ঐতিহাসিক পাঁচ পীরের মাজার : বগুড়া
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : পাঁচ পীরের মাজার

বাংলার প্রাচীনতম শহর হিসেবে বগুড়ার নাম সবার আগে আসবে। ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন সভ্যতা, মহাস্থানগড় সভ্যতা বর্তমান বগুড়াতেই ছিল। রাজা অশোকের বাংলা জয় বগুড়াকে তখন তার পূর্ব নাম পুণ্ড্রনগর হিসেবে পরিচিত করে। শতাব্দী পেরিয়ে বগুড়া বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। শতাব্দী প্রাচীন এই শহরে তখন ধর্ম প্রচার কিংবা ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে নানান মানুষের আগমন ঘটে। আর সেসব ইতিহাস আজও এখানকার নানান স্থাপনার মধ্যে জড়িয়ে আছে।
বগুড়ার ঐতিহাসিক তেমনই স্থাপনাগুলোর একটি পাঁচ পীরের মাজার। পাঁচ পীরের মাজার বগুড়ার কাহালু উপজেলার ঐতিহাসিক একটি স্থান। এই অঞ্চলের ইসলাম ধর্ম প্রচারের ইতিহাসের সাথে এটি জড়িয়ে আছে। পাঁচ পীরের সমাধিকে কেন্দ্র করেই এই স্থানটি পাঁচ পীরের মাজার হিসেবে পরিচিতি পায়। উঁচু টিলার মতো স্থানের ওপর অবস্থিত এই পাঁচ পীরের মাজারের পাঁচ পীর সম্পর্কে জেনে আসা যাক তাহলে। এই উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার হয় মূলত ওলি আল্লাহ, পীর ও তাঁদের অনুসারিদের মধ্য দিয়ে। তেমনই তৎকালীন এদেশে ইসলাম প্রচার শুরু হয় আব্দুল আজিজ (রহঃ) নামের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি দলের আগমনের মধ্য দিয়ে। তিনি ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে ৭ জনের একটি দল নিয়ে এদেশে আসে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্যে। ধীরে ধীরে অনুসারীর সংখ্যায় বাড়তে থাকলে এরা আবার ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে।
পাঁচ পীরের মাজার
পুণ্ড্রনগরে ইসলাম প্রচার করতে আসে ৫ জনের একটি দল। সেই দলের নেতৃত্বে ছিলেন নুর উদ্দীন ইয়ামিন (রহঃ)। এই উপজেলার প্রতাপপুর গ্রামে এসে দলটি আশ্রয় গ্রহণ করে এবং ধর্ম প্রচারের কার্যক্রম শুরু করে। একদম শুরু থেকেই সংরক্ষণ না হওয়ায় সঠিক ইতিহাসএখানে নানা রকম গল্পই প্রচলিত আছে। এসব গল্প একটা থেকে আরেকটা ইতিহাস চরিত্র সবই ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়। তাই ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। পীরগণের নাম ও আগমনের তথ্যও তাই বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়িয়ে আছে নানান ভাবে।এই যেমন স্থানীয় সূত্রে, ঐ সময়ে এখানে যে ধর্ম প্রচারকের আগমনের কথা শোনা যায় তিনি হচ্ছেন পীরজাদা মোঃ আহমদল্লাহ (রহঃ)। সুদূর ইরাকের বাগদাদ শহর হতে তিনি এখানে আসেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। আস্তানা গড়ে তোলেন এই পাঁচ পীরের মাজারের ১ কিলোমিটার পশ্চিমে ফকিরপাড়া গ্রামের পাশে দরগাতলা নামক স্থানে। এখানে একটা পাকুড় গাছের মাথায় লাল ঝাণ্ডা দিয়ে তার নিচে তিনি থাকতেন। পরবর্তীতে এই ঝাণ্ডা দেখে একে একে বাকি ৪ পীর এখানে এসে সমবেত হন এবং একই সাথে ধর্ম প্রচারের কাজ করে যান। আর এই পাঁচ পীরের প্রধান হিসেবে ছিলেন বাগদাদ হতে আগত আহমদল্লাহ (রহঃ)।
পাঁচ পীরের মাজার
ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় জমিদারের সাথে তাদের মতের অমিল দেখা যায় এবং স্থানীয় মানুষ ও অনুসারিদের নিয়ে ঐ জমিদারকে বিতাড়িত করে পীরগন জমিদারের কাচারিতে গিয়ে ওঠেন এবং এখান থেকেই ধর্ম প্রচার শুরু করেন। একে একে পীরগণের মৃত্যুতে তাদেরকে বর্তমান পাঁচ পীরের মাজার স্থানে সমাধিস্থ করা হয়। জায়গাটিও পরিচিত হয়ে উঠে পাঁচ পীরের মাজার হিসেবে। বর্তমানে পীরগণের যেসব নামের উল্লেখ পাওয়া যায় তা নিয়েও প্রচলিত আছে একটি গল্প। জানা যায়, এই মাজার শরীফে মোরাকাবা ও মুশাহেদী করে পীরগণেরনাম জানতে পারেন এক স্বনামধন্য পীরজাদা পীরজাদা মাও: মোহাম্মাদী ফরিদি। ১৯৬৮ সালে তিনি তার একজন মুরিদকে নিয়ে এখানে মোরাকাবা ও মুশাহেদী করেন।সেই সূত্রে এই মাজারে সমাধিস্থ পীরগণ হলেন পীরজাদা মোঃ আহমদল্লাহ (প্রধান), পীরজাদা মোঃ আব্দুল গফুর, পীরজাদা মোঃ আব্দুস সামাদ ও পীরজাদা মোঃ আব্দুর রহমান। ১৯৫২ সালে এই এলাকা খননকালে পাঁচ পীরের এই মাজার আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে এখানে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ও রেল ষ্টেশন রয়েছে। প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষে এই মাজারকে কেন্দ্র করে ৩ দিনব্যাপী ওরশ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দূর-দূরান্ত হতে ভক্তবৃন্দ এসে মিলিত হন এখানে।
যেভাবে যাবেন:
পাঁচপীরের মাজার বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলায় অবস্থিত। বগুড়া শহরের সাতমাথা থেকে সিএনজি বা অটো রিকশা নিয়ে যাওয়া যায়। বগুড়া হতে সরাসরি ট্রেনে করেও যাওয়া যায়। স্টেশন হতে ২০০ মিটার দূরত্বে এই পাঁচ পীরের মাজার অবস্থিত।
আরো পড়ুন ঃ পরিযায়ী পাখি দেখতে জাহাঙ্গীরনগরে একদিন
ফেসবুক পেইজঃ ট্রাভেল বাংলাদেশ
সাখাওয়াত হোসেন এস এম