বনরুপা বাজার : রাঙ্গামাটির বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির পাহাড়ি বাজার

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : রাঙামাটির বনরুপা বাজার

বনরুপা বাজার

রাঙামাটির সমতাঘাটের বনরুপা বাজার; ছবি : সংগৃহীত
একদিকে বিখ্যাত কাপ্তাই হ্রদ আর অন্যদিকে বনরুপা বাজারের দেখা মিলবে রাঙ্গামাটি সমতাঘাটে। সমতাঘাটে বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে কাছে ও দূরের নানান জায়গা থেকে অগণিত নৌকার আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। বাজারের দিনে পুরো ঘাঁটে ঘটে যায় এলাহি কাণ্ড। আজকের এই লেখায় আপনাদের রাঙ্গামাটির সেই বনরুপা বাজার সম্পর্কে জানাবো। ঘাঁটে যেসব নৌকা ভিড়ানো থাকে, তা থেকে যাত্রীরা একের পর এক নামতে থাকেন। তাদের সবাইই কম বেশি পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষজন। নৌকা বোঝাই করে আসে পাহাড়ি শাকসবজি আর ফলমূল। পাইকারি দরদামের পালা চলে নৌকাতেই।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীরা পিঠে ঝুলানো বাঁশের ঝুড়িতেই বেশিরভাগ পণ্য বহন করে আনেন। সেসব ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ঝুড়িগুলোকে মারমারা পরগিন, চাকমারা কালং এবং টিপরারা কাবাং বলে থাকেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে ভিড় জমায় এখানে। কেউবা কাপ্তাই লেক পাড়ের গ্রাম থেকে আর কেউবা কর্ণফুলী নদী পাড়ের জনপদ থেকে আসেন। নৌপথে প্রায় প্রতিদিনই নানান রকম পণ্য আসে এই ঘাটে। তবে বেশি পণ্য আসে হাটের দিনে। ঘাঁট সংলগ্ন এই বনরুপা বাজারটি রাঙ্গামাটির সবচাইতে নামকরা বাজার কেন্দ্রগুলোর একটি।

বাজারের উল্লেখযোগ্য পণ্য

বাঙালি ক্রেতা-বিক্রেতার বেচাকেনা আর নানা পণ্যের পসরা এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ব্যস্ততায় বেশ জমজমাট থাকে বনরুপা বাজার। পাহাড়ি শাকসবজি এই বাজারের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য পণ্য। এগুলো আসলে পুঁইশাক গাছের বিচি। চাকমারা এগুলোকে পুজগ বিচি বলে। এখানকার সবজি কোনটি জুম ক্ষেতের আবার কোনটি বন-জঙ্গলের।

পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আর বাঙালি এখানে মিলেমিশে একাকার। এখানকার শাকসবজি যেমনি তরতাজা, তেমনই একদম ভেজালমুক্ত। প্রকৃতি নির্ভর পাহাড়ি বাসিন্দারা যেন প্রকৃতির মতোই নির্মল, সহজ-সরল ও সৎ। নানান রকমের শাকসবজির, কোনটি চেনা, আবার কোনটি অচেনা। এমন বৈচিত্র্যময় শাকসবজি আপনি সমতলের হাট-বাজারে দেখতে পাবেন না। এখানে এক ধরনের টক পাতা পাওয়া যায়। বাঙালিরা এই পাতাকে চুকাই পাতা আর চাকমারা আমিল্য পাদা নামে চেনেন।

এই পাতার ইংরেজি নাম রোসাল লিভস। পাহাড়িরা খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য আমিল্যে পাদা এবং সাবারাং এর মতো মসলা পাতা ব্যবহার করে থাকেন। জুমের ফসল সবুজের মিষ্টি কুমড়া। পাহাড়িরা একে জুম কুমড়া বলে। কলাপ্রধান এলাকা হওয়ার কারণে এখানে কলার মোচাও আছে। এছাড়াও পাহাড়ি মিষ্টি আলু, কণা ফলও পাওয়া যায়। আগুণের মতো লাল এই কলার নাম অগ্নীশ্বর কলা বা লাল কিল। চাকমারা কনই গাছের ফলের মতো দেখতে এই কণা ফলকে হনাগুলো বলে। বাঙালিদের মতো পাহাড়িদেরও পছন্দের একটি সবজি বেগুন।

রাঙামাটিতে পেঁপে এবং বেগুন এই দুটিরই প্রচুর ফলন হয়। এখানকার সব প্রচলিত এবং অপ্রচলিত শাকসবজির দাম তুলনামূলক ভাবে কম দামে পাওয়া যায়। বাজারে প্রায়ই বাঁশের চোঙ্গার তৈরি হুক্কা চোখে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী চাকমারা একে দাবা বলে। বনরুপা বাজারের বিখ্যাত সবজি কচি নরম অংশ বা অংকুর বা বাঁশ গাছের গোঁড়া । এই বাঁশ কোঁড়লকে মারমারা মাহি, চাকমারা বলে বাচ্চুরি আর টিপরারা মেওয়া বলে। তাদের খুবই প্রিয় সবজি এটি। বাহিরা গড়নসহ এবং বাহিরা গড়ন ছাড়া দুই ধরনের বাঁশ কোঁড়লই সেখানে বিক্রি হয়। খাওয়ার জন্য, ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা বাঁশ কোড়লই বেশি উপযোগী।

পাহাড়িরা কচুরমুখিও বেশ পছন্দ করেন। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ভুট্টার ফলন সবচেয়ে বেশি। তাই এখানে ভুট্টা বিক্রি হয়। ধান ও গমের তুলনায় এই ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। রাঙ্গামাটির গাঢ় সবুজ রঙের কমলার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। রাঙ্গামাটিতে ভুট্টার মতো কমলারও বাম্পার ফলন হয়। এখানকার কমলা দামে যেমনই সস্তা, স্বাদেও তেমনই মিষ্টি। রাঙ্গামাটির জাম্বুরাগুলো রসালো এবং আকারে বড় হয়। রাঙ্গামাটির এই বাজার সপ্তাহের সাতদিনই খোলা থাকে। আর হাট বসে সপ্তাহের প্রতি শনি ও বুধবার। সেখানকার বাসিন্দারা অবশ্য হাটবার না, বাজার বার বলেন।

শুধু শাকসবজিই না, বিভিন্ন রকম মনোহারী পণ্যও এই বাজারে পাওয়া যায়। এই জায়গাটি গয়নার সম্ভার। এই ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠীর সব বয়সের মেয়েরাই সাজতে খুব ভালোবাসে। বাজারের একপাশে মাছের পসরা বসে। সেখানকার বেশিরভাগ মাছই আসে কাপ্তাই লেক থেকে। বাজার লেকের পাড়ে হওয়ায়, জীবন্ত মাছও পাওয়া যায়। লেকের কারণেই বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ উঠে এই বাজারে। বড় যে মাছগুলো পাওয়া যায় সেগুলো কার্ভ জাতীয়। আর ছোট মাছের মধ্যে চাপিলা ও কেচকি মাছ বেশি। থাকে লেকপাড় থেকে ধরে আনা কাঁকড়া বরফের মধ্যে রাখা হয়।

পার্বত্য এলাকার হাট তাই বাজারে মাছের শুঁটকি সেখানে থাকেই। এটি পাহাড়িদের বেশ পছন্দের খাবার। কাচকি, চিংড়ি, টাকি, টেংরা, চান্দা, লইট্টা, বাইন, চাপিলা, মলা, পুঁটি, বুইচাসহ নানান প্রজাতির মাছের শুঁটকি সেখানে আছে। এমনকি মাশরুমও পাওয়া যায় বনরুপা বাজারে! কি আছে আর কি নেই রাঙ্গামাটির এই বনরুপা বাজারে। সব মিলিয়ে পাহাড়িদের বিখ্যাত এই বাজারটি যেন একটু আলাদা এবং প্রকৃত অর্থেই বিখ্যাত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।   


তথ্যসূত্র: ১। http://bangla.swadhindesh.com/