অপরাধীদের তাদের পাপকাজের সাজা দেয়ার জন্য কারাগার বা অনেক সময় বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পাঠানো হত। অখ্যাত হোক বা বিখ্যাত এসব ব্যক্তিদের থাকার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন কারাগার এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত।
জাদুঘর বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে এসব কারাগার বর্তমানে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।
রোবেন আইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা
আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ১৮ বছর এই দ্বীপে কাটান; ছবি : গেটি ইমেজ
কেপটাউন শহরের উপকূলে ছয় বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রোবেন দ্বীপ অবস্থিত। দ্বীপটিতে প্রথমদিকে কৃষিকাজ করা হলেও পরবর্তীতে এটি কারাগার হিসেবে ব্যবহার করত ব্রিটিশরা। বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ১৮ বছর এই দ্বীপে কারাবন্দী হিসেবে আটক ছিলেন, আর তাতেই রোবেন দ্বীপ কারাগার বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
১৯৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার দ্বীপটিকে জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেয়। রোবেন দ্বীপ বর্তমানে ইউনেস্কো অনুমোদিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
হাঙরের আবাসনের মাঝে অবস্থিত ভয়ংকর এই দ্বীপে পর্যটকদের সরাসরি যাওয়ার অনুমতি নেই; ছবি : গেটি ইমেজ
একেবারে জন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ডেভিল'স আইল্যান্ড গায়ানায় অবস্থিত হলেও দ্বীপটির মালিকানা ফ্রান্সের। ফ্রান্সের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়ার জন্য এই নির্জন দ্বীপে আটকে রাখা হতো। বন্দিদের বন্দিদশার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে হলিউডে 'প্যাপিলন' ছবির শুটিং হয়েছিল।
দ্বীপটির চারপাশের পানিতে প্রচুর হাঙর থাকায় এখানে পর্যটকদের সরাসরি যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না, তবে নৌকায় করে ডেভিল'স দ্বীপের চারপাশ ঘুরে দেখা যায়।
অক্সফোর্ড ক্যাসেল, ইংল্যান্ড
প্রায় ১০০ বছরের কারাগারের ইতিহাস থেকে ক্যাসেলটি বর্তমানে আর্ট গ্যালারি ও রেস্টুরেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে; ছবি : ডেইলি মেইল
নরম্যান ব্যারন ১০৭১ সালে অক্সফোর্ড ক্যাসেল নির্মাণ করেন। গৃহযুদ্ধের সময় কিং চার্লস এটিকে বিদ্রোহীদের আটকে রাখার কাজে ব্যবহার করতেন। অক্সফোর্ড ক্যাসেলকে প্রায় ১০০ বছর ধরে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, অবশেষে ১৯৯৬ সালে অক্সফোর্ড ক্যাসেলকে তার কারাগারের ভূমিকা পালন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
২০০৪ সালে ক্যাসেলটিকে পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং রেস্টুরেন্ট, আর্ট গ্যালারি তৈরি করা হয়।
পুনর্নির্মাণ করলেও কারাগারের মূল অংশটি এখনো সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। ক্যাসেলটি সম্পূর্ণ ঘুরে দেখার জন্যে গাইডের ব্যবস্থা করা আছে। এখানে এসে দর্শনার্থীরা ১০০০ বছরের পুরনো ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে পারবে।
ডেনমার্কের ঘৃণ্য খুনি জেন্স নিয়েলসন আটক ছিলেন এই কারাগারে;। ছবি : উইকিপিডিয়া
১৫৩ বছর ধরে কারাগার হিসেবে ব্যবহারের পর ২০০৬ সালে হরসেন'স স্টেট প্রিজনকে কারাগার হিসেবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারাগারটিকে বর্তমানে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে রয়েছে কারা জাদুঘর, কনফারেন্সের রুম এমনকি কনসার্টের ব্যবস্থাও করা আছে এখানে।
কারাগারে ভ্রমণের সময় দর্শনার্থীরা শুনতে পাবে জেন্স নিয়েলসনের কাহিনী। জেন্স নিয়েলসন ডেনমার্কের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য খুনি ছিলও।
ইস্টার্ন স্টেট পেনিটেনশিয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র
কয়েদীদের প্রতি নির্মম অত্যাচারের জন্য সমালোচিত ছিলো যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন স্টেট পেনিটেনশিয়ারি কারাগারটি; ছবি : উইকিপিডিয়া
১৮২৯ সালে ফিলাডেলফিয়াতে এই কারাগার তৈরি করা হয়। শুরু থেকেই কয়েদীদের প্রতি নির্মম ও কঠোর আচরণের কারণে কারাগারটিকে নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার জন্ম হতে থাকে। ১৮৪২ সালে চার্লস ডিকেন্স কারাগার পরিদর্শন শেষে বলেন, 'কারাগারের ব্যবস্থা শক্ত, কঠোর ও নির্মম। আমি বিশ্বাস করি মানবেতর ও ভুল'।
অবশেষে ১৯৭০ সালে কারাগারটিকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং তারপর থেকেই এটি পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হয়। কারাগারটি ঘুরে দেখার সময় বিভিন্ন কয়েদীদের অভিজ্ঞতা অডিও আকারে শোনানো হয়ে থাকে।