চারশো বছর পুরনো চাঁদগাজী ভূঁঞা মসজিদ : ফেনী

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ফেনীর প্রথম পাকা প্রাচীন মসজিদ : চাঁদগাজী ভূঁঞা মসজিদ



চাঁদগাজী ভূঁঞা মসজিদ Chandgaji Bhuiyan Mosque

ছবি : সংগৃহীত


আমাদের দেশের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো আমাদের শত শত বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে আজো বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি জেলার এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা যেমন আমাদের দেশের সৌন্দর্যের অন্যতম অনুষঙ্গ তেমনি পর্যটকদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এসকল স্থাপনার মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়ে আছে দেশের নানান স্থানের মসজিদ। দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে ঘেরা এই মসজিদগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে নানান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মৃতি। এগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন তেমনি ইতিহাসের ধারক ও বাহক। তেমনই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হল চাঁদগাজী ভূঁঞা মসজিদ (Chandgaji Bhuiyan Mosque)। প্রাচীন এই মসজিদটি ফেনীর অন্যতম একটি আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্থান।


মসজিদটির  ইতিহাস

ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মহামায়া ইউনিয়নে এই মসজিদটি অবস্থিত। চারশো বছর পুরনো এই মসজিদটি ফেনীর প্রথম পাকা প্রাচীন মসজিদ। চাঁদগাজী ভূঁঞা ১,১২২ হিজরীতে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রায় ২৮ শতক জায়গার ওপর এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোঘল আমলে চাঁদগাজী ভূঁঞা ছিলেন এলাকার প্রভাবশালী জমিদার। বার ভূঞাদের কোন এক বংশের উত্তর সূরী ছিলেন চাঁদগাজী। তিনি মেঘনা তীরবর্তী কোনো অঞ্চল থেকে এখানে লোক লস্কর নিয়ে আসেন এবং বসতি স্থাপন করেন। ত্রিপুরা রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি এখানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, তিনি ছিলেন একজন সাধক পুরুষ। তার নামানুসারে ছাগলনাইয়া উপজেলা সদর দপ্তরের অদূরে চাঁদগাজী বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।


মসজিদটির স্থাপত্যশৈল

মোঘল স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মাণ করা হয়েছে এই মসজিদ, যা দেখত অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। অপূর্ব এই মসজিদটি দেখতে এখানে অনেক ভ্রমণ পিপাসুদের আগমন ঘটে। মসজিদটি চুন,সুরকি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই মসজিদের দেওয়ালগুলো বেশ চড়া করে নির্মাণ করা হয়েছে। নানান কারুকার্য শোভিত এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৪৮ ফুট, প্রস্থ ২৪ ফুট এবং উচ্চতা ৩৫ ফুট। মসজিদের সামনের অংশে শ্বেত পাথরের একটি নামফলক আছে। মসজিদটির রয়েছে তিনটি গম্বুজ। গম্বুজের উপরে পাতা এবং কলসের নয়নাভিরাম নকশা এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মসজিদে একই রকম স্থাপত্যশৈলীর ১২টি মিনার রয়েছে এবং এর দরজার উপরে সুন্দর টেরাকোটার নকশা করা রয়েছে। মসজিদটির ভেতরে প্রবেশ করলে প্রাচীন ঐতিহ্যের সব ধরনের চিহ্ন চোখে পড়ে। আগে মসজিদে প্রবেশের জন্য প্রাচীন কারুকার্য খচিত দরজা ছিল। এই দরজা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন তিনটি কাঠের দরজা দেয়া হয়েছে। এই মসজিদটিতে কয়েকশ মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের পাশেই ১৮ শতক জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি দিঘী রয়েছে। চাঁদগাজী ভূঁঞা এই দিঘিটি খনন করিয়েছিলেন। অত্যন্ত স্বচ্ছ পানির এই দিঘীটি দেখতে বেশ দারুণ এবং এটি এই মসজিদটিকে আরও মনোরম করে তুলেছে। এই মসজিদটিকে ঘিরে এখানে বেশ কয়েকটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ১৯৮২ সালে চাঁদগাজীর বংশধররা এই মসজিদের পাশে চাঁদগাজী ভূঁঞা দারুল কুরআন নামে একটি নুরানি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও চাঁদগাজী ভূঁঞার নামে এ এলাকায় চাঁদগাজী বাজার, চাঁদগাজী ইসলামিক পাঠাগার, চাঁদগাজী স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।


যেভাবে যাবেন :

প্রথমে ঢাকা থেকে ফেনী আসতে হবে। এরপর সিএনজি অটোরিকশায় করে আসতে হবে ছাগলনাইয়া উপজেলায় । শেয়ারে আসলে ভাড়া পড়বে ২০ টাকা আর পুরো সিএনজি ভাড়া নিলে প্রায় ১০০ টাকা ভাড়া পড়বে। তারপর ছাগলনাইয়া থেকে ১২ টাকা ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশায় করে চাঁদগাজী বাজারে পৌঁছাতে হবে। বাজার থেকে পায়ে হেঁটে অথবা রিকশায় করে এই মসজিদে যেতে পারবেন।


যেখানে থাকবেন :

থাকার জন্য ফেনীতে রয়েছে সরকারী রেস্টহাউস ও বাংলো। এগুলোতে থাকার জন্য আগে থেকে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া ফেনীতে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে চাইলে এগুলোতেও থাকতে পারবেন। ১। ফেনী সার্কিট হাউস: ফেণী শহরের অদূরে বিজয়সিংহ দিঘীর পাড়ে অবস্থিত।

২। এলজিইডি রেস্ট হাউস : ফেণী শহরে ফেনী কুমিল্লা রোডের পাশে ।

৩। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস মহিপাল থেকে ফেণী শহরের দিকে যাওয়ার পথে শহীদ শহীদুল্যাহ কায়সার সড়কের পাশে।

৪। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রেস্ট হাউস: মহিপাল মোড় হতে প্রায় ১.৫ কি:মি: দক্ষিণে ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাশে অবস্থিত।

৫। ফেণী শহরে বেশকিছু হোটেল রয়েছে। আরও ভালো পরিবেশে থাকতে চাইলে। ফেণীর নিকটবর্তী কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামে অবস্থিত ভিটা ওয়ার্ল্ডে থাকতে পারবেন। ফোন: ০১৭৩৩ ৩৩১ ৯৫৭।  


রুবাইদা আক্তার   এস এম