ঘুরে আসুন ২০০ বছরের পুরনো শৈলকুপা জমিদার বাড়ি থেকে

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে শৈলকুপা জমিদার বাড়ি

শৈলকুপা জমিদার বাড়ির মূল ফটক শৈলকুপা জমিদার বাড়ির মূল ফটক। ছবি : সংগৃহীত 

খুলনা বিভাগস্থ ঝিনাইদহ জেলার ঐতিহাসিক একটি স্থাপনা শৈলকুপা জমিদার বাড়ি। এই জেলার শৈলকুপা উপজেলার আবাইপুর গ্রামে এই ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি অবস্থিত। প্রায় ২০০ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়িটি ঝিনাইদহের দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। ভ্রমণ পিপাসু মানুষদেরকে ইট-সুরকির প্রাচীর ঘেরা এই জমিদার বাড়িটি সহজেই আকৃষ্ট করে। প্রায়  ৪০০ বিঘা জমির ওপর স্থাপিত এই জমিদার বাড়িটি এখনও ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

ঐতিহাসিকদের মতে, এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন রামসুন্দর শিকদার নামক এক জমিদার। উনিশ শতকের প্রথম দিকে এই জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখনকার সময়ে এটি 'শিকদার স্ট্রিট' নামেও পরিচিত ছিল। রামসুন্দর শিকদারের পূর্ব পুরুষদের উপাধি ছিল তিলিকুন্ড। কার্তিক শিকদার যিনি রামসুন্দর শিকদারের দাদা মূলত তিনিই শিকদার উপাধি পান মুর্শিদাবাদের নবাবের কাছ থেকে। পরবর্তীতে তার বংশধরেরা শিকদার নামে পরিচিত হন।

রামসুন্দর শিকদার তাঁর পৈতৃক নিবাস শৈলকুপায় প্রায় ৪০০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলেন দ্বিতল বিশিষ্ট বিশাল এই প্রাসাদ। প্রাসাদের চারদিকে ঘোরানো দালানে কক্ষ ছিল প্রায় সাড়ে তিনশ।  তিনি তৎকালীন এখানে একটি সাব রেজিস্ট্রার অফিস, একটি বড় বাজার গড়ে তোলেন। এছাড়াও তিনি এই অঁজপাড়া গাঁয়ে একটি থিয়েটার হলও গড়ে তোলেন এবং এখানেই তিনি তার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। যা পরবর্তীতে 'শিকদার স্ট্রিট' নামে পরিচিতি লাভ করে। রামসুন্দর শিকদার বাংলা ১২৭০ সালের ২৫শে বৈশাখ মৃত্যুবরণ করেন।শৈলকুপা জমিদার বাড়ি শৈলকুপা জমিদার বাড়ি। ছবি : সংগৃহীত

তার মৃত্যুর পর তাঁর সাত পুত্র সন্তান জমিদারির পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যও দেখাশোনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে রামসুন্দর শিকদারের সন্তানেরা শিকদার এন্ড কোম্পানি নামে পাটের ব্যবসা শুরু করেন। তাদের উৎপাদিত পাট তখনকার সময়ে পৃথিবীর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা পায়। সে সময়কার ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জন শিকদার এন্ড কোম্পানিকে প্রিন্স অব ওয়েলস উপাধিতে ভূষিত করেন। 

পরবর্তী সময়ে সন্তানদের মধ্যে জমিদারি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ভাগ হয়ে যায় এবং বংশের লোকেরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিলেতে ও আমেরিকায় বসবাস শুরু করেন। রামসুন্দর শিকদারের মৃত্যুর ২৫ বছর পর তাঁর পুত্ররা তাঁর নামে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তীতে ধীরে ধীরে কালের বিবর্তনে আবাইপুরের শিকদার স্ট্রিট ধ্বংস হয়ে যায়, সাথে সাথে জমিদারিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। শৈলকুপা জমিদার বাড়ি ছবি : সংগৃহীত

শৈলকুপা উপজেলা সদরের ১৭ কিলোমিটার পূর্বে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকা আবাইপুরে রামসুন্দর শিকদার প্রতিষ্ঠিত জমিদার বাড়িটির ধ্বংসাবশেষ এখনও রয়েছে। যদিও কালে কালে দখলবাজরা জবরদখল করে ফেলেছে বিশাল প্রাসাদে বেশ কিছু অংশ। রাজবাড়িটির অনেকাংশ ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটি থেকে আরেকটি আলাদা করে ফেলেছে, লুট করা হয়েছে বাড়ির বিভিন্ন সরঞ্জামাদি।

বর্তমানে পশ্চিম দিকের একটি ভবনের একাংশে রামসুন্দর শিকদারের বংশধরেরা বসবাস করেন, আর উত্তর দিকের একটি ভবনে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলে। রামসুন্দর শিকদারের বংশধরেরা তাদের পূর্বপুরুষদের জমিদারি, প্রাসাদ, ধন সম্পদ রক্ষা করতে না পারলেও পরম যত্নে আগলে রেখেছেন কিছু মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী।

সেগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন আমলের শ্রীমদ্ভাবতম, পাথরের তৈরি হুক্কা, একটি বৃহৎ গ্রামোফোন (কলের গান), একখানা তরবারি, বাদ্যযন্ত্র এসরাজ, রুপার তৈরি বেনারসি শাড়ির অংশবিশেষ, শাল কাঠের তৈরি পুরাতন দুটো মন্দিরসহ বেশকিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী। বর্তমানে এই প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীগুলো রামসুন্দর এর উত্তরসূরী রাজকুমার শিকদার এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

কীভাবে যাবেন : রাজধানী ঢাকার কল্যাণপুর, গাবতলী, মহাখালী হতে ঝিনাইদহ জেলায় সরাসরি বিভিন্ন ব্যানার এর এসি/নন-এসি বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। পূর্বাশা, জেআর পরিবহন, হানিফ, শ্যামলী, স্কাইলাইন বাসগুলো সরাসরি ঢাকা টু ঝিনাইদহ চলাচল করে। ভাড়া পড়বে মানভেদে ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এছাড়া ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে যেতে হবে। এই ট্রেনটি ঝিনাইদহের মোবারকগঞ্জ স্টেশন থামে।

সেখান থেকে ঝিনাইদহ শহরে বাস বা সিএনজিতে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগবে, ভাড়া পড়বে ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ঝিনাইদহ শহর থেকে শৈলকুপা উপজেলা ২৮ কিলোমিটারের পথ।  বাসে বা সিএনজিতে যাওয়া যায়। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০  টাকার মতো। শৈলকুপা থেকে শৈলকুপা জমিদারবাড়ি ১৭ কিলোমিটারের পথ। সিএনজি যোগে সেখানে যেতে হবে।

কোথায় থাকবেন : শৈলকুপা উপজেলা সদরে ডাকবাংলো রয়েছে। সেখানে থাকা যাবে তবে এক্ষেত্রে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া ঝিনাইদহ শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য হোটেল গুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল জামান, সৃজনী রেস্ট হাউস, ব্রাক রেস্ট হাউস, হোটেল রাতুল, হোটেল রেডিয়েশনসহ আরও বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ। মানভেদে এগুলোর ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত।

কোথায় খাবেন : হালকা খাবার-দাবার কিংবা চা-নাস্তা করার জন্য শৈলকুপায় কিছু হোটেল থাকলেও ভালো মানের খাবারের জন্য অবশ্যই আপনাকে ঝিনাইদহ ফিরে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ঝিনাইদহের পায়রা চত্বরের আশেপাশে বেশকিছু ভালো মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রূপসী বাংলা রেস্তোরা, ইয়ং কিং চাইনিজ, ক্যাফে কাশফুল, অজয় কিচেন, সুইট হোটেল, আহার রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি।