দানি উপজাতি : সভ্যতা থেকে জনবিচ্ছিন্ন সবচেয়ে আদিম জাতি

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দানি উপজাতি


দানি উপজাতি, পুরুষ

দানি পুরুষ। ছবি : নিউ ইয়র্ক টাইমস


 পুরো বিশ্ব যখন বিজ্ঞানের আলোয় প্রতিনিয়ত নিজেদের আলোকিত, উন্নত করে চলেছে; সেসময় একবিংশ শতাব্দীর ছায়াটুকুও পড়েনি, সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক উপজাতির গল্প বলা হবে আজ। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন আদিম এই উপজাতিটি হলো দানি উপজাতি। ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম পাপুয়ার ওগি গ্রামে বসবাস এই উপজাতির। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবিচ্ছিন্ন আদিম এই উপজাতির কাছে তাদের গ্রামটিই যেন তাদের পুরো বিশ্ব। পৃথিবী থেকে জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাদের নিজস্ব নিয়ম-রীতি রয়েছে যা অন্যদের তাদের সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলেছে। মার্কিন ফিলান্থ্রপিস্ট রিচার্ড আর্চবোল্ড ১৯৩৮ সালে তার এক অভিযানের মাধ্যমে এই উপজাতির সন্ধান পান। তাদের ভিন্নধর্মী সংস্কৃতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি একাগ্রতার কারণে বিশ শতাব্দীর মধ্যেই দানি উপজাতি সম্পর্কে বিশ্বের জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে। তাদের সংস্কৃতি, জীবনাচরণ ইত্যাদি হয়ে ওঠে আগ্রহের মূল কেন্দ্র। এই আদিবাসির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের পোশাক। নারী-পুরুষ উভয়েরই বক্ষ থাকে উন্মুক্ত। নারীরা তাদের কোমরে ঘাসের তৈরি একধরনের স্কার্ট পরে থাকে। অন্যদিকে পুরুষেরা তাদের যৌনাঙ্গ ঢাকতে একটি বিশেষ পোশাক পরে থাকে। এটিকে বলা হয় 'কোটেকা'।


ঘাসের তৈরি স্কার্ট পরিহিত নারীরা

ঘাসের তৈরি স্কার্ট পরিহিত নারীরা। ছবি : দা সান


পোশাক নিয়ে তাদের এমন উচ্চ দৃষ্টিভঙ্গির মতোই নিজেদের অঙ্গবিচ্ছেদের জন্যও তারা বেশ আগ্রহের বিষয়। পরিবারের কারও মৃত্যু হলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তারা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে ফেলেন। প্রিয়জনের হারানোর শোককে ফুটিয়ে তুলতে ও তাদের প্রতি সম্মান জানাতে এই প্রথা পালন করা হয়। তবে, এই প্রথায় আঙ্গুল শুধু নারীরাই হারায়। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। ফলে একদিকে যেমন বর্বর এই নিয়ম, একইসাথে বৈষম্যমূলক অবস্থার পরিচয় দেয়। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ান সরকার এই প্রথা বন্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তবে দানি উপজাতির বৃদ্ধাদের মাঝে এখনও এই প্রথা পালনের রীতি রয়েছে।

দানি উপজাতি-র উৎসব

প্রতিবছর সাধারণত আগস্ট মাসের দিকে তারা উৎসব পালন করে। এতে তারা অন্যান্য এলাকার উপজাতির সাথে ছদ্মযুদ্ধের আয়োজন করে থাকে। পর্যটকদের জন্য নয়, নিজস্ব ঐতিহ্যের পালনের জন্যই এই উৎসব পালন করা হয়। ছদ্ম-উৎসবটির নাম 'ব্যালিয়াম ভ্যালী ফেস্টিভ্যাল'। উৎসবে দানিদের পাশাপাশি  ইয়ালি, লানিরা তাদের সবচেয়ে ভালো যোদ্ধাদের নিয়ে আসে এবং তাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সকলের সামনে তুলে ধরেন।


হাতের আঙ্গুল কেটে ফেলা দানি নারী

হাতের আঙ্গুল কেটে ফেলা দানি নারী। ছবি : গেটি ইমেজ


 যদিও যোদ্ধা হিসেবে দানিদের বেশ সম্মান রয়েছে তবে অতিথিপরায়ণ হিসেবেও তাদের সুনাম রয়েছে। তাদের আচরণ বা বেশভুষা দেখতে ভীতিকর মনে হলেও তারা বেশ ভালো ব্যবহার করে থাকে অতিথিদের সাথে। ভাষাবিদেরা দানিদের অন্তত চারধরণের ভাষার সন্ধান পেয়েছে। মিষ্টি আলু তাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় খাবার। তাছাড়া বিভিন্ন উৎসবে শুকরের মাংস খাওয়া হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি শুকর যিনি শিকার করতে পারেন তাকে বেশ প্রভাবশালী মনে করা হয়ে থাকে। মাটির ভেতর খাবার রেখে তারপর আগুন জ্বালিয়ে তারা রান্না করে থাকে।


দানি উপজাতির যোদ্ধারা

দানি যোদ্ধারা। ছবি : টুইটার


 বর্তমানে পর্যটকদের আগমনের কারণে আধুনিক  সভ্যতার সাথে তাদের কিছুটা পরিচিতি হচ্ছে, যার ফলে তাদের কার্যকলাপে পরিবর্তন এসেছে। তবে আধুনিক সভ্যতার ছোয়া লাগলেও তারা আজও নিজস্ব ঐতিহ্য বজায় রেখেছে, যা তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ব্যাখ্যা করে। 

পড়ুনঃ মাস্ক ডান্সের জন্য আফ্রিকার যে জাতি সারাবিশ্বে বিখ্যাত  

ইন্দিরা বিশ্বাস  এস এম