দেশে দেশে ঈদের যত রঙ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: দেশে দেশে ঈদের যত রঙ


ঈদ উৎসব

ঈদ উৎসবে মেতে থাকা মিশর। ছবি : এপি


একমাসের সিয়াম সাধনার পর শাওয়াল মাসের একটি চিকন চাঁদ এবং ঈদের দিন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় উৎসবের একটি হিসেবে ধরা দেয়। এই বছরের ঈদ আমাদের কাছে আলাদা, করোনা ভাইরাসের মারাত্মক আঘাতে বিশ্ববাসী একরকম গৃহবন্দিদশা কাটাচ্ছে। তাই এবারের ঈদে স্বাভাবিক আমেজ মিলবে না। এই সংকট কেটে গেলে আগামী ঈদে আবার সবার মধ্য উৎসবের চলে আসেব। সারাবিশ্বেই ঈদের নামায, মিষ্টান্ন, কুশল বিনিময় কিংবা আনন্দের রেওয়াজ থাকলেও তার রঙ বিভিন্ন দেশেভেদে আলাদা আলাদা হয় থাকে। এবারের গৃহবন্দী ঈদে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের পরিচয় হোক সেসব ভিন্ন ঈদ আয়োজনের সাথে।

ঈদ উৎসব

সৌদি শিশুদের ঈদ। ছবি : রয়টার্স



সৌদি আরব

সুন্নি মুসলমানদের দেশ সৌদি আরবের জাতীয় উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। তিন দিন সরকারি ছুটি থাকে। বাংলাদেশের ঈদ উৎসবের সাথে সৌদি আরবের বেশ ভাল মিল রয়েছে। তাদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পুরুষরা তাদের ছেলে মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে বাবার বাসায় ঈদ পালন করে। ঈদ উপলক্ষে খাবার ও উপহার দেওয়া হয়। গরিবদের খাবার বিতরণ করা হয়। ঘরে ঘরে থাকে মিষ্টিজাতীয় খাবারের আয়োজন। এছাড়া ঘরের বাইরে পথে প্রান্তরে এবং পার্কে দেখা যায় বাচ্চাদের আনন্দমুখর মুখ।


ইন্দোনেশিয়ায়

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ। ছবি : এপি



ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদুল ফিতরকে 'লেবারান' বলা হয়। রমজানের শেষ দিনে সন্ধ্যা হতে না হতেই ঢোল বাজানো, নাচ, গান, নামাজ আর বয়ানের ভেতর দিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ উৎসব শুরু হয়ে যায়। এদিনে নারকেল পাতার ভেতর ভাপে দেওয়া চালের গুঁড়ার পিঠা 'কেতুপাত' বানানো হয়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। ইন্দোনেশিয়ার ঈদ উদযাপনের বিশেষ দিক, এসময় ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকগণ তাদের আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া প্রতিবেশীর কাছে বিগত বছরের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান। অনেক সময় এ ক্ষমার আবেদনসহ ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ানোর পালা শেষ হতে কয়েক দিন লেগে যায়।

মায়ের সাথে সন্তানের ঈদ পালন, ইন্দোনেশিয়া

মায়ের সাথে সন্তানের ঈদ পালন, ইন্দোনেশিয়া। ছবি : এএফপি


মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ঈদের দিন স্বাভাবিকভাবেই সরকারি ছুটি থাকে। সুন্নাত নিয়ম অনুযায়ী পরিধান করা হয় নতুন কাপড়। ঈদের দিন মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি করা হয়। ছোটদের খামে করে ঈদের সালামি দেয়ার চলও আছে এই দেশে। ঈদের দিন মহিলারা ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'কেবায়াকুরঙ্গ' পরিধান করে। ঈদের দিন তারা সমাধিস্থলে যায়। সেখানে কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও মোনাজাত করে। এছাড়া কোরআনের একটি অধ্যায় থেকে বিশেষ আলোচনা হয়। যার নাম 'হালাল বি হালাল'ত।

কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা

কাতারে ঈদের নামাজ আদায় করছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। ছবি : পিন্টারেস্ট



কাতার

আরব বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ কাতারে ঈদ শুরুই হয় বিচিত্র উপায়ে। তোপধ্বনি দিয়ে ঘোষণা করা হয় ঈদের চাঁদ দেখা গিয়েছে। এদিনে কাতারের নারীরা নতুন জুতা আর প্রায়ই সোনালি বা রুপালি সুতোয় নকশা করা কাফতান পরে থাকেন। ঈদের দিন সকালে সুন্নত মেনে তৈরি করা হয় বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় খাবার। তবে সিদ্ধ ডিম আর মিষ্টি নুডলসে কাতারের বিখ্যাত রান্নাটি সব খাবারের মাঝে আলাদা আকর্ষণ। ঈদের নামাজ শেষে আগত মেহমানদের দারুচিনি দেওয়া কফি, গোলাপজলের সুবাসযুক্ত চা, বাকলাভা, ফল আর অন্যান্য মিষ্টি পরিবেশন করা হয়। দুপুরের খাবারে ভাত ও ভেড়ার গোসত থাকে। রাজধানী দোহার বিভিন্ন স্থানে প্রতিকী তলোয়ার যুদ্ধ ও ঢোল বাজানোর মাধ্যমে বিনোদন কার্যক্রম চালায় কাতারের মুসলিমরা।


মিশরে ঈদ পালন

মিশরে ঈদ উৎসব। ছবি : আল-জাজিরা



মিশর

ইসলামি রীতিনীতির সবচে বড় উৎসব সম্ভবত মিশরের বুকেই হয়। নীলনদের তীরবর্তী এই দেশে রমযান মাস থেকে শুরু হয় আনন্দের বন্যা। মিশরে ঈদ উল ফিতর আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিনের একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এসময় স্কুল-কলেজ, ইউনিভার্সিটি, সরকারি অফিস এমনকি কিছু কিছু দোকান, রেস্টুরেন্টও বন্ধ থাকে। সামান্য নাস্তা করে এবং সবাই একত্রিত হয়ে সম্মিলিত ঈদের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হয়। মিশরে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে পার্ক, সিনেমা, থিয়েটার কিংবা সমুদ্রতটে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে অধিকাংশ মিসরীয়। বিশেষ করে, বিখ্যাত অবকাশযাপন কেন্দ্র ‘শারম আল শেখ’-এ উপচেপড়া ভিড় দেখা যায় ঈদের দিনে। ঈদের দিনটিতে মিসরে বিশেষ খাবারের আইটেমে চিনি ও বাদামের ব্যবহার বেশি লক্ষ করা যায়।

মিশরে ঈদ পালন

মিশরে ঈদ পালন। ছবি : গেটি ইমেজ


খাবার হিসেবে মিশরে 'কাহক' নামে এক ধরনের বিশেষ পিঠা বেশ জনপ্রিয়। সেই দশম শতাব্দীতে মিসর রাজপ্রাসাদ থেকে আবির্ভাব হয়েছে এই বিশেষ পিঠার, যার ভেতর খেজুরভর্তা, বাদাম বা টার্কিশ ডিলাইটের পুর দেওয়া হয়। এছাড়া মিশরের ভুবন ভুলানো মিষ্টিজাতীয় পদ 'কাতায়েফ' তো আছেই।

তুরস্ক

ইসলামী ভাবধারার উৎসবের কথা আনা হবে আর অটোমান সম্রাজ্যের উৎপত্তিস্থল তুরস্কের নাম বাদ যাবে, এ যেন অকল্পনীয়! ইউরোপের মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে ঈদুল ফিতরকে বলা হয় 'সেকার বাইরাম'। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় চিনি উৎসব। এবং দিনটি ঠিক কিভাবে উদযাপিত হয় তা এই নাম থেকেই সহজে অনুমেয়। এই দিনটিকে সামনে রেখে তুর্কি নারীরা মিষ্টিজাতীয় খাবার যেমন ক্যান্ডি, পুডিং, কেক ও বাকালাভা নামের পেস্ট্রি প্রস্তুত করে।


ঈদ উৎসব

ইস্তানবুলে নারীরা ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা। ছবি : এএফপি


ঐতিহ্যগতভাবে এ দিনটিতে ইস্তানবুল শহরের 'বুমস্ক'সহ অন্যান্য মসজিদে বিশেষ আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। ঈদের দিন তুরস্কে বয়স্কদের শ্রদ্ধা জানানোর ব্যাপারটি আমাদের দেশের কদমবুসি থেকে একেবারেই আলাদা। তারা সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তির ডান হাতে চুমু খেয়ে তা কপালে ঠেকিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। দিনটি পালনের জন্য দেশজুড়ে কনসার্ট, নাটক এবং কিছু কিছু স্থানে দেশটির নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

মালয়েশিয়া

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়ায় ঈদুল ফিতর বড় করে উদযাপিত হয়। সবাই নিজ নিজ পরিবারের সঙ্গে ঈদ পালন করে। দেশটিতে অবশ্য ঈদের আগের দিন থেকেই উৎসব পালিত হয়। ঈদের আগের রাতকে মালেশিয়ান ভাষায় তাকবিরান বলা হয়। মসজিদ ও রাস্তায় তাকবির ধ্বনি উচ্চারিত হয়। রাস্তাঘাটে মশাল, আতশবাজি পোড়ানো হয়।

ঈদ উৎসব

মালয়েশিয়ায় ঈদ। ছবি : সংগৃহীত


ঘরে ঘরে তৈরি হতে থাকে তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার রেন্দাং, কেতুপাট, লেমাং। শহরে ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণে খাবার রান্না করে প্রতিবেশী তো বটেই, অমুসলিমদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়। খাওয়ার পর গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সন্ধ্যার আকাশে থাকে আতশবাজির উৎসব।

ফিলিপাইন

একমাত্র খ্রিস্টপ্রধান দেশ যেখানে ঈদের সরকারি ছুটি থাকে সেটি ফিলিপাইন। সরকার কর্তৃক প্রজাতন্ত্র আইনের ৯১৭৭ ধারা অনুসারে এ দিনটিকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০২ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি একই নির্দেশ জারি করে ১০৮৩ ধারাতে, যা পৃথিবীর একমাত্র খ্রিস্টান দেশে এটি চালু করা হয়।

ঈদ উৎসব

ফিলিপিনে ঈদ উৎসব। ছবি : আল-জাজিরা


এই আইনের মাধ্যমে ফিলিপিনো মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে অন্য প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি, ঐক্য ও শান্তি সৃষ্টি হয়। ২০০২ সালের ৬ ডিসেম্বর ফিলিপাইনে প্রথম জাতীয়ভাবে মুসলিম সম্প্রদায় নামাজ আদায়ের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন করে। অধিকাংশ ফিলিপিনো মুসলিম কুরিনো গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড এবং ম্যানিলা মসজিদে ঈদ পালন করে। উপমহাদেশের সব দেশেই ঈদ উৎসবের রঙটা বলতে গেলে প্রায় একইরকম। আবার পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা কম থাকায় সেখানে উৎসব হয় সীমিত আকারে। তবে এরমাঝে সবচে বড় উৎসব হয় সিডনিতে। এখানে প্রবাসী মুসলিমদের ঈদ দেখতে জড় হন অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ খিস্টানরাও। মুসলিম সমাজও তাদের বরণ করে নেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে।  


জুবায়ের আহম্মেদ   এস এম