ভ্রমণ বিষয়ক লেখক এবং বিশ্ব ভ্রমণকারী আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল। ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি; প্রধান নির্বাহী, ডেল্টা আউটডোর্স ডট কম এবং গুড-উইল অ্যাম্বাসেডর, স্পিক অর্গানাইজেশন। এমন অসংখ্য পরিচয়ে সুপরিচিত একজন মানুষ। কিন্তু এই পদটাই তার আসল পরিচয় নয়। তিনি একজন বিশ্ব পরিব্রাজক, দুই চাকার সাইকেল নিয়ে যিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন ছয় মহাদেশের ৫৮টির বেশি দেশে।
খেলাধুলা আর ভ্রমণ বিষয়ক বই থেকেই তার মধ্যে জেঁকে বসে ভ্রমণের নেশা। এছাড়া বাংলাদেশ যুব পর্যটক ক্লাবের সদস্য হওয়ার সুবাদে সুযোগ হয় দেশ-বিদেশ ঘুরে আসা প্রায় সমবয়সী পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা শোনার।
এরপর, প্রথমবার ভারত ভ্রমণে গিয়ে নেশা ধরে তার। সে থেকেই শুরু। ১৯৯৭ সালে সাইকেল নিয়েই বেরিয়ে পড়েন বিশ্ব ভ্রমণে। ভ্রমণের পাশাপাশি লেখালেখি ও প্রকাশনার সঙ্গেও যুক্ত তিনি। নিজের ভ্রমণ জীবন নিয়ে লিখেছেন 'সঙ্গী সাইকেল ও আরাধ্য পৃথিবী', 'এবং পূর্ব আফ্রিকা'- শিরোনামে বই। এছাড়াও নিয়মিত সম্পাদনা করছেন 'ভ্রমণের প্রজাপতি' শীর্ষক আরেকটি গ্রন্থ। ট্রাভেল বাংলাদেশ আজ মুখোমুখি হয়েছে দেশের এই পর্যটক, ভ্রমণ বিষয়ক লেখক ও প্রকাশকের। কথা হচ্ছে পর্যটনশিল্পের সংকট, সম্ভাবনা ও নতুন সৃজনশীলতার নানা দিক নিয়ে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : করোনার লক-ডাউনে কীভাব সময় অতিবাহিত করছেন?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল :
করোনার সময় অনেক লম্বা হয়ে গেলো। সেই মার্চ মাস থেকে শুরু করে, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই চলে গেলো। এই কঠিন সময় আসলে ওভারকাম করতে হবে। প্রথম দিকে সময় অন্য রকম ছিল। এখন ভিন্ন। সাধারণত এসময় মুভি দেখা, বই পড়া, পরিবারকে সময় দিয়ে কাটিয়েছি। আমরা যারা ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি, তাদের জন্য সময়টা আসলে অনেক কঠিন। করোনা কবে যাবে, বা আদৌ যাবে কিনা সেটা আমরা নিশ্চিত না।
ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
ট্রাভেল বাংলাদেশ : লকডাউনের সময়ে কোন ধরনের কাজ করছেন?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : এখন সম্পৃক্ত হয়ে গেছি বিভিন্ন কাজে। যেমন আগে থেকে একটা পরিকল্পনা ছিল যে, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলার পর্যটন উন্নয়নে কীভাবে কাজ করা যায়, ওসব এলাকার বিখ্যাত খাবার, স্থানগুলোকে ডকুমেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরা। যেহেতু করোনা চলে আসলো, এসময় আমরা অনলাইনের মাধ্যমে চেষ্টা করছি ফুড প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে।
আমরা ঢাকায় বসে যেমন প্রত্যন্ত অঞ্চলের যে ফুড প্রোডাক্ট তা সেভাবে পাই না, পেলেও তরতাজা ফল পাওয়া হয় না তেমন। এই অবস্থায় তরুণ প্রজন্ম যদি ফুড বিজনেসে আসে তাহলে ভালো খাবারটা সাপ্লাই দিতে পারবে। এমতাবস্থায় যারা ভেজাল বাণিজ্য করেন তাদের বিরুদ্ধেও একটা প্রতিরোধ হিসেবে জায়গা তৈরি হবে। এদিকটাই দেখছি।
এছাড়াও, আমার একটা ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান আছে। আপাতত তা বন্ধ আছে লক-ডাউনে। তবে, এটাকে কীভাবে নতুন করে শুরু করা যায় সে পরিকল্পনাও করছি। যেমন, আমরা সাইকেল ট্যুরের আয়োজন করেছি। আমার প্রতিষ্ঠান ও স্পিড নামক একটি ইন্টারন্যাশনাল সংগঠনের মাধ্যমে উদ্যোগ নিচ্ছি। কালীগঞ্জ যাব। আমি ঐ সংগঠনের বাংলাদেশের গুড-উইল অ্যাম্বাসেডর। এখন করোনার ফলে আমাদের ট্যুরিজম বিজনেস বন্ধ। আরও ৬ মাস যদি এভাবে বন্ধ থাকে তাহলে অনেক ট্যুর অপারেটর তাদের বিজনেস প্লান পরিবর্তন করে ফেলতে পারে। এই অবস্থায় আমরা চেষ্টা করছি যে, কীভাবে টিকে থাকতে পারি, কীভাবে নতুন করে কিছু শুরু করতে পারি, সে চেষ্টা করছি। প্রায় সবকিছু প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আমরা হয়তো একটু নতুনভাবে শুরু করব শিগগিরই।
আর্জেন্টিনায় উজ্জ্বল। ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
ট্রাভেল বাংলাদেশ : করোনা যদি এই অবস্থায় থাকে তাহলে দেশের বাইরে ট্যুর অপারেটর করা যাচ্ছে না?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : এটা যাবে না। আবার এফেয়ার বেড়ে যেতে পারে। আরেকটি বিষয়, ভাইরাসের কারণে আমাদের এখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে অন্য দেশ হয়তো আমাদেরকে ভিসা দেবে না। টুরিস্টরাও ভ্রমণ করতে পারবে না। সেসব দেশ থেকে বাংলাদেশেও আসবে না। এই অবস্থায় ডমেস্টিক ট্যুরিজম বাড়বে আশা করি। লম্বা সময় ধরে মানুষ গৃহবন্দি হয়ে আছে। বের হওয়ার জন্য মানুষ অস্থির হয়ে আছে।
পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে তো তারা বের হবে। কিন্তু বের হলে তো শুধু হবে না। সচেতন তো হতে হবে। এই অবস্থায় ট্যুরের ক্ষেত্রে যেটা করা যায়, সাইকেল ট্যুরিজম ও পায়ে হেটে ট্যুর শুরু করা যায়। উন্নত দেশে এগুলো প্রচলিত আছে। যেমন : ওয়াকিং ট্যুর। দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টার ট্যুর হতে পারে। বিভিন্ন স্থানে যদি এভাবে সংক্ষিপ্ত আকারে বা আরও বড় আকারে ট্যুর আয়োজন করা যায়, অথবা একদিনের সাইকেল ট্যুর, এভাবে নতুন করে ট্যুর শুরু করা যেতে পারে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : এমন সাইকেল ট্যুর বর্তমানে দেশে কি কেউ করছে ?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : না, এমন বাণিজ্যিকভাবে হয়তো কেউ শুরু করেনি। তবে অনেক গ্রুপ আছে, যারা সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সাইকেল র্যালি আয়োজন করে থাকে। যেমন বিডি সাইক্লিস্ট গ্রুপ আছে, বিভিন্ন জেলা ভিত্তিক এমন গ্রুপ বা সাইক্লিং ক্লাব আছে যারা সাইক্লিং করে। কিন্তু এগুলো নন কমার্শিয়াল। কমার্শিয়ালি এখনও সেই জায়গাতে কেউ পৌঁছেনি।
ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
ট্রাভেল বাংলাদেশ : আপনি তো একজন সাইক্লিস্ট। বিশ্বব্যাপী ট্যুর করেছেন। আপনার এমন কোনও পরিকল্পনা আছে কিনা?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : এরকম ভালো কিছু পরিকল্পনা আছে। যেমন, সম্প্রতি আমরা একটা ট্যুর করেছি। পরবর্তীতে হয়তো বিভিন্ন জেলাতে সাইকেল ট্যুর আয়োজন করবো। একই সাথে আমরা এমনভাবে কিছু ডেভেলপ করতে চাই, যা ব্যতিক্রমধর্মী। যেমন ধরুন, ট্রাভেল কনসালটেন্ট, যেটা বাংলাদেশে এখনও চালু করা যায়নি।
ধরুন কেউ একজন আফ্রিকার কোনও দেশে যাবে, সেখানে যাওয়ার জন্য কোনও ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে যাবে না। তিনি একাই যেতে চান। এক্ষেত্রে তাকে কোনও কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান সহযোগিতার করতে পারে। কিন্তু এমন কোনও সুবিধা বাংলাদেশে এখনো চালু হয়নি। এমন সার্ভিস আমরা শুরু করতে চাচ্ছি।
এক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য আমরা ৫০টা দেশ নিয়ে একটা ডাটাবেজ তৈরি করছি।
বিষয়টা আরও একটু ক্লিয়ার করি। ধরুন, আপনি যদি একজন ডাক্তারের কাছে যান, আপনার অসুখ ভালো হোক না হোক আপনার কিন্তু ভিজিট দিতে হচ্ছে/ফি দিচ্ছেন। আপনি আইনজীবীর কাছে যান, আপনি কিন্তু ফি দিচ্ছেন। কিন্তু আপনি একজন ট্রাভেল কনসালটেন্টের কাছে ফি দিচ্ছেন না। বাংলাদেশে এই পরিবেশটা তৈরিই হয়নি। তাছাড়া যে ট্রাভেল কনসালটেন্সি করবে তার তো সেরকম যোগ্যতা লাগবে। যেমন, সে ট্যুরিজমে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেছে অথবা আরেকটা বিষয় যে প্রচুর ট্রাভেল করেছে এবং যে প্রচুর জানে, জ্ঞান রাখে ট্যুরিজম সম্পর্কে। এরকম প্রফেশনাল হতে হবে। ট্রাভেলের মাধ্যমে সে লক্ষ লক্ষ লোককে অনুপ্রাণিত করতে পারবে, উৎসাহিত করতে পারবে।
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর লেখা বই। ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
এমন একজন ব্যক্তি, যে কিনা একটা দেশ ট্রাভেল করল এবং আবিষ্কার করল, যে কিনা অন্যদের ধারণা দিতে পারে। তখন তার পক্ষে এটা সম্ভব। এই বিষয়ে ডেভেলপ করার জন্য আমরা প্রতি সপ্তাহে একেকটা দেশ নিয়ে আলোচনা করবো। যে যে দেশে গেছে সে ওই বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা আলোচনা করবে। নিজের ধারণা সম্পর্কে মানুষকে শুনাবে। এভাবে আমরা কাজ করতে চাচ্ছি। আমরা একটু লার্নিং প্রসিজিউরে যাব। যেন জেনে-বুঝে মানুষ ট্রাভেল করে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ: পড়ালেখা শেষ করে তরুণরা ক্যারিয়ারমুখী হয়। কিন্তু আপনি ভ্রমণ করেছেন। কীভাবে সাইকেল ট্যুরে আগ্রহ আসলো?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : আমি একটা সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম-বাংলাদেশ যুব পর্যটন ক্লাব। সে ক্লাবের লক্ষ্য হলো, তরুণ ছেলে-মেয়েদেরকে দেশ ও দেশের বাইরে ট্যুর করানো। সে ক্লাবের সাথে যুক্ত হওয়ার সুবোধে আমার দেশ ঘোরার বিষয়টা আসে। নিজের ছাত্রাবস্থাতেই এটার প্রতি একটা প্রেম-ভালোবাসা জন্মে গেছে। সে কারণে আমরা অন্যদের মতো ক্যারিয়ার তৈরি না করে ঘুরতে বেরিয়েছি এবং আমি যেভাবে সারা বাংলাদেশ একটানা ঘুরে বেরিয়েছি, সেরকম ঘুরে বেরানোর লোক খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। টানা ১০ মাস ঘুরে বেড়াবে অথবা একটা দেশ ১ মাস ধরে ঘুরে বেড়াবে সেরকম লোক তো খুবই কম।
আমার ভ্রমণ বিষয়ক বইও প্রচুর পড়া হয়। এখনো ৭-৮'শ ভ্রমণ বিষয়ক বই আছে আমার সংগ্রহে।
দুই বাংলার কারও কাছেই এতো বই নাই এই বিষয়ে। আমার সংগ্রহে আছে। কোনো একটা দিকে মানুষের এমন প্রেম থাকতে হয়, না হলে এতোটা ডেভেলপ করা যায় না। আমাদের তো তখন ইন্টারনেট ছিল না। কঠিন ছিল সবকিছু। আর এখন সব সহজ। এভাবে সহজে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানার আগ্রহটা কমে যাচ্ছে। যেমন, আমরা এখন মোবাইল নাম্বার মুখস্থ রাখি না। আগে আমরা সেটা রাখতাম। এখন কারও নাম্বার আমরা মুখস্থ রাখতে পারি না। আমরা এখন ইন্টারনেট নির্ভর, গুগল নির্ভর হয়ে গেছি। এখন যদি আমরা বলি, কলম্বিয়া সম্পর্কে কিছু বলো, সাউথ আফ্রিকা সম্পর্কে কিছু বলো, বলতে পারছে না। কারণ গুগলে সব আছে।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ এর ফলে এয়ারে যাওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কেউ যদি সাইকেল ট্যুর করতে চায় তখন কি ভিসা পাওয়া সহজ হবে? কীভাবে সম্ভব?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : আসলে ভিসা পাওয়া আমাদের জন্য কখনোই সহজ ছিল না। আমরা যখন ট্রাভেল করি, তখন অন্য দেশের কাছে আমাদের দেশের তেমন ইতিবাচক পরিচিতি ছিল না। এটা অনেকটা বাধাগ্রস্ত ছিল। আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বলেন বা নানা ধরনের ইস্যুর কারণে আমরা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এখন আবার কোভিড-১৯ এর ফলে একটু আরও বেশি কঠিন হবে ভিসা প্রাপ্তিতে। কিন্তু প্রতিটি মানুষকেই তো চ্যালেঞ্জ ফেস করতে হয়। সহজে তো কিছু পাওয়া যায় না। সেটা তারাই ওভারকাম করতে পারবে যাদের চেষ্টা আছে, ধৈর্য আছে এবং যারা এটার পেছনে লেগে আছে। এই জিনিসগুলো না থাকলে এখন সম্ভব না।
ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
প্রত্যেকটা মানুষের আসলে প্রোফাইল তৈরি করতে হবে। আমরা যখন সাইকেল ট্যুরে যাই তার আগে কিন্তু ৬-৭ বছরের একটা ট্রাভেল অভিজ্ঞতা ছিল। আর এখন একটা মানুষ চাইলেই যে শুরু করে দিতে পারবে তা কিন্তু সম্ভব হবে না। তাকেও অভিজ্ঞতা নিতে হবে, ঘুরতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো রাস্তায় নামতে হবে। রাস্তায় নামলে পথ পথ দেখাবে। বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তার আগে দেশের ভেতরে কতটা করতে পারছে তা দেখতে হবে। একই রকম ভাষা, কালচার এখানেই যদি কেউ ট্যুর না করতে পারে, তাহলে সে কীভাবে বাইরে যাবে?
একারণে আগে দেশের ভেতরে সাইকেল ট্যুর করতে হবে, কনফিডেন্স লেভেলটাকে বাড়াতে হবে। মানুষের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করতে হয় তা শিখতে হবে, কী করে রান্নাবান্না করতে হয় শিখতে হবে, খাবার না পেলে কীভাবে সার্ভাইভ করতে হয় সে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। তখন সে আত্মবিশ্বাস পাবে দূরে যাওয়ার। আমি যদি আগে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটা না শিখি তাহলে আমি কীভাব পুকুরে বা নদীতে নামব? আগে তো আমাকে সাঁতার কাটা শিখতে হবে। তারপর না আমি বড় জায়গায় যাব। কিন্তু আমরা প্রথমেই বড় জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করি। একারণে আমরা সফল হচ্ছি না।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : কোভিড-১৯ এর ফলে সবকিছুতে একটা বড় রকমের আঘাত এসেছে। পর্যটনে যে আঘাত এসেছে সেটা কাটিয়ে উঠা কতটা কঠিন হবে?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : পর্যটন আসলে এত বড় একটা শিল্প যেটার সঙ্গে অনেকগুলা শিল্প জড়িত। এটার সাথে ট্রান্সপোর্ট, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, এয়ারলাইন্স, লোকাল যে খাবার; ইত্যাদি সবকিছু জড়িত। মূলত সবচেয়ে বেশি শিল্প এটার সাথে জড়িত। কিন্তু এই শিল্পটা দেশের প্রেক্ষাপটে সেভাবে গড়ে উঠতে পারছে না। কারণ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এতটা শক্তিশালী না, গুরুত্বটাও সেভাবে নেই।
সরকারের প্রাধান্যের জায়গায় আমাদের পর্যটন দিকটা এখনও আসেনি সেভাবে। সেটা প্রাইভেটে সেক্টর থেকেও হয়নি। কাগজে কলমে হয়তো অনেক কিছু আছে, বাস্তবতা ভিন্ন। কাগজে কলমে তখনই কিছু দেখাতে পারেন যখন জনসাধারণ উপকৃত হচ্ছে। যে কিছু জানে না-বুঝে না, সে যখন ট্যুরিজম বুঝতে পারছে, তখন বুঝতে হবে যে, ট্যুরিজম আগাচ্ছে। এর আগে না। আমরা যখন বিদেশে যাই এয়ারপোর্ট থেকে নেমে একাকী বাস-ট্রেনে যেতে পারি। কিন্তু আমাদের কি সেরকম আছে?
ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
যেখানে একজন টুরিস্ট একাকী যেতে পারবে। বা আমরা যখন কক্সবাজারে যাই যে, দামটি রাখা হচ্ছে সে দামটি আশপাশের দেশেও নেই। আমরা সবকিছু এভাবে করে রাখি। একটা নন-প্রফেশনাল আচরণ আছে আমাদের। যারা কাজ করছে তাদের প্রতি সম্মান রেখে বলি, যারা এখানে কাজ করছে তাদের কিন্তু সে বিষয়ে গভীর জ্ঞান নেই। এটা করতে হবে, বা তারা করছে। কারও হয়তো একাধিক বিজনেস আছে। পাশাপাশি ট্যুরিজমের একটা কাজ দিয়ে বসে আছে।
আপনি বাংলাদেশে হাতে গুণতে পারবেন তাদের যারা শুধু ট্যুরিজম বিজনেস করছে, অন্য কোনও কিছু ছাড়া। এটা কাউন্টেবল, এত কম। দেখা গেলো, ট্যুরিজমের পাশাপাশি অন্য অনেক ব্যবসা আছে। ১০০ ভাগ ট্যুরিজমের সংখ্যা কিন্তু কম। কারণ আমাদের দেশে এমন একটা বিজনেস যেটা ৬ মাস ব্যবসা হয়, বাকি ৬ মাস হয় না। সিজনাল ব্যবসা। সিজনাল ব্যবসা করে তো বড় ব্যবসায়ী বলা যায় না। আর যারা ট্যুরিজমে ব্যবসা করছে তারা অর্থনৈতিকভাবে খুব শক্তিশালী না, দুর্বল।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : এই সংকট কীভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : করোনার সময় এরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমত সরকারের সাপোর্ট লাগবে। সাপোর্ট বলতে যে টাকা দেবে তা নয়। যাবতীয় অবকাঠামো থেকে শুরু করে অন্য সব কিছুতে প্রিভিলেইজ দেয়া। এগুলো সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সরকার চাইলেই ন্যাশনালই বা ইন্টারন্যাশনালই যদি প্রপোজাল বা কনসেপ্ট পেপার আহ্বান করে যে, আপনারা ধারণা দেন। এভাবে কিছু করা যায়।
আমরা এই বিষয়ে ট্যুরিজম মিনিস্ট্রিকে প্রপোজাল পাঠিয়েছি, যে আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি ও সে বিষয়ে আগামী বছর গুলোতে আমরা কি করতে পারব। মূলত বাংলাদেশের ট্যুরিজম আগাতে হলে শর্টটাইম, মিডটাইম এবং লংটাইম এই তিন ধরনের প্লানিং দরকার। সে প্লানিং অনুযায়ী আগাতে হবে। কোনোটা প্লানিং হবে আগামী বছরের জন্য, কোনোটা তিন বছরের জন্য, কোনোটা ২০ বছরের জন্য। সেরকম প্লানিং না থাকলে ট্যুরিজম আগাবে না।
ট্রাভেল বাংলাদেশ : দেশের ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে কোন ধরনের নতুনত্ব তৈরি করা যেতে পারে?
আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল : সবকিছুতে পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন আপনার মধ্যে নলেজ থাকবে। নলেজ থাকলে ট্যুরিজমে নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা যায়। আমরা অনেক কিছু দেখাতে জানি না। যেমন পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে টুরিস্টদের ধান ক্ষেত দেখায় । আমরা সেটা করতে পারি না। আমি মনে করি পুরো বাংলাদেশটাই ট্যুরিজম স্পট। দেশের যেকোনো জায়গাকেই প্রোডাক্ট হিসেবে দেখাতে পারি আমরা। কিন্তু আমরা তো সেটা করতে পারি না। তা করতে হলে মার্কেটিংয়ের ব্যাপার আছে। প্যাকেজিংয়ের ব্যাপার আছে। ওই নলেজ থাকতে হবে।
ছবি : আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল-এর ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
যেমন, যারা প্যাকেজিং করবেন তারা হয়তো তার নিজের গ্রাম ভালোভাবে দেখেনি, কখনও ধানক্ষেত দেখানোর নিয়ম বা নদী ঘুরে দেখানোর নিয়ম বা জ্ঞান তার জানা নেই। কারণ, যেহেতু সে অনেক ট্রাভেল করেনি, এটা যে প্রোডাক্ট হতে পারে সে নলেজটাই তার তৈরি হয়নি। ব্রাজিলে ১০০ ডলার খরচ করে বস্তি দেখাতে নিয়ে যায়। যেটাকে স্লাম ট্যুরিজম বলা হয়। বোম্বেতেও সেটা আছে। বাংলাদেশের মানুষ কি এটা কখনও চিন্তা করতে পারে যে, আমরা বস্তি দেখাবো আর পয়সা নেবো?
আমাদের এখানে ভাববে, বস্তি দেখানোর কি আছে? সেরকম ইনোভেটিভ সাহসই নাই আমাদের।
অথবা একজন টুরিস্ট নিয়ে গ্রামে যাবেন, একজন কৃষকের বাড়িতে রাখবেন, পুকুর থেকে মাছ ধরাবেন, লোকাল ফুটবল খেলবে, লোকদের সাথে মিশবে, কালচারটা জানবে। সেভাবে কি আমরা কখনও করতে পারছি? পারিনি।
এভাবে কিন্তু অনেক কিছুই করা যায়। তার জন্য বিদ্যাবুদ্ধি দরকার, সেটা আমাদের অধিকাংশ লোকের নেই। সে কারণে ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে না। ডেভেলপমেন্ট শুধু সরকারের পক্ষ থেকে আসবে না। উভয় দিক থেকে আসবে। ইনোভেশন তো সরকার করে দেবেনা। আপনাকেই করতে হবে। আমাদের তো ওয়ার্কশপ হয় না, ট্রেনিং হয় না। আমাদের সেই ডাটাবেজও নাই যে, পুরো বাংলাদেশে কতটা টুরিস্ট স্পট আছে, কোন কোন দিকগুলো ট্যুরিজম হয়ে উঠতে পারে। এই বিষয়ে ভালো কিছু থাকত হবে।