দিবর দীঘির ঐতিহাসিক দিব্যক জয়স্তম্ভ বা দিবর স্তম্ভ, নাটোর

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : দিবর স্তম্ভ


দীঘির মধ্যস্থলে এই স্তম্ভটি গ্রানাইট পাথরের নির্মিত

প্রাচীন দিব্যক জয়স্তম্ভ বা দিবর স্তম্ভ, নাটোর

ছবি : সংগৃহীত


নওগাঁ অঞ্চল বাংলার প্রাচীন তম এক জনপদের ইতিহাসের উপর দাঁড়িয়ে। এই জেলার আদিবাসীরা ছিলও প্রাচীন পুণ্ড্র জাতির বংশধর। আত্রাই নদী তীরবর্তী নদী বন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে সে সময় ছোট ছোট যেসব বসতি গড়ে ওঠে, কালের পরিক্রমায় ছোট ছোট বসতি থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে থানা, মহকুমা, শহর এবং শহর থেকে বর্তমান জেলায় রূপান্তরিত হয় নওগাঁ। বৃহত্তর বরেন্দ্র ভূমির এই অংশটি ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্বকীয়তা ও সৌকর্যে তাৎপর্যপূর্ণ। নানান ঐতিহাসিক ও পুরাতাত্ত্বিক স্থাপনা ছড়িয়ে আছে এই অঞ্চলে যা পর্যটকদের আকর্ষণ ও উৎসাহ যোগায় নিয়মিত। এই অঞ্চলের তেমনই একটি পুরাকীর্তি নিদর্শন দিবর স্তম্ভ (Dibor Stombho)।

দিবর স্তম্ভ নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানার দিবর দীঘি বা কর্মকারের জলাশয় এর মধ্যস্থলে অবস্থিত। দীঘিটি পাল আমলে খননকৃত। ঐতিহাসিক এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দিব্যক জয়স্তম্ভ নামেও পরিচিত। ৪০/৫০ বিঘা বিশাল জমির ওপর অবস্থিত দিবর দীঘির মধ্যস্থলে এই স্তম্ভটি গ্রানাইট পাথরের নির্মিত। পানির নিচে এবং উপরে মিলিয়ে স্তম্ভটির সর্বমোট উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। এ স্তম্ভের ব্যাস ৭৩ সেন্টিমিটার বা ২৯ ইঞ্চি এবং প্রতিটি কোনের পরিধি ১ ফুট ৩ দশমিক ৫ ইঞ্চি। পাল বংশকে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের স্মৃতি স্বরূপ রাজা দিব্যক এই ঐতিহাসিক স্তম্ভটি নির্মাণ করেন। দ্বিতীয় মহিপালের সময় যে তিনজন রাজা বাংলা শাসন করতেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলও দিব্যক।

এর বিজ্ঞান ভিত্তিক স্থাপত্য ধরণ একে এতো বছর পরেও টিকিয়ে রেখেছে। আটকোণ বিশিষ্ট এই স্তম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা মিনারের মতো গোল অলংকরণ-কৃত। ঊর্ধ্বাংশে পর পর ৩টি বলয়াকারের স্ফীত রেখার অলঙ্করণ, তার উপরে আমলকের অলঙ্করণ এবং শীর্ষদেশে আছে উষ্ণীষ জাতীয় অলঙ্করণ। এইসব অলঙ্করণ একে নান্দনিক এক স্মৃতি স্তম্ভের রূপ দিয়েছে যেমন টা বাংলাদেশে এ তেমন দেখা যাইয় না। দিবর স্তম্ভ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে ইতিহাসবিদদের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। মত গুলো নিম্নরূপ



প্রথমত,

পাল বংশের রাজা দ্বিতীয় মহিপালকে পরাজিত করার পর সাফল্যের চিহ্নস্বরূপ দিব্যক এই স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণ করেন। দীনেশ চন্দ্র সেন তাঁর 'বৃহতৎ বঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন–
'কৈবর্তরাজ ভীমের খুল্ল পিতামহ দিব্বোক দ্বিতীয় মহিপাল কে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া বিজয়োল্লাসে যে স্তম্ভ উত্থাপিত করিয়াছিলেন তাহা এখনও রাজশাহী জেলার এক দিঘীর উপরে মস্তক উত্তোলন করিয়া বিদ্যমান'। (পূর্বে নওগাঁ রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।)


দ্বিতীয়ত,

পাল বংশের যুবরাজ রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করে যখন তখন দিব্যক ছিলও এই অঞ্চলের রাজা। রামপাল সেই যুদ্ধে দিব্যক এর নিকট পরাজিত হন। সেই বিজয়ের স্মৃতি স্বরূপ এই দিব্যক স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এই সম্পর্কে সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতের পরিচিতি পর্বে অনুবাদক বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের করন সম্পর্কে নিম্নলিখিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন :
'পূর্ববঙ্গের ভোজ বর্মার তাম্রশাসন হইতে জানা যায় দিব্যের বীরত্ব খ্যাতি তৎকালে উপমার বিষয় ছিল। অত্যল্পকালই বরেন্দ্রী দিব্যের রক্ষণাধীন থাকে। পূর্বোদ্ধৃত মনহলি লিপির ১৪শ শ্লোক ও রামচিরতের ১/২৯ শ্লোক একত্রে পাঠ করিলে জানা যায় দিব্যের রাজত্বকালে রামপাল (১০৮২ - ১১২৪) একবার পিতৃরাজ্য উদ্ধারে সচেষ্ট হইয়া ব্যর্থকাম হন। দিনাজপুর জেলার ( বর্তমানে নওগাঁ) দিবর দিঘী নামক জলাশয় ও তন্মধ্যস্থিত শিলা-স্তম্ভ আজও তাহার স্মৃতি রক্ষা করিতেছে'।


তৃতীয়ত,

অন্য দুটি মতের চাইতে এই মতটি কিছুটা ভিন্ন। এই মতে পাওয়া যায় ভীম এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেন এবং পিতৃব্য স্মৃতি রক্ষার্থে স্তম্ভটি দিব্যকের নামে উৎসর্গ করেন। অধ্যাপক শিরিন আখতারের বিবরণে তার সমর্থণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ইতিহাসবিদদের এই তিনটি মতবাদই দিব্যক স্তম্ভের সাথে দিব্যকের স্মৃতির সপক্ষেই বর্ণনা দেয়।

যেভাবে যাবেন :

নওগাঁ জেলা সদরের বালুডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে সাপাহারের বাসে চড়তে হবে। জেলা সদর থেকে দিবর দিঘির কিলোমিটার দূরত্ব যেতে সময় লাগবে আনুমানিক দুই ঘণ্টা। বাসে করে দিবর মোড়ে নেমে ভ্যান বা অটোরিকশায় দিবর দীঘি।  


সাখাওয়াত হোসেন   এস এম