পদ্মা পাড়ের লেছড়াগঞ্জ, মানিকগঞ্জ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি দ্বীপ লেছড়াগঞ্জ




ছবিঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ


পরের দিন শুক্রবার মানেই, বৃহস্পতিবার রাতের ঘুম হারাম। রাতভর এপাশ-ওপাশ করতে করতেই ভোর চারটা থেকে সাড়ে চারটার মধ্যেই, দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র পাগলু জসিম/হানিফের ফোন চলে আসে। আর ওমনি বিছানা ছেড়ে শুরু হয় বের হবার কসরত। ঠিক তেমনি এক শুক্রবার মটর বাইকে নব নির্মীত সিঙ্গাইর সড়ক ধরে মিতরা, ঝিটকা পেরিয়ে হরিরামপুর উপজেলার আন্ধারমানিক নৌঘাট। ও হ্যাঁ, নতুন সড়কের বর্ণনা না দিলেই নয়। ধল্লা ব্রিজ পার হবার পর হতেই নয়নে আটকাতে থাকবে পথের দুধারের নৈসর্গিক সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। আনমনেই হয়ত গেয়ে উঠবেন, "পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি...।




ছবিঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ


মানিকগঞ্জ যাবার নতুন সড়কটিতে, এখনো ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল তেমন চোখে পড়েনি। যে কারণে মটরবাইকে ইচ্ছেমতো গতিতে রাইড দেয়া যায়। ঘাটে বসে চা’য়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, যাত্রীবাহী ট্রলার ছাড়ার সময় হল। চা দোকানিকে অনুরোধ করে, তার দোকানের পাশেই বাইক রেখে ট্রলারে চড়ি। ঢেউ তোলা আষাড়ের প্রমত্তা পদ্মা নদী। ঝলমলে তপ্ত রোদে ছাউনিবিহীন ট্রলার। কিছুক্ষণ চলার পরেই, আকাশে কালোমেঘের ঘনঘটা। হঠাৎ তুফান ছাড়লে কি হতে পারে, সেদিকে খেয়াল নেই কারো। বরং রোদের ঝাঁঝ কমে যাওয়ায় মহা খুশী সবাই। আসলে পাহাড়-সমুদ্রে অ্যাডভেঞ্জার করা দে-ছুট গ্রুপের দামালেরা, পদ্মাকে গোনাতেই ধরলো না।প্রায় পৌঁনে একঘন্টা পর ট্রলার ভিড়লো, লেছড়াগঞ্জ ঘাটে। যাত্রী দেখে ভাড়ায় খাটা বাইকারদের হাঁকডাক। কিন্তু আমাদের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই।




ছবিঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ


 আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। সবুজে ঘেরা মেঠো পথ। খানিকটা দূরেই একজনের নেটের মত ব্যাগে, কিছু একটা দেখতে পেয়ে তাকে থামালাম। ব্যাগ খুলে দেখতেই দেখি, সাপের মত কিছু একটা। প্রবল উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বলল, এটা বাউস মাছ। সোশ্যাল মিডিয়ার ছবি দেওয়ার পর জানা গেলো সঠিক নাম-বামবুউইশ। সচরাচর ধরা পড়ে না। খেতেও নাকি দারুণ স্বাদ। এবার গ্রামের দিকে আগাতে থাকি। চোখে পড়ল, ভুট্টা ক্ষেতের দৃশ্য। কৃষক-কৃষাণী সমানতালে গাছ থেকে ছিড়ে ভুট্টা জমা করছে।তাদের সঙ্গে আমরাও যোগ দিয়ে, এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ভ্রমণ মানেই হলো বিনোদনের পাশাপাশি যাপিতজীবনের শিক্ষা। এরপর লেছড়াগঞ্জ চরের পাটগ্রামের দিকে আগাতে থাকি। যেতে যেতে বাজার পেরিয়ে,আরেক নদীর ধারে। নদীর তীর, আশপাশের পরিবেশ আর স্বচ্ছ পানি দেখে সেখানেই বসে পড়লাম।

মানিকগঞ্জ নিবাসী বন্ধু মেহেদিকে ফোন দিয়ে, নদীর নাম জিজ্ঞাসা করতেই জানাল ইছামতী। যে যার মত দ্রুত হ্যামোক টানিয়ে, পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আহ সেই মজা। যেন ফিরে গিয়েছিলাম সেই শৈশবের, টলটলে বুড়িগঙ্গা নদীর জলে। ডুব সাঁতার, উল্টো সাঁতার সহ ইচ্ছেমতো ইছামতীর পানিতে দাপাদাপি করে- ছুটি জুম্মা আদায়ে।নামাজ শেষে হেঁটে ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের গ্রাম গুলো ঘুরে ঘুরে দেখি। পুরো চর জুড়ে ভুট্টার বাম্পার পলন। নানান পাখির কলতান।প্রচুর গাছগাছালি। তাল গাছ গুলোতে, সারিসারি বাবুই পাখির বাসা।এতএত বাসা সাধারণত আজকাল কোথাও তেমন চোখে পড়ে না। চরের বাসিন্দারাও বেশ বন্ধুবৎসল। রয়েছে আশ্রয় প্রকল্পেরও বসতঘর।




ছবিঃ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ


 সাধারণ বর্ষায় লেছড়াগঞ্জের জমিতে পানি থাকে ছুঁইছুঁই। কিন্তু বন্যা হলে চরের বাসিন্দাদের সরে যেতে হয়। নির্ভুল তথ্যের জন্য দায়িত্বশীল কাউকে না পাবার কারণে, চরের আয়তন ও জনসংখ্যা সম্পর্কে জানা হয়নি। যেটুকুন জেনেছি তা হলো, প্রতিবছরই পদ্মায় লেছড়াগঞ্জের চর একপাশে বিলীন হয়। আবার আরেকপাশে জমি জেগে ওঠায় সঠিক আয়তন রেকর্ড করা যায় না। একুল ভাঙ্গে-ও কুল গড়ে, এইত নদীর খেলা। নদীভাঙ্গন এলাকার মানুষের মুখেমুখে এই কষ্টের বুলি যুগযুগান্ত ধরে চলে আসছে। বিদ্যুৎ বিহীন নিঝুম চরাঞ্চলের নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে বেলা গড়ালো অনেক। তাই আর দেরী না করে, নাড়ির টানে ফিরতি ট্রলার ধরি।

কিভাবে যাবেন?

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ যাবার জন্য মটর বাইকাররা ঢাকা হতে সাভারের হেমায়েতপুর হয়ে সিঙ্গাইর-ঝিটকা সড়কে হরিরামপুরের আন্ধারমানিক বাজারে যেতে পারেন। সেখান হতে প্রতিঘন্টায় ট্রলার ছেড়ে যায় লেছড়াগঞ্জ। এছাড়া গাবতলী বাস টার্মিনাল হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস মানিকগঞ্জ রুটে চলাচল করে থাকে। খাবারদাবার লেছড়াগঞ্জ মানিকগঞ্জ জেলার অন্তর্গত হলেও, জায়গাটা দুর্গম চরাঞ্চল। সুতরাং শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। সতর্কতাঃ প্রমত্তা পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়। তাই অবশ্যই লাইফজ্যাকেটসহ নিজ নিজ নিরাপত্তার বিষয়টা প্রথমেই মাথায় রাখুন।  

লেখাঃ মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম