় এলাকা নিয়ে বাড়িটি। দেখা হলো ঐ এলাকার এক প্রবীণ মানুষের সাথে তার কাছে এই বাড়ির ইতিহাস জানতে চাইলাম।গৌরারং জমিদার বাড়ি
আমরা ওনার কথা শুনে শুনে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। উনি আরও বললেন প্রভাবশালী এই জমিদার বাড়িটির জৌলুসে ভাটা পড়ে ৪৭ সালের দেশভাগের সময়, পরবর্তীতে ৫৩ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সাথে সাথে একসময়কার এই প্রভাবশালী জমিদার বাড়িটিও হারিয়ে ফেলে তার প্রভাব প্রতিপত্তি এবং জৌলুস। পরবর্তী সময়টা কেবলই ইতিহাস! মুক্তিযুদ্ধের সময় ইতিহাস বিজড়িত এই জমিদার বাড়িটি পাকবাহিনী কর্তৃক প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এর আগে আঠারো শতকের কোনও একসময় প্রচণ্ড ভূমিকম্পে জমিদার বাড়িটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভবন ধসে বাড়িটির তৎকালীন জমিদারের এক ভাই নিহত হন। কালক্রমে জমিদার উত্তরসূরিরা অন্যত্র চলে গেলে বাড়িটি অরক্ষিত এবং ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবেই সকলের নিকট পরিগণিত হয়।আমি নিলয়ের কথার সাথে মিল পেলাম ও আগেই বলেছিল এই রাজ বাড়ী তে বুঝি ভুতের বাস। যাই হোক আমারা প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আছি কোন প্রকার গণ্ডগোল চোখে পরে নাই। একটু সামনে গিয়েই দেখতে পেলাম বাড়িটির সামনে দিয়ে সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর সবুজ ও স্বচ্ছ জলধারা। পেছনে সুবিশাল হাওর। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর সবুজ। দখিনা বাতাসে এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতিতে বিমুগ্ধ হলাম আমরা। বাড়িটির সামনে দিয়ে সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর সবুজ ও স্বচ্ছ জলধারা। পেছনে সুবিশাল হাওর। দখিনা বাতাসে এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতিতে বিমুগ্ধ হলাম আমরা। শেষ দিকের একটি কক্ষে ঢুকে গা টা ভয়ে ছমছম করছিলো। অন্ধকার কক্ষ এর মাঝে ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করছে। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। একটু সামনেই আছে শান বাধানো পুকুর ঘাট।
গৌরারং জমিদার বাড়ি
আমাদের মত অনেকেই এসেছেন ঘুরতে। কারুকাজ খচিত অন্দরমহল এবং অনন্য স্থাপত্য শৈলীর কারণেই জমিদার বাড়িটি এখন ভ্রমণ পিয়াসুদের নজর কেড়েছে। আর এই ভরা বর্ষায় থই থই জলের মধ্যে মনে হয় এ যেন সমুদ্রে ভাসমান কোনও রাজপ্রাসাদ। অনুপম নির্মাণশৈলীর কারণে এ জমিদার বাড়িকে হাওর রাজ্যের রাজমহল হিসেবেই আখ্যায়িত করেন স্থানীয়রা। অনুপম নির্মাণশৈলীর কারণে এই জমিদার বাড়িকে হাওর রাজ্যের রাজমহল হিসেবেই আখ্যায়িত করেন স্থানীয়রা। আমি মনে মনে ভাবছিলাম কে জানতো? হয়তো জমিদার বাড়ির সামনের এই পথ দিয়েই একসময় দুর্দান্ত দাপটে বিচরণ করতো জমিদারদের পাক পেয়াদা, নায়েব কিংবা রাজকর্মচারী! হয়তো এই পুকুর পাড়েই কোনও প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমের সলিলসমাধি ঘটে!এখানেই হয়তো জমিদার তার বিরুদ্ধাচরণ কারীদের কঠোর শাস্তি দিতেন কিংবা ওই অন্দরমহলেই হয়তো কতো সুন্দরী রমণীর নৃত্যের তালে সুরা পান করে রোমাঞ্চিত হতেন জমিদার বাবু, হয়তোবা রোজ সন্ধ্যায় গানের পসরা সাজিয়ে মধুর কণ্ঠে জমিদার বাবুর মনোরঞ্জন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়তো সুরেলা রমণী! জমিদার বাড়ির প্রধান ফটকেই হয়তো সুবিচারের আশায় জমিদার বাবুর জন্য অধীর অপেক্ষায় দাড়িয়ে থাকতো বিচার প্রার্থী! জমিদারী আমল নেই, জমিদার নেই। এক কথায় এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রায় ধসে পড়া ভবনে কিছু নিরেট ইট, ধুলাবালি আর তৃণলতা কালের স্রোতের ওপর আঁকড়ে থেকে ইতিহাসের সাক্ষ্য দিচ্ছে!
যাবেন যেভাবে :
সরাসরি ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ৫৫০ টাকা বাস ভাড়া। এনা / শ্যামলী / মামুন বাস যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে হবে ট্রেনে তার পর সিলেট থেকে গাড়ি করে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজ । তারপর ব্রিজ থেকে সিএনজি করে জমিদার বাড়ি। ভাড়া ২৫ টাকা জনপ্রতি।আরো পড়ুন ঃ রক্তরাঙা শিমুল বাগান : ভ্রমণ গল্প
ফেসবুক পেইজঃ ট্রাভেল বাংলাদেশ
সুমন্ত গুপ্ত এস এম


