পুতুল দ্বীপ : মেক্সিকোর রহস্যময় ভূতুড়ে দ্বীপ

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : আইল্যান্ড অব দ্যা ডলস : ম্যাক্সিকোর ভূতুড়ে পুতুল দ্বীপ



Dolls Hanging in the tree at Mexican Island of the Dolls (পুতুল দ্বীপ)

মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ, যেটি হরর মুভির দৃশ্যকেও হার মানাবে। ছবি : উইকিপিডিয়া


 পুতুলের কথা বললেই ছোটবেলার বহু সুখস্মৃতি মনে ভেসে ওঠে। শৈশবের প্রিয় এই খেলনাটির সাথে শিশুমনের কত শত আবেগ জড়িয়ে থাকে। তবে, যারা হরর মুভি দেখতে পছন্দ করেন তাদের অনেকের কাছেই পুতুলের আরেক রকম ছবি ভেসে ওঠে। অ্যানাবেল ডল কিংবা চাইল্ডস প্লে-এর চাকি’র মত পুতুলের ভয়াবহ সব কার্যকলাপ তাদের কাছে পুতুলকে করে তুলেছে ভয়ের বস্তুতে। তবে জেনে অবাক হবার মতো ঘটনা হচ্ছে এমন ভূতুড়ে পুতুল শুধু মুভিতে নয় বাস্তবেই দেখা যায় ,মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ (Island of the Dolls)-এ। অদ্ভুত এই দ্বীপে নেই কোনও মানুষ, আছে শুধু ভূতুড়ে সব পুতুল।

অবস্থান

মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে ১৭ মাইল দক্ষিণে জোকিমিলকো জেলায় এই দ্বীপটি অবস্থিত। এই ভয়ঙ্কর দ্বীপের নাম 'পুতুল দ্বীপ'। মেক্সিকান ভাষায় এই দ্বীপের নাম “ইস্লা দ্যা লাস মিউনিকাস” বা “আইল্যান্ড অব দ্যা ডলস”। অদ্ভুত এই দ্বীপে আসলে দেখবেন গাছের ডালে ঝুলছে পুতুল, ছোট পরিত্যক্ত ঘরের দেয়ালে ঝুলছে পুতুল।


মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ

মেক্সিকোর পুতুল দ্বীপ। ছবি : পপসুগার



দ্বীপজুড়ে শুধুই পুতুল আর পুতুল

এই পুতুলগুলো দেখতে মোটেই মনোরম নয়। ভীষণ পুরনো আর কাঁটা-ছেঁড়া ধরণের এই পুতুলগুলো দেখতে বেশ ভয়ানক। গা ছমছম করা পরিবেশ আর বীভৎস সব পুতুলের বাস এই দ্বীপে। মাথা ছাড়া, অর্ধেক শরীর অথবা পুরো পুতুল ঝুলে রয়েছে দ্বীপের এখানে সেখানে। যেদিকেই তাকাবেন সেদিকে শুধু বিদঘুটে পুতুল আর পুতুল চোখে পড়ে। মনে হবে যেন আপনি কোনও হরর মুভির শ্যুটিং সেটে চলে এসেছেন। নির্জন এই দ্বীপে শুধু পুতুলেরই বাস। এখানে নেই কোনও জনবসতি।

রহস্যময় ইতিহাস

এই দ্বীপে এতো পুতুল কীভাবে এলো তা নিয়ে রয়েছে নানা রহস্যময় গল্প। প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ বছরের আগের কথা।

আরও পড়ুন : জোন অব সাইলেন্স : ম্যাক্সিকোর অদ্ভুতুড়ে এক মরুভূমি

A women travelers in Mexican Island of the Dolls

সাধারণত সাহসী ও অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীরাই কেবল এখানে ভ্রমণ করে থাকেন। ছবি : দ্যা ফ্রগ এন টোড


 তিন শিশু এই ছায়াঘেরা অন্ধকার দ্বীপে পুতুল নিয়ে মনের আনন্দে খেলা করছিল। ঠিক সেসময়ই হঠাৎ করে একটি শিশু গায়েব হয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাশের একটি খালে সেই শিশুটির মৃতদেহ পাওয়া যায়। শিশুটির মৃতদেহের পাশে তার প্রিয় পুতুলটি পাওয়া যায়। তারপর থেকেই এই দ্বীপে নানান অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। এখানে শোনা যেতে থাকে হাসির আওয়াজ, কান্নার ধ্বনি। আবার কখনওবা মনে হতো কেউ ফিস ফিস করে কথা বলছে। এমন আরও অনেক ঘটনা ঘটতে শুরু করে এখানে। এরপর থেকেই এই দ্বীপটি একটি ভূতুড়ে জায়গা হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের দিকে ডন জুলিয়ান সানতানা নামের এক যাজক এই দ্বীপে আসেন তপস্যা করার জন্য। জুলিয়ানের মতে সেই শিশুটির আত্মা তার কাছে দাবি করেছিল এই দ্বীপের চারপাশে পুতুল টাঙিয়ে দেয়ার জন্য। শিশুটির অতৃপ্ত আত্মাকে খুশি করতে জুলিয়ান তার আশ্রমে চাষ করা সবজির বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে নষ্ট পুতুল সংগ্রহ করা শুরু করেন। সংগ্রহ করা পুতুলগুলো তিনি দ্বীপের সব জায়গায় ঝুলিয়ে দিতেন। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে এই নষ্ট পুতুলগুলো দেখতে আরও কদাকার হয়ে উঠে। এরপর লোকমুখে এই পুতুলগুলোকে নিয়ে নানান ঘটনা শোনা যেতে শুরু করে। অনেকে বলতো গাছের আড়ালে পুতুলগুলো যেন তাদের অনুসরণ করছে। আবার কেউ কেউ বলতো তারা পুতুলগুলোকে চোখ খুলতে ও বন্ধ করতে দেখেছে। এছাড়া এমনও শোনা গেছে এই দ্বীপের কাছ দিয়ে কোনও নৌকা গেলে পুতুলগুলো ইশারা দিয়ে ডাকতো। এভাবেই এই দ্বীপটি গড়ে ওঠে ভয়ঙ্কর পুতুলের দ্বীপ হিসেবে।

আরও পড়ুন : দ্বীপ সোনাদিয়া : অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি



Dolls Hanging in the tree at Mexican Island of the Dolls

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অধিকারী হলেও ভূতুড়ে অভিজ্ঞতার জন্য এখানে পর্যটকদের আনাগোনা খুবই সামান্য। ছবি : কেটেকা ডট কম



সম্প্রতি আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে

২০০১ সালের দিকে এখানে আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। একদিন ডন জুলিয়ান তার ভাইয়ের ছেলেটিকে নিয়ে সেই খালে মাছ ধরছিলেন যেখানে শিশুটির মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। মাছ ধরতে ধরতে একটা সময় জুলিয়ান তার ভাইয়ের ছেলেকে বলেন পানির নিচ থেকে কেউ যেনও তাকে ডাকছে। এই ঘটনার কিছুদিন পরই জুলিয়ানের মৃতদেহ সেই খালে পাওয়া যায়। অপরূপ নীল জলরাশি ও সবুজের মায়ায় গড়া এই দ্বীপে খুব একটা পর্যটকদের আনাগোনা নেই। কারণ এই বিদঘুটে পুতুলগুলোকে দেখে রাতে পর্যটকরা দুঃস্বপ্ন দেখেন। এই দ্বীপ সম্পর্কে মানুষের এই ভীতি দূর করতে মেক্সিকান সরকার ১৯৯০ সালে এটিকে 'ন্যাশনাল হেরিটেজ' ঘোষণা করে। এই দ্বীপটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তাতেও খুব একটা কাজ হয়নি। পুরো বছরজুড়ে মোটে ২০-৩০ জনের বেশি পর্যটক এই দ্বীপমুখী হন না। পর্যটকদের মধ্যে যারা বেশ সাহসী ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় শুধু তারাই এখানে আসেন।  

রুবাইদা আক্তার   এস এম