জাপানের পুতুল গ্রাম

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পুতুল গ্রাম : সর্বশেষ যে শিশুটি এই গ্রামে জন্মে তাও ১৯ বছর আগে



জাপানের পুতুল গ্রাম

পুতুল গ্রামের মাঠে পুতুল। ছবি : ওয়াশিংটন পোস্ট


 জাপানের মন ভোলানো সৌন্দর্য নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। পুরো দেশটাই যেন ছবির মত সুন্দর। এই দেশেই ছবির মত সুন্দর একটি গ্রাম আছে। তার নাম নাগোরো। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই গ্রামে মানুষের সংখ্যা মাত্র ২৫-৩০ জন। এক সময় এই গ্রামে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ ছিল। কিন্তু আজ কমতে কমতে সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে এত কমে। নাগোরো গ্রামে সর্বশেষ কোনো শিশুর জন্ম হয়েছিল ১৯ বছর আগে। যারা বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক। তরুণ একদম নেই। গ্রা ম থেকে উন্নত জীবনের আশায় বেশিরভাগই চলে গিয়েছেন শহরে। গ্রামটি মানুষের না হলেও বর্তমানে পরিচিত পুতুলের গ্রাম হিসেবে। চলুন জানি কীভাবে গ্রামটি পুতুলের হলো-


 গ্রামে স্বাগতম

পুতুল গ্রামে স্বাগতম। ছবি : সংগৃহীত


 

পুতুল গ্রাম

নাগোরো গ্রামের অধিবাসী ৬৮ বছর বয়সী সুকিমি আইয়ানোর ছোটবেলা বেশ দুরন্তপনাতেই কেটেছে এই গ্রামে। পড়াশোনার জন্য নিকটবর্তী শহর ওসাকায় চলে যান সুকিমি। সেখানেই বিয়ে করেন, সংসার, ছেলেমেয়ের দায়িত্ব নিয়ে কাটতে থাকে দিন। ২০০২ সালে বাবার অসুস্থতার জন্য সুকিমি ফিরে আসেন গ্রামে। কিন্তু ছোটবেলায় রেখে যাওয়া চঞ্চল গ্রামটিকে এমন নীরব আর স্তব্ধ দেখে ভীষণ মুষড়ে পড়েন তিনি। পরিচিত প্রায় সকলেই মারা গেছেন। অনেকেই চলে গেছেন বড় বড় শহরে। পুরো গ্রাম ঘুরেও পরিচিত মুখের দেখা মিলল না।


পুতুল গ্রাম, পুতুলের সাথে সুকিমো আইয়ান

পুতুলের সাথে সুকিমো আইয়ান। ছবি : এনপিআর


 মন খারাপ নিয়েই দিন কাটাচ্ছিলেন সুকিমি। অসুস্থ বাবা বাগানে বুনেছিলেন মূলা আর মটরশুঁটির বীজ। কিন্তু চারা বের হলেই পাখি সেগুলো খেয়ে ফেলত। এই সমস্যা দূর করতে বাবার মুখের আদলে একটি কাকতাড়ুয়া বানিয়ে বাগানে লাগিয়ে রাখলেন। এতে কাজও হলো। পুতুলকে মানুষ ভেবে পাখিরা আর বাগানে এলো না। এ দৃশ্য দেখে সুকিমির মাথায় নতুন এক বুদ্ধি আসল। প্রাণহীন এ গ্রামকে প্রাণ না ফিরিয়ে দিতে পারলেন, অন্তত মানুষশূণ্য যেন দেখতে না হয়। শুরু করলেন বিভিন্ন মানুষের চেহারার আদলে পুতুল বানানো। ২০০৩ সালে নিজেদের কৃষিজমির জন্য সুকিমি কিছু পুতুল বানান। এরপর প্রতিবেশিদের মুখের আদলে বানান আরও কিছু পুতুল। বানানো শেষে পুতুলগুলো এমনভাবে প্রতিবেশীদের বাড়ির সামনে রাখলেন যেন তারা একে অন্যের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠেছে।


মাঠে বসে আড্ডারত পুতুল যুগল

মাঠে বসে আড্ডারত পুতুল যুগল। ছবি : পিন্টারেস্ট


 এরপর হারানো মানুষগুলোর আদলে সুকিমি একের পর এক পুতুল বানিয়ে যেতে লাগলেন। হুট করে কোনো দর্শনার্থী গ্রামে গেলে বেশ বিস্মিত হয়ে যান। যেদিকেই তাকানো যায় দেখা যায়, মাঠে কৃষিকাজ করছে কৃষক, নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় বসে আছে সদ্য বিবাহিত জুটি, ছোট্ট সন্তানকে পাশে বসিয়ে কোনো বাবা হয়তো বড়শি হাতে মাছ ধরছেন, গায়ে কোট আর মাথায় টুপি পরে কয়েকজন মিলে হয়তো বাগানের কাজ নিয়ে আলোচনা করছেন। প্রতিটি দৃশ্য এখানে একদম বাস্তব মনে হলেও পার্থক্য শুধু একটাই, এদের কারও মধ্যে প্রাণ নেই।

স্কুল যখন পুতুলের

গ্রামে ফিরে কোনো শিশু-কিশোর দেখেননি সুকিমি। গ্রামের একমাত্র স্কুলটিও শিক্ষার্থীর অভাবে কয়েক বছর আগে একদম বন্ধ হয়ে যায়। স্কুলের জন্য সুকিমি বেশ কিছু পুতুল বানালেন। পুতুল ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বানানোর সময় দুষ্টুমিভরা চাহনি দিয়েছেন। প্রতিটি ক্লাসরুমের বেঞ্চে পুতুল শিক্ষার্থীরা বসে আছে।


স্কুলে পুতুল

স্কুলে পুতুল। ছবি : স্কেয়ারক্রস


 তাদের সামনে বই, খাতা রাখা আছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ হয়তো খাতায় দাগ কাটছে, কেউ বই পড়ছে, কেউবা পাশের জনের সঙ্গে গল্প করছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, সেখানে আরও আছে, শিক্ষক, বাবা-মাসহ প্রয়োজনীয় সব চরিত্র।

পুতুলের কমিউনিটি সেন্টার

নাগোরো গ্রামে মানুষ না থাকলেও কমিউনিটি সেন্টারটি এখনো আছে। আর সেখানেও পুতুল দিয়ে বিয়ের সাজ-উৎসব করেছেন সুকিমি। স্টেজে বর-বধূ ওয়েস্টার্ন আর জাপানিজ পোশাকের নকশায় কাপড় পরে আছে। তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে রয়েছে ছয়জন ছোট বালক।


জাপান

পুতুল গ্রাম, জাপান। ছবি : সংগৃহীত



যেভাবে বানানো হয় পুতুল

পুতুল বানাতে সুকিমি ব্যবহার করেন নানা কিছু। আর এসব কিছু সামনে বসে দেখারও সুযোগ আছে। এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসের চতুর্থ বুধবার যে কেউ চাইলে তার কাছে পুতুল বানানো শিখতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে, সঙ্গে করে অবশ্যই নিজস্ব সেলাই করার সরঞ্জাম এবং কাপড় নিয়ে যেতে হবে।


পুতুল গ্রাম

পুতুল গ্রাম। ছবি : সংগৃহীত


প্রশিক্ষণে সুকিমি জানান পুতুলের প্রথম স্তরের জন্য কেমন কাঠ, মাথার জন্য কী ধরনের তুলা, চামড়ার জন্য কেমন নমনীয় কাপড়, চোখের জন্য কেমন বোতাম, প্রতি পুতুলের দেহ বানাতে কতগুলো তার ও কী ধরনের ৮০ রোল কাগজ লাগে। পুতুলের গায়ে জড়ানো পুরনো কাপড়গুলো সুকিমি সাধারণত জোগাড় করেন জাপানের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া দান করা কাপড় থেকে। এছাড়া যারা আগে গ্রামে বাস করতেন, তাদের ব্যবহার করা কাপড়গুলোও ব্যবহার করা হয়। নাগোরো গ্রামের প্রতি বাড়ির অন্তত একজনের করে হলেও পুতুল বানিয়েছেন সুকিমি।


পুতুল গ্রাম

পুতুল গ্রাম। ছবি : সিএনএন


 

কেন জনশূন্য নাগোরো গ্রাম

১৯৫০-৬০ সালের দিকে নাগোরো গ্রামে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপরই পানির অভাব দেখা দিলে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। গ্রামে যারা ছিল তারা নিজেদের সবজি চাষের জন্য নিজস্ব পানির পাম্প ব্যবহার করত।


পুতুল গ্রাম এ জনমানবহীন এক পুতুল

জনমানবহীন এক পুতুল। ছবি : স্টারটিস টাইমস


বর্তমানে গ্রামে কোনো দোকান নেই। সবচেয়ে কাছের দোকান বা হাসপাতালে যেতে হলেও আঁকাবাঁকা রাস্তা পার হয়ে পৌঁছাতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। গ্রামে নতুন কোনো শিশুর জন্ম হলেও তার যত্ন, চিকিৎসার জন্য হলেও বাবা-মা এখানে থাকবেন না। নতুনদের আকৃষ্ট করার জন্য জায়গাটি বলতে গেলে একদম পিছিয়ে আছে।  

নাবিলা বুশরা   এস এম