এক নজরে জেনে নিন রাজধানী ঢাকার বিখ্যাত কিছু জায়গা সম্পর্কে
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : সদা প্রাণচঞ্চল একটি শহরে হাজারো নিদর্শনের খোঁজ মিলে
ছবি : বিডি ট্যুর গাইড
ধরুন, আপনি পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম ব্যস্ত একটি নগরীতে ভ্রমণ করার জন্য আসলেন, যেখানে ছুটে চলেছে মানুষের জীবন। কোন কিছুই এক মুহূর্তের জন্য থেমে নেই। আপনি যেখানেই তাকাবেন শুধু দেখবেন প্রাণচঞ্চল জীবন যেন গতি বাড়িয়েই চলেছে। লোকে লোকারণ্য নগরীতে এসে ভাবতে পারেন, এখানে আবার দেখার মত কি থাকতে পারে? কিন্তু যদি বলা হয় এরকম একটি ব্যস্ত শহরে আসলে পর্যটনীয় স্থান দেখে শেষ হবার নয়, তাহলে বিশ্বাস হবে কি? সেই ব্যস্ততম অথচ প্রাণচঞ্চল ও নানা নিদর্শনের পরিপূর্ণ শহর এর নাম ঢাকা।
পানি ছাড়া যেমন জীবন অচল, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা পরিপূর্ণভাবে ঘুরে না দেখাও যেন পর্যটক হিসেবে অসমাপ্ত কাজ হয়ে যাবে।
ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। এখানে প্রায় ১৬ লাখ মানুষের বসবাস।
প্রতিদিন বসবাসরত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মানুষ গ্রাম থেকে শহরে ছুটে আসছে জীবিকা নির্বাহের সন্ধানে অথবা অন্যান্য বিভিন্ন কাজে। ঘনবসতিপূর্ণ শহরটিতে ঘুরে দেখার মত জায়গারও অভাব নেই। যারা স্ট্রিট ফটোগ্রাফী ভালোবাসেন তাদের জন্য তো বলা যায় এটি একটি স্বর্গ। কোটি কোটি বিষয় রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এই নগরে আপনার ক্যামেরায় অথবা মুঠোফোনে বন্দী করে রাখার জন্য। আজকে আপনাদের জন্য রয়েছে ঢাকা নিয়ে বিশেষ পর্ব। এছাড়াও চলুন জেনে আসা যাক ঢাকার বিশেষ কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে :
লালবাগ দূর্গ :
ছবি : রনবির
ঐতিহ্যবাহী লালবাগ দূর্গ বাংলায় মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন আমলে তৈরি করা হয়েছিল। এটি ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এটি প্রথমে নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৮ সালে মোহাম্মদ আজম শাহ। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে শায়েস্তা খান ১৬৮০ সালে পুনঃনির্মাণ করেন। লালবাগ দূর্গের পুরো অংশটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। সেগুলো হলো : মসজিদ, পরী বিবির সমাধি এবং দেওয়ান এর জায়গা। পরী বিবির মাজার শায়েস্তা খান তার আদরের মেয়ে পরী বিবির উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিলেন। ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে রাজার এই আদরের মেয়ে অকালে আকস্মিকভাবেই মারা যায়। পরী বিবির মাজারটি খুবই সুন্দর। এখানে মার্বেল পাথর ও কষ্টিপাথরের সুন্দর কারুকাজ রয়েছে। এছাড়া সমস্ত জায়গা জুড়ে সুন্দর অনেক কারুকাজ পাওয়া যায়। প্রতি বছর নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা লালবাগ দূর্গে বেড়াতে আসেন।
শহীদ মিনার:
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বহিঃপ্রাঙ্গণে অবস্থিত শহীদ মিনার হাজার ১৯৫২ সালে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত হয়েছিল। প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে হাজার হাজার মানুষ ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে এখানে ফুল নিবেদন করতে আসেন। তখন শহীদ মিনারটি আরো নতুন ভাবে সেজে ওঠে। শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর নকশা করেন চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমান। এখানে মূলত তিনটি প্রতীক একসাথে রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রতিকটি মস্তক বা মা কে বোঝানো হয়, আর বাকি দুই পাশের প্রতিকৃতিকে সন্তান হিসেবে বোঝানো হয়। এখানে আসলে শ্রদ্ধায় আপনার মন ভরে উঠবে।
ঢাকেশ্বরী মন্দির :
ঢাকেশ্বরী মন্দির। ছবি : আমাদের সময়
ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের দক্ষিনে অবস্থিত ঢাকেরশরী মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি পবিত্র তীর্থস্থান। ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরটি প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো। এটি নির্মাণ করেছিলেন মাঙ্গাত রায় যিনি বল্লাল সেন নামে পরিচিত ছিলেন। উনি ছিলেন আরাকান রাজা স্বধর্মের ছোট ভাই। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির। এখানে প্রতি রবিবার বিশেষ পূজা অর্চনা করা হয়। প্রতি বছর অসংখ্য হিন্দু ভক্ত এখানে আসেন। শুধুমাত্র পূজা-অর্চনা করা ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী এই মন্দির দেখতে অসংখ্য পর্যটক আসেন। মন্দিরের মূলত দুইটি অংশ রয়েছে - পূর্ব এবং পশ্চিম। বাহিরে রয়েছে পূজা মন্ডপ। এখানে অবস্থিত ভবনগুলো উজ্জ্বল হলুদ ও লাল বর্ণের রঙের। খুব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সবকিছু সাজানো থাকে সবসম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় :
ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত ঢাকার শাহবাগ এলাকায়। এটি একটি স্বায়ত্বশাসিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রস্তাবক ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।
এখানে পর্যটকরা আসলে অনেকটাই ভালো অনুভূতি তৈরি করে পারেন মনের মধ্যে। এটি যেন বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাস আঁকড়ে ধরে আছে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন কিংবা জাগরণ সবকিছু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়।
এখানে শাহবাগ মোড় এর অপর নাম প্রজন্ম চত্বর। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে শাহবাগ মোড়ের নিকটে। রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয়। এছাড়াও রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর, চারুকলা ইনস্টিটিউট, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর সমাধি, ছবির হাঁট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা কালী বাড়ি, তিন নেতার মাজার, ঢাকা কার্জন হল, টিএসসি মোড়, হাকিম চত্বর, কাঁটা বাগান, জগন্নাথ হল ইত্যাদ। আপনার সবকিছু একদিনে দেখা সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ!
আহসান মঞ্জিল :
সঠিক সময়ে রক্ষা না করা হলে হয়তো আহসান মঞ্জিল কালের গর্ভে হারিয়ে যেতো আহসান মঞ্জিল। ছবি : কালের কন্ঠ
পুরান ঢাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিল বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত নিদর্শন। ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে আহসান মঞ্জিল অবস্থিত। এটি পূর্বকালে ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ ও কাচারি হিসেবে ব্যবহৃত হত। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নবাব আব্দুল গনি। তার ছেলে খাজা আহসানউল্লাহর নাম অনুসারে প্রাসাদটির নাম দেন আহসান মঞ্জিল। আহসান মঞ্জিলের জাদুঘরে অনেক গ্যালারি রয়েছে। এখানে রয়েছে নওয়াবদের ভোজন কক্ষ, বড় বড় আলমারি, আয়না, চিনামাটির তৈরি জিনিস যার সবকিছুই নবাবদের ব্যবহৃত ছিল। নিচতলা থেকে নির্মিত একটি উচ্চতর গম্বুজ রয়েছে যা মূলত বাহিরে দৃশ্যমান। এছাড়াও রয়েছে তরবারী, হাতির কঙ্কাল, কাঠের বেড়া।
এখানে একটি কাঠের সিঁড়ি রয়েছে যাকে বলা হয় প্রধান সিঁড়ি। বহু বছরের পুরনো হওয়ার কারণে প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ১৯০৪ সালের গৃহীত আলোকচিত্র অনুযায়ী কাঠের সিঁড়ি পুনরায় সংস্করণ করা হয়েছে। আহসান মঞ্জিল এর নিকট রয়েছে আহসানুল্লাহ মেমোরিয়াল হাসপাতাল,মুসলিম লীগ কক্ষ এবং বিভিন্ন প্রতিকৃতি।