চেরনোবিল বিপর্যয় : হিরোশিমার চেয়েও ৫০০ গুণ শক্তিশালী বিষ্ফোরণ হয়েছিল
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : এক কালের ঘনবসতি জায়গা আজ হয়েছে ভুতুড়ে আবাস
পরিত্যক্ত ভূমি ইউক্রেনের চেরনোবিল। ছবি : এবিসি নিউজ
চেরনোবিল শহরটি ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে প্রায় ৬৫ মাইল উত্তর পূর্বে অবস্থিত। ১৯৭০ সালে ইউক্রেনের এই শহরটিতে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিস্থাপিত হয়। এটি ছিল বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যেখানে পারমাণবিক চুল্লির সংখ্যা ছিল ৪টি। এই বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্রে সংঘটিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণটি ঘটে ১৯৮৬ সালে ২৬ এপ্রিল রাতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে গিয়ে। বিস্ফোরণের উৎপত্তি হয় চতুর্থ পারমাণবিক চুল্লিটি থেকে। সাধারণত এই ধরনের নিরাপত্তা পরীক্ষা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিস্থাপনের আগে করা হয়। কিন্তু বিষয়টি অবহেলা করে যাওয়ার কারণে নেমে আসে এই পরিণতি। এছাড়াও এ বিপর্যয়ের পেছনে দায়ী করা হয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনভিজ্ঞ কর্মীদের। ঘটনাস্থানে মারা যায় প্রায় ৪ হাজার মানুষ। পরবর্তীতে বিস্ফোরণের ফলে রেডিয়েশনের প্রভাবে নানা রোগে ভোগে মানুষ, দেখা দেয় ক্যান্সার, দেখা দেয় চর্মজাতীয় বিভিন্ন রোগ, মারা যায় প্রায় লখাদি মানুষ। বিস্ফোরণের তেজক্রিয়তার ফলে দেখা যায় অসংখ্য জন্মগত ত্রুটি।
বাতাসের মাধ্যমে রেডিওএক্টিভ ডাস্ট ছড়িয়ে যায় আসে পাশের অঞ্চলগুলোতে। মারা যায় বনের পশু পাখি। ভেসে উঠে পার্শ্ববর্তী নদীর মৃত মাছ। এক সময় চেরনোবিল শহরে মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার, বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৬৭ জনের মত বাস করে। বিস্ফোরণের পর সেখানকার লোকালয়ের মানুষদের কে সরিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। এককালের ঘনবসতি পূর্ণ এই শহরটি বর্তমানে এটি একটি ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে যে তেজস্ক্রিয় উপাদান এলাকার চারপাশে ছড়িয়ে পরে এর কারণে আগামি কয়েক বছরেও শহরটি মানুষ বসবাসের অনুপযোগী।
ছবি : এন্ডিস্ ওয়ার্ল্ড জার্নি
বর্তমানে ভুতুড়ে সেই শহরটি হয়ে উঠেছে অসংখ্য পর্যটকদের আকর্ষণ। বিস্ফোরণের ভয়াবহতার ফলে পরিত্যক্ত এই শহরটি দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসে মানুষ। ইউক্রেনে বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্সির সাহায্যে পরিত্যক্ত এই শহর ঘুরতে আসে পর্যটকগণ। ট্র্যাভেল এজেন্সির সাথে অনলাইনে যোগাযোগ করা যায়। অনলাইনেই রয়েছে বুকিংয়ের ব্যবস্থা। চেরনোবিলের যাত্রা শুরু হয় ইউক্রেন থেকে মিনিবাস করে। যাত্রা শুরুর আগে সেই ভয়াবহ দিনটির এক ঝলক ডকুমেন্টারি দেখিয়ে নেয়া হয়। পর্যটকদের জানানো হয় শহরটির ইতিহাস। পুরো শহরটি কিছুটা বাসে চড়ে এবং বাকি অংশ পায়ে হেঁটেই দেখানো হয়। পর্যটকদের সাথে থাকে পর্যটক গাইড। দেখানো হয় সে সময়ের হসপিটাল, কিন্ডারগার্ডেন, সেখানে ফেলে যাওয়া খেলনা এবং বইপত্র, সুইমিংপুল, স্টেজ থিয়েটারের করুণ পরিণতি। সিলিং ভেঙে মাটিতে পরে সব চুরমার করে দেয়া বাস্তব চিত্র। দেখা মিলবে বিস্ফোরণের ফলে ভাঙাচুড়া পুরোনো ফার্নিচারের দোকানসহ অন্যান্য দোকানসমূহ।
কোথাও কেউ নেই, চেরনোবিল। ছবি : ডেইলি এক্সপ্রেস
এরপর পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হয় রেড ফরেস্ট এবং প্রিপিয়াট শহরে। যেখানে পাওয়ার প্ল্যান্টের কর্মচারীগণ তাদের পরিবারসহ বসবাস করতেন। পর্যটকদের জন্য রয়েছে মিউজিয়াম। পাওয়ার প্ল্যান্টের ইতিহাস সম্বন্ধে জানা যাবে সেখানে। শহরটিতে ঘুরতে ঘুরতে একসময় আপনার মনে হবে এত বড় শহরে বুঝি আপনি একা দাঁড়িয়ে আছেন। যেন কোথাও কেউ কথা বলছে না। নিশ্চুপ এই শহরটিতে আপনিই একমাত্র প্রাণ। শহরটির বিভিন্ন স্থানে রেডিয়েশনের পরিমাণ ভিন্ন। সেই রেডিয়েশনের মাত্রা পরিমাপের জন্য রয়েছে একধরণের রিমোট যন্ত্র। পর্যটকগণ সেই রিমোটের সাহায্যে কোন জায়গায় কত পরিমাণ রেডিয়াশন আছে, তা পরিমাপ করতে পারে।
তথ্যসূত্র : http://www.dark-tourism.com/index.php/15-countries/individual-chapters/481-chernobyl-a-pripyat-ukraine https://lupinetravel.co.uk/all-tours/3-day-chernobyl-tour/