ট্রাভেলবিডি স্পেশাল: করোনায় থেমে গেছে দেশের যে ট্যুরিজম প্রজেক্টগুলো

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: করোনার জন্যে নির্মাণাধীন তারকা হোটেল-রিসোর্ট নিয়ে শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা


দেশে নির্মাণাধীন একাধিক ৫ তারকা হোটেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কর্তৃপক্ষ

দেশের নির্মাণাধীন একাধিক ৫ তারকা হোটেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় কর্তৃপক্ষ। ছবি : দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


গত ৫ দশকে বাংলাদেশে যতগুলো হোটেল ছিল তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হোটেল বাংলাদেশে দেখা যেত আগামি ৫ বছরে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে এই দৃশ্য কবে নাগাদ বাস্তব হবে তা এখনও বলা যাচ্ছে না। বেশ কয়েকটি হোটেল নির্মাণের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় সেগুলো অতিথিদের জন্য উন্মুক্ত করার সময় আরও ১ থেকে ২ বছর বাড়ানো হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে উদ্যোক্তাদের লোন শোধ করার সময়।

প্রায় হাফ ডজন হোটেল নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই মহামারির কারণে নিজেদের কাজ বন্ধ রেখেছে। দুই মাসের বেশি বন্ধ থাকা কিছু প্রজেক্টে কাজ শুরু হলেও বেশিরভাগ ব্যবসাতেই বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। শঙ্কা বাড়ছে তহবিল নিয়েও। মার্চ মাসের শেষের দিকে দুটো হোটেল চালু হবার কথা থাকলেও করোনা ভাইরাসের কারণে তা সম্ভব হয়নি। মহামারির চার মাস কেটে গেলেও তারা জানেন না কবে থেকে কাজ শুরু করা যাবে হোটেলের। হোটেলগুলোর নির্মাণে খরচ হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। মার্চ মাসে রাজধানীর বনানীতে ফাইভস্টার শেরাটন হোটেল চালু করার কথা ছিল ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্টের। কিন্তু মহামারিতে এই কোম্পানির সকল পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়, হয় আর্থিক ক্ষতি। শুধু এটিই নয়, ২০২৫ সাল নাগাদ কোম্পানিটির পরিকল্পনা ছিল গুলশানে সেভেনস্টার সেন্ট রেজিস হোটেল এবং ফাইভস্টার হায়াত সেন্ট্রিক ঢাকা হোটেল নির্মাণের। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী শাখাওয়াত হোসাইন জানান, 'আমাদের সবগুলো হোটেল নির্মাণাধীন। কভিড-১৯ এর কারণে সব কাজ স্থগিত করা হয়েছে'। আমেরিকা ভিত্তিক গ্লোবাল চেইন ওয়েস্টার্ন হোটেল এন্ড রিসোর্টের মায়া করপোরেশনের সঙ্গে মিলে নিকুঞ্জে শুরু করার কথা ছিল 'বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস মায়া'। গত তিন বছর ধরে কাজ চলা হোটেলটির কথা ছিল এই বছরের মার্চে উন্মুক্ত হবার। কিন্তু সেই প্রোগ্রাম তাদের বাতিল করতে হয়েছে। বেস্ট ওয়েস্টার্ন প্লাস মায়া'র প্রধান নির্বাহী রাশেদুল হোসাইন চৌধুরি রনি বলেন, 'এটি একমাত্র উন্নত মানের বুটিক হোটেল যেখানে অন্তত ৪২টি রুম আছে। শুধু তাই নয়, আমাদের সেবা, সুযোগ সবই ছিল ৫ তারকা হোটেলের মত। হোটেলটি নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ শতাংশ ব্যাংক লোন দিয়ে।

অন্তত ৪৫ জন কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু মহামারির কারণে সকল পরিকল্পনা থেমে গেছে। আমাদের এখন মাত্র ৭ জন কর্মী আছে। বাকিদের অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাজ থেকে বাদ দিতে হয়েছে। আমরা জানি না এই পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ আমরা হোটেল চালু করতে পারব।' ১৭টি স্টার হোটেলের মধ্যে ১৩টিই ছিল ফাইভ স্টার কাতারের। এগুলো নির্মাণে খরচ হয়েছে অন্তত ৬,০০০ কোটি টাকা। এদের সবারই ২০২৫ সাল নাগাদ মার্কেটে আসার পরিকল্পনা ছিল। সবগুলো হোটেল মিলে রুম ছিল ৩,০০০ এরও বেশি, চাকরির সম্ভাবনা ছিল অন্তত ৬,০০০ মানুষের।

'একটি স্টার ক্যাটাগরির হোটেল প্রতি রুমের জন্য প্রায় ২ জন কর্মী নিয়োগ করে। একটি রুমের ইন্টেরিওর ডিজাইনের জন্য খরচ হয় প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা। হিসাব করলে ২৫০ রুমের একটি ফাইভ স্টার হোটেল নির্মাণে খরচ হয় ৫০০ কোটি টাকা। কোভিড-১৯ সব এলোমেলো করে দিয়েছে। হোটেলগুলো কবে খুলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করছে অনেক বেশি', বলছিলেন গুলশানের সিক্স সিজনস হোটেলের জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আল আমিন।


কাজ চলছে গুলশান দুইয়ে অবস্থিত হিল্টন হোটেলে ছবিঃ ইন্টারনেট


 আন্তর্জাতিক কিছু হোটেলও বাংলাদেশে ব্যবসা করছে, যেমন হোটেল শেরাটন, হলিডে ইন, জেডব্লিউ ম্যারিয়ট, সুইসোটেল, হায়াত রিজেন্সি, এলিমেন্ট হোটেল, সেইন্ট রেজিস হোটেল, হিল্টন হোটেল এবং ডাস্টিন হোটেল। স্থানীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক মানের হোটেলগুলোর সাথে প্রফিট শেয়ারের মাধ্যমে হোটেল চেইনে কাজ করে। হিল্টন হোল্ডিংসের সঙ্গে গ্লোবাল হোটেল চেইন সূত্রে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল প্রিমিয়ার হোটেল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড। ২০২২ সাল নাগাদ গুলশানে ২৫০ রুমের হোটেল প্রস্তুত হবার কথা ছিল।

এই প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে গুলশানে ম্যারিয়ট হোটেলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ২১১ রুমের রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলের কার্যক্রম চালাচ্ছে। হোটেল রেনেসাঁর একজন কর্মকর্তা বলেন, 'আমরা ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের হোটেলের কার্যক্রম শুরু করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে মহামারি আমাদের এই খাতকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে ফেলেছে'। বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্টিজ এবং সুইসোটেল হোটেল এন্ড রিসোর্ট মিলে ঢাকার গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডে ৩৭৫ রুমের সুইসোটেল হোটেল নির্মাণের জন্য চুক্তি করে। ২০২২ সালে চালু হবার কথা থাকলেও মহামারিতে থেমে গেছে এই হোটেলের কাজও।


ঢাকায় প্রস্তাবিত হলিডে ইন হোটেল ছবিঃ বাংলাদেশ মনিটর


রাজধানীর হাতিরঝিলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল গ্রুপের স্থানীয় মরিয়ম গ্রুপের সঙ্গে মিলে মার্চ মাসে চালু করার কথা ছিল হলিডে ইন ঢাকা। কিন্তু থেমে আছে সে কাজও। হোটেলের জন্য শুরুতে কর্মী নিয়োগ করা হলেও কাজ চালু না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে না। কিছু কর্মীকে ছাঁটাইও করা হয়েছে।

আরও যতগুলো হোটেল আসার কথা রয়েছে :

১। ২০২২ সাল নাগাদ রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওজো নামে আরেকটি ব্যবসা চালু করার কথা রয়েছে আমারি হোটেলের। তবে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ হোটেল চালু হবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। ২। রেডিসন হোটেল গ্রুপ, গ্র্যান্ড হোটেল এবং হসপিটালিটি লিমিটেড মিলে খুলনায় ১৫০ রুমের অত্যাধুনিক একটি হোটেল নির্মাণের কথা রয়েছে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি এই হোটেল চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। ৩। হায়াত হোটেল করপোরেশনের সঙ্গে ফাইভ স্টার হোটেলের চুক্তি করেছে ইউনিয়ন লিমিটেড। বসুন্ধরার ৩০০ ফিট এলাকাতে এটি স্থাপিত হবার কথা রয়েছে।

৪। উইন্ধাম হোটেল গ্রুপ হওয়ার্ড জনসন হোটেলের ২০২২ সাল নাগাদ ঢাকায় চালু হবার কথা রয়েছে। মহাখালিতে অবস্থিত এই হোটেলের এই মুহূর্তে নির্মাণ কাজ চলছে। ৫। চট্টগ্রামের ম্যারিয়টে, পেনিনসুলা এয়ারপোর্ট গার্ডেন এবং নোভোটেলে আরও কিছু হোটেল আসতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট সেক্টরে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ আয় বেড়েছে। তার আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। এই ব্যবসাখাতে খরচ হয়েছে ৭,৩০০ কোটি টাকা। সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং ট্যুরিজম মিনিস্ট্রি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট সেলের হিসেব অনুযায়ী, দেশে এই মুহূর্তে ১৭টি ফাইভ স্টার, ৪টি ফোর স্টার এবং ১৭টি থ্রি স্টার হোটেল রয়েছে।

সুত্রঃ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড  

নাবিলা বুশরা       এস এম


Click Here To See More