পলাশীর প্রান্তর : ইতিহাসের কালো অধ্যায় আর হতাশার স্মৃতিচিহ্ন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: ১৭৫৭ সাল, পলাশী যুদ্ধ ও উপমহাদেশের স্বাধীনতার আক্ষেপ


Plassey পলাশী

পলাশীর প্রান্তরে অবস্থিত ব্রিটিশদের তৈরি মন্যুমেন্ট, পরবর্তীতে নির্মিত নবাবের মূর্তি এবং যুদ্ধে শহীদ মীরমদনের সমাধি; ছবি : উইকিপিডিয়া


পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল একথা সবাই জানে। ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের মধ্যে জন্ম দেয় নানা প্রশ্ন, ক্ষোভ, আরও অনেক কিছুর। ইতিহাসপ্রিয় মানুষদের কাছে তাই পলাশীর প্রান্তর হয়ে উঠেছে অনন্য। এখানে এসে চোখে পড়বে পলাশী এর ইংরেজি বানান Plassey। যদিও এখনকার সব বইয়ে দেখেছি পলাশীর বানান Polashi। তখন মনে পড়ল, ইংরেজরা সেই ১৭৫৭ সালে পলাশীর বানান Plassey-ই লিখত। এখনও তাই চলছে।

যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ

পলশী ঢুকতেই চোখে পড়বে যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। ১৫ মিটার উঁচু স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেখা : 'ব্যাটল ফিল্ড অব পলাশী, জুন ২৩, ১৭৫৭'। যদিও এই স্তম্ভ ইংরেজরা তৈরি করেছে পলাশীর যুদ্ধের বিজয়ের স্মারক হিসেবে তবুও দেশবাসীর কাছে ‘বিশ্বাসঘাতকতার স্তম্ভ’ হিসেবেই এখন তা পরিচিত। পরবর্তীতে পলাশী যুদ্ধের ২৫০ বছর পূর্তিতে এই স্মৃতিস্তম্ভের পাশে ছোট্ট আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। তাতে লেখা : পরদেশগ্রাসীদের বিজয়স্তম্ভ নয়; সিরাজ, মীর মদন, মোহনলালের নাম হোক অক্ষয়। এই স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান পিপলস ফোরাম।

আরও পড়ুন : ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদের দর্শনীয় স্থান সমূহ

স্মৃতিস্তম্ভে ঢোকার বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে আছে নবাব সিরাজের আবক্ষ মূর্তি। এই মূর্তির নিচে লেখা 'বিদেশী বেনিয়া বশ্যতা বিরোধী জোহাদি নায়ক সিরাজদৌল্লা'। যদিও এই স্মৃতিস্তম্ভ রক্ষার দায়িত্ব পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তবুও সেখানে অযত্নের ছাপ চোখে পড়ে। স্থানীয়দের কাছ থেকে শোনা যায়, একসময় এখানে প্রচুর আমগাছ ছিল। রানি ভবানীর আমবাগান ছিল এটি। এখন রাস্তা হয়েছে। একটু দূরে চিনিকল হয়েছে। ১৭৫৭ সালের সেই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য কামানের গোলায় আগুন দিতে গিয়ে কামান ফেটে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন নবাব সিরাজের সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মীর মদন।

স্মৃতিস্তম্ভের পেছনের পথ ধরে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে গেলে মীর মদনের সমাধিস্থল। চারদিক প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হলেও সমাধি ঢেকে আছে জঙ্গলে। এখানে সমাধিস্থ করা হয় নবাবের আরও দুই বীর কমান্ডার বাহাদুর আলী খান এবং ক্যাপ্টেন নৌয়ে সিং হাজরাকে। বন্দুকধারী ইউনিটের অধিনায়ক ছিলেন বাহাদুর আলী খান। আর গোলন্দাজ বাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন নৌয়ে সিং হাজরা। যুদ্ধের পরপরই এখানে গোপনে তাঁদের সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন : জিনজিরা প্রাসাদ : অষ্টাদশ শতকের নানা ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী যে প্রাসাদ

কৃষ্ণনগর গ্রাম

এছাড়াও দেখতে পারেন পাশেই নদীয়া জেলার মধ্যমণি কৃষ্ণনগর গ্রাম। এখান থেকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক জায়গাগুলোয় সহজেই যাওয়া যায়। কৃষ্ণনগর বিখ্যাত এখানকার সরপুরিয়া সরভাজা , জগদ্ধাত্রী পুজো , মৃৎশিল্প এবং রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজবাড়ির জন্য। আরও রয়েছে মুর্শিদাবাদ। কৃষ্ণনগর ও মুর্শিদাবাদ স্টেশনের ঠিক মাঝামাঝি হলো পলাশীর অবস্থান। এবং এই দুই জায়গা থেকেই পলাশী আসতে সময় লাগে ১ ঘণ্টার মতন।
Plassey পলাশী

পলাশীর প্রান্তরে মীরমদন, নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খানের স্মারকস্তম্ভ; ছবি : উইকিপিডিয়া


যেভাবে যাবেন :

যদি আপনি কোলকাতার দিক থেকে উত্তরবঙ্গে ভ্রমণ করেন তাহলে পলাশী নদীয়া জেলার প্রান্তিক স্টেশন। সড়কপথেও পলাশীর পরেই নদীয়ার শেষ এবং পরবর্তী স্টপ রেজিনগর থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার শুরু। পলাশীর আশেপাশে বেশ কয়েকটি শহর হলো কৃষ্ণনগর (নদীয়া), নবদ্বীপ (নদীয়া), শান্তিপুর (নদীয়া), বহরমপুর (মুর্শিদাবাদ), লালবাগ (মুর্শিদাবাদ), কাটোয়া (বর্ধমান)। কোলকাতা (চিৎপুর) স্টেশন থেকে সকাল ৬.৫০ মিনিটের হাজারদুয়ারি এক্সপ্রেস চেপে বেলা ১০.৩০ এর মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়

মুর্শিদাবাদ(লালবাগ) স্টেশন। মুর্শিদাবাদ স্টেশনের ঠিক এক ঘণ্টা আগে আসে পলাশী। কোলকাতা স্টেশন থেকে পলাশীর দূরত্ব ১৪৭ কিলোমিটার। যেকোন জায়গায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে সেখানকার পরিবেশের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে এবং ভ্রমণাকারীদের দ্বারা যাতে স্থানীয়দের জীবনযাত্রায় বিঘ্ন না ঘটে সে ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে।

  জোহরা মহসীন   এস এম


Click Here To See More