নিরিবিলি পিকনিক স্পট : প্রাকৃতিক ও আধুনিকতার মিশেলে গড়া বিনোদন কেন্দ্র

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : নড়াইলের অবস্থিত পার্কটি ১৪ একর জায়গা নিয়ে নির্মিত

নিরিবিলি পিকনিক স্পট

বিভিন্ন ভাস্কর্য, গাছ-গাছালির ছায়ায় গড়ে তোলা নিরিবিলি পিকনিক স্পট; ছবি : সংগৃহীত


 শীতকাল এলেই দেশের বিভিন্ন পিকনিক স্পটগুলো মুখরিত হয়ে উঠে বনভোজনের আয়োজনে। প্রকৃতিঘেরা সবুজের মাঝে পরিবার-পরিজন অথবা বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে হৈ-হুল্লোড় ও আনন্দ করতে তাই পিকনিক স্পটগুলোর জুড়ি নেই। আসছে শীতে যারা ভাবছেন সদলবলে পিকনিকের আনন্দে মেতে উঠবেন, তারা চলে যেতে পারেন নড়াইলের দারুণ সুন্দর নিরিবিলি পিকনিক স্পটে। অপার সবুজের মায়ায় ঘেরা লোকজ সৌন্দর্যের এই জায়গাটি যেকারোরই নিমিষেই মন ভোলাবে। নড়াইলের লোহাগড়া থানার রামপুরে নিরিবিলি পিকনিক স্পটের অবস্থান। মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা এই পিকনিক স্পটটি দক্ষিণবঙ্গের জনপ্রিয় একটি বিনোদন কেন্দ্র। ১৯৯১ সালে যাত্রা শুরু করা এই পিকনিক স্পটটি ১৪ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে বিনোদনের নানান উপকরণ দিয়ে সাজানো হয়েছে এই জায়গাটি। সকল বয়সী বিনোদন প্রেমীদের আনাগোনায় সারা বছর এই বিনোদন কেন্দ্রটি মুখরিত থাকে। আবহমান গ্রাম-বাংলার বিলুপ্ত প্রায় লোকজ ঐতিহ্যের সমারোহে সাজানো এই জায়গাটি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

অসংখ্য পাখির কলকাকলি, ফুলের শোভা আর গাছপালার ছায়ায় এখানে আগত পর্যটকরা খুঁজে পান প্রশান্তির বাতাবরণ। খুলনা লক্ষীপাশা রুটের সাথেই রাস্তার উত্তর দিকে চোখে পড়বে সুবিশাল গেট। এই গেট দিয়ে সুপ্রশস্থ রাস্তা ধরে কয়েকশ গজ ভেতরে এলেই পেয়ে যাবেন প্রথম প্রবেশদ্বার। এই প্রবেশ পথের পাশে পজু শাহের মাজার অবস্থিত। এই প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে সোজা এলেই পেয়ে যাবেন এই পিকনিক স্পটের প্রশাসনিক ভবন। এই ভবনের দোতলায় রয়েছে রেষ্ট হাউজ ও এস.এম সুলতান আর্ট গ্যালারী। এস.এম সুলতানের আঁকা অনেকগুলো পেশীবহুল ছবি রয়েছে এখানে।

এই ভবনের সামনেই আছে চমৎকার একটি হংস ফোয়ারা। দুটি রাজহংস পানিতে পা ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখানে। এই ফোয়ারার ডানপাশে একটি পুকুর রয়েছে। এই পুকুরে আছে শাঁনবাধা ঘাট ও চমৎকার একটি ঝুলন্ত ব্রিজ। এই ঘাটটিতে রয়েছে বসার জন্য দুটি বড় ঠেস বেঞ্চি আর উপরে ছাউনি। এই বেঞ্চিতে বসে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। পুকুরটির চার কোনায় রয়েছে চারটি ডলফিন ফোয়ারা। ঝুলন্ত ব্রিজের মাঝে রয়েছে একটা বিশেষ ধরণের ছাউনি। খড়ের তৈরি এ ছাউনির নিচে ব্রিজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগবে। এই পুকুরটিতে নৌকায় চড়ার ব্যবস্থা আছে। নামমাত্র ভাড়ায় কিছুক্ষণের জন্য এ নৌকায় চড়তে পারবেন। নৌকা নিজ হাতে চালাবার জন্য ব্যবস্থা আছে এখানে। এই পুকুরের উত্তর পাশটায় দেখতে পাবেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও চিত্র শিল্পী এস. এম. সুলতানের প্রতিমূর্তি।

এখান থেকে একটু বামে গেলেই চোখে পড়বে শিশুদের জন্য তৈরি চরকা। আরও আছে দোলনা ও টার্নিং কার। সুন্দর গোলাকার রাস্তায় ব্যটারী চালিত গাড়িতে চড়ে বাচ্চাদের মন আনন্দে ভরে উঠে। একদম নামমাত্র ভাড়ায় এই গাড়িটি শিশুরা ড্রাইভ করতে পারে।

আরও পড়ুন : চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত চিত্রা রিসোর্ট : নড়াইল


নিরিবিলি পিকনিক স্পট

পার্কের পুকুরে রয়েছে নৌকায় চড়ার ব্যবস্থাও; ছবি : সংগৃহীত


 এর ডান পাশে রয়েছে সুরক্ষিত ফুলের বাগান। এই বাগানটিতে দেশী-বিদেশী নানা জাতের ফুলের শোভা দেখতে পাবেন। এই বাগানটিতে আরও আছে দুটি শাপলাকৃতি ফোয়ারা ও ঐতিহাসিক আলেয়া বেগমের প্রতিকৃতি। এই বাগান থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে আসলে পেয়ে যাবেন মিনি চিড়িয়াখানা। এই চিড়িয়াখানায় দেখতে পাবেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির, কয়েক প্রজাতির হরিণ,ঘোড়া, বানর, হনুমান, ময়ূর, মদনটাক পাখি, মনিরা,বুজরিকা, খরগোস, পেলিকান, গিনিপিগসহ নানা ধরণের পশুপাখি। চিড়িয়াখানার ঠিক উত্তর পাশে রয়েছে আবাসিক ভবন। যার দক্ষিণ দিকে পেয়ে যাবেন বইয়ের স্টল, কুঠির শিল্প সামগ্রীর স্টল ও ফাস্টফুডের দোকান। বইয়ের স্টলের পাশ দিয়ে একটু সামনে গেলেই দেখতে পাবেন 'ইমদাদুল হক মিলন মঞ্চ'। এখানে সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা যায়। এর দক্ষিণে দেখতে পাবেন কামিনি গাছের তৈরি চমৎকার ময়ূর, হরিণ, এরোপ্লেন, পণ্ডিত মহাশয়ের টেবিল ইত্যাদির প্রতিকৃতি। বিশেষ কায়দায় তৈরি এই প্রতিকৃতিগুলো দেখতে খুব চমৎকার লাগে। এর দক্ষিণ দিকে আছে ফলজ বৃক্ষের বাগান। এই বাগানে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারী, পেয়ারা, লেবু, মেহগনি, রবার, পান্থমাধব সহ নানান গাছ রয়েছে।

আরও পড়ুন : প্রায় ২০০ বছর পূর্বে তৈরি নড়াইলের বাধাঘাট


বাগানের পেছনে এসে পুকুরের ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে পুকুরের পূর্ব পাড়ে আছে মিনি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ তিমি মাছের কঙ্কাল। ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এটিকে সংগ্রহ করা হয় বাগেরহাটের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে। জাতীয় যাদুঘর ছাড়া তিমির এতবড় কঙ্কাল বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। পিকনিক আয়োজনের সকল ব্যবস্থা রয়েছে এই স্পটটিতে। একসঙ্গে অনেকগুলো পিকনিকের আয়োজন করার জন্য এখানে বিভিন্ন স্থানে পঞ্চাশটির অধিক রেডিমেড চুলা রয়েছে। ঝামেলাহীনভাবে পিকনিক আয়োজনের জন্য তাই এই জায়গাটির তুলনা নেই। রাতে থাকার জন্য নিরিবিলি পিকনিক স্পটে উন্নত মানের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। খুব অল্প ভাড়ায় এখানে যে কেউ রাত্রিযাপন করতে পারেন অনায়াসে। এই আবাসিক রুমগুলোতে প্রশস্থ বেলকুনি, খোলামেলা জানালা, এটাস্ট বাথ, পরিচ্ছন্ন বেড, ও বয় সার্ভিস রয়েছে। এছাড়াও আছে ভিআইপি রুম। একা কিংবা পরিবার নিয়ে থাকার জন্য দারুণ এক ব্যবস্থা এই আবাসিক।

যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে করে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় লাগে নড়াইল পৌঁছতে। নড়াইল পৌঁছে রিকশা অথবা ভ্যানে করে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন নিরিবিলি পিকনিক স্পটে।

 রুবাইদা আক্তার   এস এম