জাদুর শহর প্রাণের শহর ঢাকা : ইতিহাস-ঐতিহ্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরী

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : শহরটির পরতে পরতে ঐতিহ্যবাহী সব স্থাপত্যের দেখা মিলবে

dhaka যান্ত্রিকতার বাহিরে ভালো কিছু স্থান যেন একটু স্বস্তি এনে দেয়। ছবি : ডেইলী নয়াদিগন্ত

 “দু চোঁখে স্বপ্ন ছিল

রংতুলিতে আঁকা বড় হোলে

যাব আমি রাজধানী ঢাকা,

শুনেছি এ ঢাকায় বেকার কেউ এলে

কোন না কোন সে চাকরি একটা মিলে।”

 

হোসাইন মোহাম্মদ কবির-এর কবিতায় এই আজব শহরকে ঘিরে নানা স্বপ্নের কথা উঠে এসেছে। হ্যাঁ, বলছিলাম আজব শহর ঢাকার কথা। আজব বললাম এই কারণে যে, ঢাকা এমন একটি স্থান যেখানে ইট পাটকেলের মাঝে বদ্ধ হয়ে রুদ্ধ দিনানিপাত করার অনুভুতি যেমন নেয়া যায় তেমনই আবার স্নিগ্ধ আবেশে হারিয়ে যাওয়ার মূর্ছনাও একই সাথে ছুঁয়ে যাবে।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ ঢাকায় অবস্থিত ভালো সময় কাটানোর জন্য নির্মিত স্থানগুলো ঢাকাকে যেন দিয়েছে আলাদা পরিচয়।

সোনারগাঁও :সোনারগাঁও ছবি : আবদুল আউয়াল উজ্জ্বল


ঢাকা থেকে ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলায় ঐতিহাসিক এই স্থানটি অবস্থিত। সোনারগাঁও পূর্বে ঈশা খাঁর রাজধানী হিসেবে ছিল। এখানে রয়েছে সোনা বিবির মাজার, পাঁচ বিবির মাজার, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মাজারসহ আরও অনেক কিছু। ঐতিহাসিক ভবনগুলো আগতদের আকর্ষনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। এখানে সবথেকে আকর্ষণ হলো শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের চিত্রকর্মের কাজ এবং কারুশিল্প জাদুঘর। জাদুঘরে সতেরো শতাব্দীর বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করা আছে। শুধু তাই নয় আপনি চাইলে এখানের লেকে নৌকা ভ্রমণ করতে পারবেন, মাছ ধরতে পারবেন এবং পিকনিক স্পট হিসেবে সোনারগাঁও বেশ খ্যাত। এখানে প্রবেশে লোকাল মানুষদের জন্য টিকিট খরচ ৩০ টাকা এবং বহিরাগতদের জন্য খরচ ১০০ টাকা।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ :

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ ছবি : আর্কনেট


পুরাতন ঢাকার আতশখানায় অবস্থিত খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ। ১৭০৬ সালে ফরুক সিয়ারের শাসনামলে খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। সমতল ভূমি থেকে অনেক উপরে অবস্থিত মসজিদটি। এখানে নামাজের ঘরটি চতুর্ভুজাকৃতির। মসজিদে তিন্টি গম্বুজ রয়েছে। তন্মধ্যে মাঝখানের গম্বুজটি সবথেকে বড়। মসজিদের কোনায় তৈরি করা মিনারাতগুলো খুব বেশি বড় নয়। এখানের বাগানগুলোতে সারা বছরই বিভিন্ন ফুল চাষ করা হয়।

হাতির ঝিল :

হাতির ঝিল ছবি : মৃণ্ময়

 ঢাকায় বর্তমানের খুব সুন্দর একটি নিদর্শন হাতিরঝিল। এটি ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। ভাওয়াল রাজার আমলে হাতির পাল এখানে এসে গোসল করত। সেই থেকে এর নাম হয়েছে হাতির ঝিল। এ প্রকল্পটির তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১,৯৭১ কোটি টাকা। ৩০২ একর জমির ওপর সম্পূর্ণ হাতিরঝিল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। হাতির ঝিল 'গ্রেট অ্যাওয়ার্ড ২০২০' পুরস্কার প্রাপ্ত হয়েছে। বর্তমানে এর তদারকির করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল অ্যাসোসিয়েশন। বিকেলে এখানে মানুষের আনাগোনা সবথেকে বেশি থাকে। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু স্বস্তি পেতে মানুষজন এখানে আসে। আশেপাশের জায়গাগুলো বেশ চমৎকার। অসংখ্য গাছপালা, ঠান্ডা বাতাস সুন্দর প্রশান্তিময় অনুভূতি মনের মধ্যে তৈরি করে। এছাড়া যখন রোদের আলো পানিতে প্রতিফলিত হয় খুব সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়। এখানে প্রায় দুই হাজার মানুষ একসাথে ভ্রমণ করতে পারেন। এখানে ১২০ মিটার লম্বা রঙিন পানির ফোয়ারা রয়েছে যেগুলো নির্দিষ্ট সময়ে সংগীতের তালে তালে নেচে ওঠে।

রোজ গার্ডেন প্রাসাদ :

রোজ গার্ডেন প্রাসাদ ছবি : বিডি নিউজ ২৪


ঢাকার টিকাটুলিতে অবস্থিত রোজ গার্ডেন ঐতিহাসিক আমলের এক অনন্য নিদর্শন। এটি বিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ। ১৯৭০ সাল থেকে রাজপ্রাসাদটি নাটক-টেলিফিল্ম ও বিভিন্ন শুটিংয়ের করতে অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই প্রাসাদটি নির্মাণের পেছনে একটি বিশেষ ইতিহাস রয়েছে। ঋষিকেশ নামের ধনী একজন ব্যবসায়ী প্রাসাদ নির্মাণ এর কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৩১ সালে। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেননি। শেষ করার আগেই তিনি দেউলিয়া হয়ে যান, যার কারণে পরবর্তীতে তিনি খান বাহাদুর আবদুর রশীদের কাছে এটি বিক্রি করেন। ২২ বিঘা জমির ওপর তৈরি করা হয়েছিল প্রাসাদটি। এর মোট আয়তন ৭ হাজার বর্গফুট। খুব সুন্দর লতাপাতার কারুকাজ রয়েছে এখানে। অনেকটা গ্রিক শৈলী এর আদলে প্রাসাদে তৈরি করা।

বাংলার তাজমহল :

Banglar-Taj-Mahal-Narayanganj ছবি : ভ্রমণ গাইড


পৃথিবীতে আসল তাজমহল একটি, যা ভারতের আগ্রায় অবস্থিত। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসানুল্লাহ মনি ভারতের তাজমহল ভ্রমণের সময় চিন্তা করেছিলেন এদেশের বেশিরভাগ মানুষ হতদরিদ্র। তাদের হয়তোবা সেই সামর্থ্য নেই ভারতের আগ্রার তাজমহল পরিদর্শন করার। কিন্তু এরকম যদি করা যায় ভারতের তাজমহলের আদলেই আরেকটি প্রতিকৃতি তাহলে হতদরিদ্র মানুষ ছাড়াও যাদের সামর্থ্য নেই তারা সাধ্য সীমার মধ্যে সুন্দর তাজমহলটি দেখতে পাবেন। পরে সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে সোনারগাঁয়ে আহসানুল্লাহ মনি তৈরি করেছিলেন বাংলার তাজমহল। ঢাকা থেকে দশ মাইল পূর্বে তাজমহলটি অবস্থিত। পাথর এবং যে সকল জিনিস ব্যবহৃত হয়েছিল সে সবই আসল তাজমহলের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে। তৈরি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উন্নত মেশিন ব্যবহার করায় সময় কম লেগেছে, না হলে প্রায় ২০ বছর সময় লাগতো। সম্পূর্ণ তাজমহল তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

বাইতুর রউফ মসজিদ :

Bait-ur-rauf ছবি : বিপ্রপারটি


ঢাকায় অবস্থিত বিখ্যাত এই মসজিদটি প্রচলিত সব মসজিদ থেকে অনেকটা আলাদা দেখতে। ব্যতিক্রমধর্মী ডিজাইন তৈরি করে এই মসজিদটি আগা খান অ্যাওয়ার্ড জিতেছে। এটি নকশা করেছেন মারিনা তাবাসসুম। ২০১২ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সুফিয়া খাতুন নামে একজন বিধবা মহিলা তার দুই মেয়ের মৃত্যুর পর মসজিদের জন্য নিজস্ব এই জায়গাটি দান করেছেন। তারই নাতনি মারিনা তাবাসসুম পরবর্তীতে মসজিদের ডিজাইন করেন। মসজিদ নির্মাণের বেশিরভাগ খরচে বিভিন্ন ধরনের সংস্থা অনুদান করেছে। মসজিদে নেই কোনো গম্বুজ বা মিনার। শুধু নামাজের জন্যই নয়, এখানে সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে থাকে যা সব মসজিদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এছাড়াও বাচ্চারা মসজিদের ভেতরে খেলাধুলা করতে পারে। মসজিদ নির্মানে প্রায় পাঁচ বছর সময় লেগেছে। এই মসজিদ নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ টাকা।

জাতীয় সংসদ ভবন :

শেরেবাংলা নগর এলাকায় অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি হিসেবে ছিলেন বিখ্যাত নকশাকারক লুই আই কান। জাতীয় সংসদ ভবনের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে এবং শেষ হয় ১৯৮২ সালে। জাতীয় সংসদ ভবনের সাথেই চারটি প্রধান সড়ক রয়েছে। সেগুলো হলো : উত্তর দিকে লেক রোড, দক্ষিণ দিকে মানিক মিয়া এভিনিউ, পূর্ব দিকে রোকেয়া সরনি এবং পশ্চিম দিকে মিরপুর রোড। এতে করে সুবিধা অনুযায়ী যেকোনো সময়ই সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। জাতীয় সংসদ ভবন তিনটি ভাগে বিভক্ত। মেইন প্লাজা, সাউথ প্লাজা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল প্লাজা। এখানে একটি কৃত্রিম রদ ও দুটি বাগান রয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে বিখ্যাত একটি নকশা হিসেবে জাতীয় সংসদ ভবনের স্থাপনাকে উল্লেখ করা হয়। এখানে ভ্রমণ করে আপনি চাইলেই ভিআইপি ক্যাফেটেরিয়াতে দুপুরের খাবার খেতে পারেন। তবে সপ্তাহের শুক্রবার এবং শনিবার এখানে প্রবেশ নিষেধ।