পিনপতন নীরবতার মধ্যে দিয়ে ভয়ংকর ভ্রমণ : সাতভাইখুম
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ভয়ংকর সুন্দর বান্দরবানের খুমগুলো
সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাতভাইখুম। ছবি : ট্যুর টুডে বিডি
আমিয়াখুম-নাফাখুম-এর জনপ্রিয়তার সামনে অনেকটাই আড়ালে পড়ে রয়েছে সাতভাইখুম। অনেকে হয়তো নামও জানে না। কিন্তু সাতভাইখুমের সৌন্দর্যে রয়েছে ভিন্নতা। অন্য ৮-১০ টা খুম থেকে সাতভাইখুমকে সহজেই আলাদা করা যায়। এই খুমগুলোর অবস্থান বান্দরবান জেলায়। প্রথমেই আপনাকে চলে যেতে হবে বান্দরবান।
বান্দরবান থেকে জিপ বা চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করে কিংবা বাসে করে চলে যেতে হবে থানচিতে। সময় লাগবে প্রায় ৩-৪ ঘন্টা। থানচি থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে যেতে হবে রেমাক্রি। রওনা দেয়ার পূর্বে অবশ্যই গাইড ঠিক করে নিতে হবে নাহলে প্রশাসনের অনুমতি পাওয়া যাবে না। রেমাক্রির পর আর কোন যানবাহন আপাতত পাওয়া যাবে না। ট্রেকিং শুরু হবে এখান থেকেই।
জলপ্রবাহ আর পহাড়ের দেশে, সাতভাইখুম। ছবি : আদার ব্যাপারী
দুপুরের মধ্যে পৌঁছে যেতে পারলে সেদিনই ট্রেকিং শুরু করে দেওয়া ভালো নাহলে সম্পূর্ণ এলাকা ঘুরতে আপনার আরও একদিন বেশি লেগে যাবে। রেমাক্রি বাজারে নেমে দুই-আড়াই ঘন্টা ট্রেকিং করলে পৌঁছে যাওয়া যাবে নাফাখুম ঝরনায়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করতে থাকবে প্রতিটা মুহুর্তে। নাফাখুম ঝর্ণায় বেশি সময় নষ্ট না করে থুইসা পড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। থুইসা পাড়া যেতে প্রায় ৩-৪ ঘন্টা ট্রেকিং করতে হবে।
যদি রাত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে নাফাখুম থেকে তুলনামূলক কাছে জিনাপাড়ায় রাতে অবস্থান করা ভালো। পরদিন সকাল সকাল রওনা দিতে হবে আমিয়াখুমের দিকে। প্রায় দুই-আড়াই ঘন্টা ট্রেকিং করে দেবতা পাহাড়ে পৌঁছনো যাবে। সেখান থেকে আমিয়াখুম। আমিয়াখুমের সৌন্দর্যের সামনে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। আমিয়াখুম থেকে কাছেই ভেলাখুম ও সাতভাইখুম। আমিয়াখুম থেকে কিছুটা উপরে উঠলে পাওয়া যাবে থরে থরে সাজানো পাথরের রাস্তা।
সেই রাস্তা পার করার পর পাওয়া যাবে বিশাল পাথরের পাহাড় আর তার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ, সুন্দর পানির রাস্তা। এই পানির রাস্তাটা পার করতে হবে ভেলায় চড়ে। এই এলাকাটাই পরিচিত সাতভাইখুম নামে।
বান্দরবানের অপার্থিব সৌন্দর্য, সাতভাইখুম। ছবি : কই যান
কিংবদন্তি অনুযায়ী দেবতার পাহাড় থেকে ভেঙ্গে পরা বিশাল আকারের সাতটি পাথরের কারণে এই স্থানের নাম সাতভাইখুম। সাতভাইখুমকে পাথরের দূর্গও বলা যায়। মাঝের পানির রাস্তাবাদে চারপাশে থরে থরে সাজানো পাথর। আমিয়াখুম থেকে নাইক্ষাং মুখ পর্যন্ত যাওয়াটাই সাতভাই খুমের মূল উত্তেজনার সময়। ভেলায় চড়ে যেতে সময় লাগবে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট কিন্তু এই আধাঘন্টা সময় জীবনের অন্যতম স্মরনীয় মুহুর্ত হয়ে থাকবে।
দুই পাশে পাথরে খাঁজ কাটা খাড়া দেয়াল, টলটলে স্বচ্ছ পানি। খাড়া পাহাড় উঁচু হতে হতে এক সময় ঘন গাছপালার ভিড়ে হারিয়ে যাবে। নীরব নিস্তব্ধ খুমের চারপাশে পিনপতন নিরাবতার মধ্যে দিয়ে ভেলা চালিয়ে যেতে নাইক্ষাং মুখের উদ্দেশ্যে। কিছু কিছু স্থানে পানির গভীরতা এতোটই বেশী যে সাঁতার জানলেও ভয়ে একটু হলেও বুক কেঁপে ওঠে। একেই বোধহয় বলে ভয়ংকর সুন্দর। সবগুলো খুম ঘুরে আসতে আপনার সময় লাগবে ৪ দিন।
ফেরার পথে পদ্মমুখ রাস্তা দিয়ে ট্রেকিং করে ফিরে আসতে পারেন থানচিতে। খুম ঘোরার এই সময়টাতে রাতে আপনাকে থাকতে হবে বিভিন্ন আদিবাদসী পাড়ায়, তাদের ঘরগুলোতে। খাওয়া-দাওয়াও করতে হবে সেখানে। সাধারণত খাবারে থাকে জুম চালের ভাত সেইসাথে মাংস, সবজি, ডাল ইত্যাদি।
ছবি : বিউটিফুল বাংলাদেশ
এই লম্বা ট্রেকিং-এ কিছু জিনিস মাথায় রাখতে হবে :
১। শুকনো খাবার (ম্যাংগো বার, বাদাম, কেক, বিস্কুট ইত্যাদি) রাখা ভালো কারণ লম্বা সময় ট্রেকিং-এ পথিমধ্যে খাবার পাওয়া যাবে না।
২। ভালো জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে যাতে পিচ্ছিল রাস্তায় হাঁটা সহজ হয়।
৩। গাইডের সাথে আলাপ না করে নিজের মত কোথাও যাওয়া যাবে না সেক্ষেত্রে হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। গ্রুপ মেম্বারদের সাথেও পরামর্শ করতে হবে কোথাও রওনা দেওয়ার আগে।
৪। নিজের নিরাপত্তার যাবতীয় বিষয় মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় ঔষধ, লাইফ জ্যাকেট ইত্যাদি সাথে নিয়ে যেতে হবে।
৫। আদিবাসীরা খারাপ চোখে দেখে এমন কোন কাজ করা যাবে না কারণ ৩-৪ দিন তাদের মাঝেই থাকতে হবে আপনাকে।
৬। নিজের কোন একটি পরিচয়পত্রের মূল কপি বা ফটোকপি সাথে রাখুন যা প্রশাসনের অনুমতি পেতে সাহায্য করবে। আপনার যদি নিয়মিত ট্রেকিং করার অভ্যাস থাকে ও নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকে যে টানা ৩-৪ দিন পরিশ্রম করতে পারবেন সেই ক্ষেত্রে আমিয়াখুম-নাফাখুম-সাতভাইখুম অবশ্যই ঘুরে আসতে পারেন।
তবে বর্ষাকালে ফ্ল্যাশ ফ্ল্যাডের (পাহাড়ি ঢল) সম্ভাবনা থাকে তাই সেই চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। এছাড়াও প্রশাসন অনেক সময় ট্রেকিং বন্ধ করে রাখেন বিভিন্ন কারণে তাই সেই বিষয়ে খোঁজ-খবর করে যেতে হবে। ট্রেকিং এর জন্য ভালো সময় বর্ষার শেষ দিকে বা শীতকালে।
সতর্কতা : কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংরা করবেন না। আমাদের দেশ আমাদেরই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট ও ট্রেকারদের অভিজ্ঞতা থেকে সংগৃহীত