নান্দনিক স্থাপত্য ও নকশার বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৩ মসজিদ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ঐতিহাসিক মসজিদ



ষাট গম্বুজ মসজিদ।

ষাট গম্বুজ মসজিদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


 প্রাকৃতিক সম্পদের দেশ বাংলাদেশ, এই দেশটির সংস্কৃতি মিশে আছে প্রতিটি মানুষের রন্দ্রে। এই দেশের ইতিহাসের সন্ধান মেলে স্থাপত্যে। ঐতিহাসিক সব স্থাপনায় মিশে আছে অতীতের ইতিহাস। এই অঞ্চল একেক সময় একেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শাসনে ছিল। সর্বশেষ মুসলিম শাসন। তুর্কি, পার্সি, তুঘলকিসহ নানান অঞ্চল থেকে মুসলিমরা ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আসে, পরে এখানে গড়ে তোলে তাদের সাম্রাজ্য। তাই বাংলা সংস্কৃতির সাথে এই ধর্ম প্রচারকদের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আর আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী যেসব স্থাপনা আছে তার সিংহভাগ হচ্ছে মসজিদ। মুসলিম শাসনামলে ধর্ম প্রচারকেরা বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তোলে সব নান্দনিক নকশার ঐতিহাসিক মসজিদ। আর এভাবেই আমাদের ইতিহাসের সাথে এই মসজিদগুলো মিশে আছে। দেশের এসব ঐতিহাসিক মসজিদগুলো এখনও আমাদের ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় অনেক মসজিদ রক্ষিত হয়ে আসলেও কিছু ইতিহাস অযত্নে কালের গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। তবে ট্রাভেল বাংলাদেশের পাঠকদের আজ জানানো হবে দেশের ঐতিহাসিক ৩ মসজিদের কথা।

ঐতিহাসিক মসজিদ-ষাটগম্বুজ মসজিদ

ঐতিহাসিক মসজিদ বলতে আমাদের চোখে প্রথমেই যে মসজিদটির ছবি ভেসে আসে তা হচ্ছে অতুলনীয় নকশার ষাটগম্বু মসজিদ। তাতে প্রচলিত অর্থে কোনো ছাদ নেই। সাধারণত সমান বা ঢালু যে ছাদ দেখা যায় তা এখানে অনুপস্থিত। অর্ধ-ডিম্বাকার ও আয়তাকার গম্বুজগুলোই ছাদ। এ জন্যই একে ‘ছাদগম্বুজ’ মসজিদ বলা হতো। সময়ের পরিক্রমায় রূপান্তরিত হয়ে তা হয়ে গেছে ‘ষাটগম্বুজ’। আসলে এই মসজিদে গম্বুজ আছে ৮১টি। জেলাশহর বাগেরহাট থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খুলনা-বাগেরহাট মহাসড়কের উত্তর পাশে সুন্দরঘোনা গ্রামে ষাটগম্বুজ মসজিদের অবস্থান। সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদ বাগেরহাট শহরের অন্যতম আকর্ষণ। ষাটগম্বুজ ছাড়াও অসংখ্য মসজিদ, দিঘি ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন হজরত খানজাহান (রহ.)।


খানজাহান আলির ষাট গম্বুজ মসজিদ

খানজাহান আলির ষাট গম্বুজ মসজিদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


ঐতিহাসিকদের মতে, বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন খলিফাতাবাদ নগরই আজকের বাগেরহাট। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন হারিয়ে যাওয়া বিশ্বের যে ১৫টি শহরের তালিকা করেছে, তাতে রয়েছে এই শহরের নাম। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো ১৯৮৫ সালে ঐতিহাসিক মসজিদের শহর (Historic mosque city of Bagerhat) হিসেবে ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খানজাহানের স্থাপত্যগুলোকে তালিকাভুক্ত করে।

অভ্যন্তর

মসজিদে সাত সারির ২১টি কাতারে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নারীদের নামাজের জন্য রয়েছে আলাদা স্থান। এই তথ্যই মসজিদটির বিশালতা প্রমাণ করে। অথচ এত বড় মসজিদে আলো-বাতাসের কোনো অভাব নেই; অনন্য নকশার কারণে কৃত্রিম আলো-বাতাসের দরকার পড়ে না বললেই চলে। দৈর্ঘ্যে ১৬৮ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুটের এই মসজিদের দেয়ালগুলো পুরু ৮ ফুট করে। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ছয়টি করে ছোট ও একটি করে বড় খিলান। পূর্ব পাশে একটি বড় ও তার দুই পাশে পাঁচটি করে ছোট খিলান।

ষাটগম্বুজ মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলারই পাথরের তৈরি। পুরো মসজিদ তৈরির মূল উপাদান চুন, সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইট। এই মসজিদের স্থাপত্যকলার সঙ্গে মধ্য এশিয়ার তুঘলক (তুরস্ক) স্থাপত্যশৈলীর বিশেষ মিল রয়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ও গবেষক গোলাম ফেরদৌস বলেন, খানজাহান (রহ.) কবে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তার সঠিক কোনো সন-তারিখ উল্লেখ নেই। তবে এই পুরাকীর্তিটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে।

ইতিহাস

প্রায় ৬শ’ বছরের পুরোনো ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খলিফাতাবাদ নগরের পুরাকীর্তিগুলো ১৯০৪ সালে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় ব্রিটিশ সরকার। এরপর ১৯১৩ সালে ষাটগম্বুজ মসজিদকে ‘ক্যালকাটা গেজেট’ভুক্ত করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ষাটগম্বুজ মসজিদের প্রথম সংস্কারকাজ হয় ১৯২৩ সালে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে দক্ষিণ এশীয় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ষাটগম্বুজ মসজিদটির সংস্কারকাজ হয়েছে।


খানজাহান আলির ষাট গম্বুজ মসজিদ এর ভিতরের দৃশ্য

ছবি : উইকিপিডিয়া

 যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে বাগেরহাটে বাসে যাওয়ার দুইটি ভিন্ন রুট রয়েছে। একটি হচ্ছে ঢাকার গাবতলি হয়ে আরিচা ফেরি পারাপার হয়ে খুলনা-বাগেরহাট। আর অন্যটি গুলিস্তান/সায়েদাবাদ হয়ে মাওয়া ফেরি/লঞ্চ পারাপার হয়ে বাগেরহাট। গুলিস্তান থেকে ছাড়ে দোলা পরিবহন। মাওয়া হয়ে সরাসরি বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ড। ভাড়া ৩৫০-৪০০ টাকা মত। সায়েদাবাদ থেকে ছাড়ে ফাল্গুনী পরিবহন। ভাড়া ৪০০ টাকার মত। গাবতলি থেকে ছাড়ে সাকুরা পরিবহন ও দিগন্ত পরিবহন। ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা।


ঐতিহাসিক মসজিদ-বাঘা মসজিদ

দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অন্যতম নিদর্শন রাজশাহীর বাঘা শাহী মসজিদ। রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। প্রায় ৫শত বছরের পুরনো সুলতানি আমলের এই নিদর্শনটি দেশের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।


ইতিহাস

মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরাত শাহ নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেয়া হয় ১৮৯৭ সালে। নিচের স্তম্ভ থেকে সোজা চোখ চলে যায় চৌচালা গম্বুজের দিকে। অপরূপ কারুকাজ, টেরাকোটার নকশা। বাংলাদেশের ৫০ টাকার নোট আর ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে দেখা যায় প্রাচীন স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন শাহি মসজিদ।


বাঘা মসজিদ

বাঘা শাহী মসজিদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


মসজিদটি দেখতে যেতে হয় রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে বাঘা উপজেলা সদরে। প্রায় পাঁচ শ বছরেও ধুলা-ময়লায় ম্লান হয়নি এর অনুপম স্থাপত্যশৈলী। ১৫২৩-২৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান বাংলার স্বাধীন সুলতান নুসরত শাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন। সামনে খনন করেছিলেন বিশাল এক দিঘি। স্থাপত্যশৈলীর আকর্ষণে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকেরা প্রতিনিয়ত ছুটে আসেন বাঘায়।

অভ্যন্তর

সমতল থেকে ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু একটি বেদির ওপরে এই মসজিদ। আঙিনা ঘিরে রয়েছে সীমানাপ্রাচীর। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। দুপাশেই রয়েছে বিশাল দুটি ফটক। দক্ষিণ পাশের ফটকটি এখনো রয়েছে। সেখানেও কারুকাজ। তবে উত্তর পাশেরটির অবস্থা আর আগের মতো নেই। বাঘা বাজারের ভেতর দিয়ে চলে গেছে আন্তজেলা সড়ক। সেখান থেকে উত্তর দিকে মুখ ফেরালেই মসজিদের ১০টি গম্বুজের কয়েকটি দৃশ্যমান হয়। এরপর প্রধান ফটক থেকে এর নির্মাণশৈলী দর্শনার্থীদের টেনে নিয়ে যায় মসজিদের ভেতরে।

দশ গম্বুজের এই মসজিদে রয়েছে পাঁচটি দরজা। মাঝখানের দরজার ওপরে ফারসি হরফে লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে। চার কোনায় রয়েছে চারটি চৌচালা গম্বুজ, ভেতরে ছয়টি স্তম্ভ, চারটি অপূর্ব কারুকার্যখচিত মেহরাব। এর নকশায় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী আম, গোলাপ ফুলসহ নানা রকম নকশা। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়াল চওড়ায় ৮ ফুট। গম্বুজের ব্যাস ২৪ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। সবখানেই টেরাকোটার নকশা। কিছু কিছু জায়গায় নোনা ধরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অনুরূপ নকশা প্রতিস্থাপন করেছে। সিরাজগঞ্জের টেরাকোটাশিল্পী মদন পাল কাজটি করেছিলেন। যাঁরা আগের নকশা দেখেননি, মদন পালের নকশার সঙ্গে আগের নকশার পার্থক্য তাঁরা বুঝতে পারবেন না।

দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাঘার বিশিষ্ট সমাজসেবী আইনজীবী আবদুল হান্নান। তিনিই জানান, ১৮৯৭ সালের এক ভূমিকম্পে স্থানীয় অন্যান্য ঐতিহাসিক ইমারতের সঙ্গে বাঘা শাহি মসজিদটিরও ক্ষতি হয়। ভেঙে পড়ে ওপরের ১০টি গম্বুজ। তারপর থেকে দীর্ঘদিন মসজিদের ভেতরটা পরিত্যক্ত ছিল। একসময় ভেতরে টিনের ছাপরা তৈরি করে নামাজ চলত। পরে সেগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে গম্বুজগুলো পুনর্নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালের ৩১ আগস্ট থেকে কাজ শুরু হয়, চলে ১৯৭৭ সালের জুলাই পর্যন্ত।


বাঘা শাহী মসজিদ

বাঘা শাহী মসজিদ। ছবি : উইকিপিডিয়া


 এই মসজিদ ঘিরে প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির ওপর সুবিশাল দিঘি, আউলিয়াদের মাজার, মূল দরগাহ শরিফ ও জাদুঘর। সবই দর্শনীয়। শীতে সাইবেরিয়া থেকে অসংখ্য অতিথি পাখি আসে এখানে। দিঘির পাড়ে তখন এসে ভিড় করেন বহু দর্শনার্থী।

যেভাবে যাবেন :

ঢাকা থেকে রাজশাহী- ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশ পথে রাজশাহী যাওয়া যায়। সড়কপথে ঢাকার গাবতলি ও কল্যাণপুর থেকে বাসে উঠতে হবে। এজন্য গ্রিন লাইন, দেশ ট্রাভেলস, শ্যামলী ও হানিফসহ বেশ কয়েকটি বাস সার্ভিস রয়েছে। শ্রেণিভেদে ভাড়া পড়বে ৪শত থেকে ১ হাজার টাকা। রেলপথে যাওয়ার জন্য রয়েছে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ও পদ্মা এক্সপ্রেস নামে দুটি ট্রেন। রোববার ব্যতীত প্রতিদিন দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে সিল্কসিটি এক্সপ্রেস এবং মঙ্গলবার ব্যতীত প্রতিদিন রাত ১১টা ১০ মিনিটে কমলাপুর থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

ভাড়া শ্রেণিভেদে ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৮১ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া আকাশ পথে ঢাকার শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারের বিমানে রাজশাহী যাওয়া যায়। রাজশাহী থেকে বাঘা যাওয়ার সহজ উপায় হলো বাস। সিএনজিতে করেও যেতে পারেন। রাজশাহী সদর বাস টার্মিনাল থেকে বাঘার বাস ছাড়ে। ভাড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা।

ঐতিহাসিক মসজিদ-ছোট সোনা মসজিদ

প্রায় ৫ শতাব্দীর ঐতিহাসিক সাক্ষী উত্তরবঙ্গের জেলা, আমের রাজ্য হিসেবে খ্যাত চাপাইনবাবগঞ্জের এক ঐতিহাসিক মসজিদ। নাম তার ছোট সোনামসজিদ। এই মসজিদ প্রাঙ্গণে শায়িত আছেন মুক্তিযুদ্ধের দুই বীর সন্তান। মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে সীমানাপ্রাচীরের ভেতরেই বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও মুক্তিযুদ্ধে ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হকের কবর। সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন বলে আখ্যায়িত এই ছোট সোনা মসজিদ। এটি বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরুজপুর কোয়ার্টারের তাহখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বিশাল এক দিঘির দক্ষিণপাড়ের পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে এর অবস্থান।


 মূল ফটক

ছবি : ফ্লিকার

 মসজিদের কিছুদূর পশ্চিমে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক কয়েক বছর পূর্বে নির্মিত একটি আধুনিক দ্বিতল গেস্ট হাউস রয়েছে। গেস্ট হাউস ও মসজিদের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি আধুনিক রাস্তা চলে গেছে। ধারনা করা হয় রাস্তাটি পুরনো আমলের এবং একসময় এটি কোতোয়ালী দরওয়াজা হয়ে দক্ষিণের শহরতলীর সঙ্গে গৌড়-লখনৌতির মূল শহরের সংযোগ স্থাপন করেছিল। রাজশাহী থেকে মহাসড়ক হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ঢুকতেই বিশ্বরোডের মোড়। সেখান থেকে সোনামসজিদ স্থলবন্দর সড়ক হয়ে ছোট সোনামসজিদ ৩৮ কিলোমিটারের পথ। মূল সড়ক থেকে নেমে ডানে অপ্রশস্ত রাস্তা ধরে ৫০-৬০ ফুট এগোলেই উত্তর-পূর্ব দিকে একটি বড় পুকুর। বাঁ দিকে বাঁক নিয়ে সামান্য এগোলেই ছোট সোনামসজিদের তোরণ।

ইতিহাস

মধ্যযুগের সুলতানি আমলের গৌড়নগরীর এক ঐতিহাসিক স্থাপনা ছোট সোনামসজিদ। মসজিদটিকে বলা হতো ‘গৌড়ের রত্ন’। মসজিদের বাইরের দিকে সোনালি রঙের আস্তরণ ছিল। সূর্যের আলো পড়লেই তা সোনার মতো ঝলমল করে উঠত। এ জন্যই এর নাম হয়ে যায় সোনামসজিদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রধানতম নিদর্শন হচ্ছে ছোট সোনামসজিদ। মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৩-১৫১৯) নির্মিত হয় সোনামসজিদ। নির্মাতা হিসেবে ওয়ালী মুহাম্মদের নাম পাওয়া যায়।

প্রতিবছর দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। প্রধান প্রবেশপথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস, মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপিতে নির্মাণের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলি মুছে গেছে। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর নামের উল্লেখ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মসজিদটি তাঁর রাজত্বকালের (হি. ৮৯৯-৯২৫/ ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.) কোনো এক সময় নির্মিত।

পূর্ব-পশ্চিমে ৪২ মিটার এবং উত্তর দক্ষিণে ৪৩ মিটার লম্বা এ বহির্দেওয়ালের পূর্ব দিকের মধ্যবর্তী স্থানে একটি ফটক ছিল। শুধু ফটকটি ছাড়া সমগ্র বহির্দেওয়াল এখন সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে স্থানে স্থানে এখনও এর চিহ্ন সুস্পষ্ট। বর্তমানে মূল চৌহদ্দি দেওয়ালের স্থলে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হয়েছে। স্থানীয় লোকদের থেকে জানা যায় যে, ফটকের নিকটে এবং দিঘির দক্ষিণপাড়ে আদিতে সোপানবিশিষ্ট একটি পাকা ঘাট ছিল। মসজিদটি ইট ও পাথরে নির্মিত। এ মসজিদের মূল ইমারত আয়তাকার এবং বাইরের দিকে উত্তর দক্ষিণে ২৫ দশমিক ১ মিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে ১৫ দশমিক ৯ মিটার। চারটি দেওয়ালই বাইরের দিকে এবং কিছুটা অভ্যন্তরভাগেও  গ্রানাইট পাথরখন্ডের আস্তরণ শোভিত।

১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলার পর সংস্কার কাজের সময় পশ্চিম দেওয়ালের দক্ষিণ অংশে পাথরের আস্তরণ অপসারিত হয়েছে। মসজিদের বাইরের দিকে চার কোণে চারটি বহুভুজাকৃতির বুরুজের সাহায্যে কোণগুলিকে মজবুত করা হয়েছে। এ বহুভুজ বুরুজের নয়টি পার্শত বাইরে থেকে দেখা যায়। পেছন দেওয়ালের মধ্যবর্তীস্থলে কেন্দ্রীয় মিহরাবের বাইরের দিকে আয়তাকার একটি বর্ধিত অংশ রয়েছে। কার্নিশগুলি ধনুকের মতো বাঁকানো এবং ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ছাদের কিনারায় পাথরের নালি বসানো আছে।


ঐতিহাসিক মসজিদ - ছোট সোনা মসজিদ

ছবি : সংগৃহীত



অভ্যন্তর

মসজিদের পূর্বদিকের সম্মুখভাগে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে তিনটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। পূর্ব দেওয়ালের খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার বরাবর পশ্চিম দেওয়ালের অভ্যন্তরে রয়েছে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব। অধিকাংশ মিহরাবের পাথর সরিয়ে নেয়ার ফলে এখন সমগ্র পশ্চিম দেওয়াল অনাবৃত হয়ে পড়েছে; অথচ একসময় এ দেওয়ালই ছিল মসজিদের সর্বাপেক্ষা সুদৃশ্য অংশ। মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে খোদাইকৃত পাথর, ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের গিল্টি ও চকচকে টালি ব্যবহূত হয়েছে। তবে এগুলির মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে খোদাইকৃত পাথর। ক্রাইটন ও কানিংহাম মসজিদটির ছাদের উপর পনেরোটি গম্বুজ ও খিলান ছাদের সবগুলিই গিল্টি করা দেখতে পান। কিন্তু বর্তমানে গিল্টির কোনো চিহ্ন নেই।

পাথর খোদাইয়ের নকশার ধরন নির্বাচন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিসরের উপযোগিতা অনুযায়ী। যেমন, প্যানেলের কিনারগুলিতে করা হয়েছে লতাপাতার নকশা এবং এদের অভ্যন্তরভাগে হিন্দু আমলের শিকল ও ঘণ্টার মোটিফ অনুসরণে বিভিন্ন ধরনের ঝুলন্তরীতি অনুসরণ করা হয়েছে। খিলানের স্প্যান্ড্রিল ও ফ্রেমের উপরের স্থানগুলি আকর্ষণীয় অলংকরণরীতিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে খোদাই করা গোলাপ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। গম্বুজও খিলান ছাদের অভ্যন্তরভাগ পোড়ামাটির ফলক দিয়ে অলংকৃত; তবে খিলান ছাদের অলংকরণ করা হয়েছে স্থানীয় কুঁড়েঘরের বাঁশের ফ্রেমের অনুকরণে। সবচেয়ে লক্ষণীয় অলংকরণ হলো কোণের বুরুজের খোদাইকৃত পাথরের বেষ্টনী এবং দ্বারপথ ও ফ্রেমের উপরে বসানো পাথরের কার্নিশ ও অলংকরণ রেখা। উল্লেখ্য যে, সম্মুখের সবগুলি খিলানপথ ও মিহরাবের খিলানগুলি ছিল খাঁজবিশিষ্ট এবং এগুলি অনেকাংশে এ মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল।

মসজিদের প্রবেশদ্বারের মতোই পূর্বদিকের ফটকে একসময় বিভিন্ন নকশা খোদাইকৃত প্রস্তর ফলকের আস্তরণ ছিল। কিন্তু এখানে সেখানে বিক্ষিপ্ত কিছু গোলাপ নকশা ছাড়া এসব অলংকরণের তেমন কিছুই এখন আর নেই। ফটকের ১৪ দশমিক ৫ মিটার পূর্ব দিকে একটি পাথরের প্লাটফর্ম রয়েছে যার আয়তন উত্তর দক্ষিণে ৪ দশমিক ২ মিটার, পূর্ব পশ্চিমে ৬ দশমিক ২ মিটার এবং উচ্চতা ১ মিটার। এর চার কোণে রয়েছে একটি করে প্রস্তর স্তম্ভ। প্লাটফর্মের উপরে উত্তর দক্ষিণে লম্বা পাশাপাশি দুটি সমাধি রয়েছে। সমাধি দুটিতেই ভিত থেকে চতুষ্পার্শ্বে কালো পাথরে নির্মিত কয়েকটি ঊর্ধ্বমুখী আয়তাকার ধাপ আছে এবং এ ধাপসমূহের পরিধি উপরের দিকে ক্রমশ হ্রাস হয়ে এসেছে।


ঐতিহাসিক মসজিদ- ছোট সোনা মসজিদ

ছোট সোনা মসজিদ। ছবি : উইকিমিডিয়া কমন্স


 দুটি সমাধিতে রয়েছে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর কয়েকটি নাম সম্বলিত অগ্রভাগ সরু পিপাকৃতির পাথরের সমাধিফলক। এখানে কারা সমাহিত আছেন তা সঠিক জানা যায় নি। কানিংহাম সমাধি দুটিকে মসজিদের নির্মাতা ওয়ালী মুহম্মদ ও তার পিতা আলীর বলে মনে করেন।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব প্রায় ৩০২ কিলোমিটার। কোতয়ালি গেইট থেকে মসজিদটির দূরত্ব ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার। মসজিদটি মুঘল তানখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ-কিলোমিটার দক্ষিনে ফিরোজপুর অংশে অবস্থিত। ঢাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দূরত্ব ৩১৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার (ভায়া রাজশাহী)। আপনি সড়কপথ এবং রেলপথে সেখানে পৌছাতে পারেন। ঢাকা থেকে বিভিন্ন বাস যেমন- হানিফ এন্টারপ্রাইজ, মডার্ন এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিভিন্ন জেলা ও শহরে বাস ছেড়ে যায়। মূলত এখান থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যই মূলত তিন ধরনের বাস ছেড়ে যায়, যেসব হলঃ গেইট লক, সরাসরি ও লোকাল সার্ভিস। এখান থেকে অন্যান্য রুটে চলাচলকারী বাস সার্ভিসগুলোর মধ্যে আছেঃ নবাবগঞ্জ-শিবগঞ্জ, নবাবগঞ্জ-নওগাঁ, নবাবগঞ্জ-নাচোল, নবাবগঞ্জ-রহানপুর। সোনা মসজিদ থেকে রাজশাহী প্রতিদিন সকাল ৭.১৫ মিনিট থেকে বিকাল ৫.১৫ মিনিট পর্যন্ত প্রতিদিন এক ঘণ্টা পর পর চলাচল করে। এছাড়া বিআরটিসি বাস নবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলাচল করে। এখানে দুইটি বাস টার্মিনালের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাস টার্মিনাল এবং অপরটি ঢাকা বাস টার্মিনাল। ঐতিহাসিক মসজিদ

নাবিলা বুশরা   এস এম