বাহেরবালী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় : হাওরে ভাসমান এক নয়নাভিরাম শিক্ষায়াতন

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: বছরের ৯ মাস স্কুলটি সম্পূর্ণ পানিতে ঘেরা থাকে


বাহেরবালী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ।

বাহেরবালী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, বাজিতপুর, কিশোরগঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত


হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জ বহু কারনেই আমাদের দেশের এক পরিচিত অঞ্চল। তবে, সম্প্রতি এই জেলাটির একটি বিদ্যালয় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হাওরের মাঝেই অবস্থিত বিদ্যালয়টি। দূর থেকে দেখলে একে মনে হয় যেন একটি ভাসমান আশ্রয়কেন্দ্র। কাছে গেলে দেখা যায় সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এক শিক্ষায়াতন। যে স্কুলের শিক্ষার্থীরা যোগদান করে নৌকাযোগে। বিকল্প কোনো উপায় না থাকায় ছোট ছোট শিশুরা নৌকায় করে স্কুলে যায় শিক্ষার্জনে। শিক্ষা মানবজীবনে উন্নয়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম, শিক্ষাব্যতীত কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনা।

বিশ্বের সব উন্নত দেশগুলোই শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ। এযাবৎ কালে প্রায় সকল যুগের চিন্তাবিদরাই শিক্ষা সম্পর্কে কথা বলেছেন, এর তাৎপর্য উল্লেখ করে গেছেন। অনুন্নত দেশগুলোর উন্নতির অন্তরায় শিক্ষার অভাব অনেক বড়, মতভেদে প্রধান কারণ। ক্রমে এক উন্নত জাতিতে পরিণত হতে আমাদের দেশও তাই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে আগের তুলনায় বহুগুণে। তবে, এই শিক্ষার্জন সহজ কোনো বিষয় না, যার মধ্যে অবকাঠামোর অভাব একটা বড় বাঁধা।

হাওর অঞ্চলগুলোর স্কুল

দেশে তুলনামূলক হাওর অঞ্চলগুলোকে অনুন্নত বলে ধরা হয়, এর অন্যতম কারন এখানকার মানুষের স্বাক্ষরতার হার অন্যান্য এলাকার চেয়ে কম। কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকাও তার বাইরে না। হাওর অঞ্চলে বহু মানুষের বাস, বছরের একটা বৃহৎ সময় অঞ্চলটি পানিতে নিমজ্জিত থাকে, বিচ্ছিন্ন থাকে অন্যান্য এলাকার থেকে। এবং এই নিমজ্জিত অঞ্চলের আয়তন অনেক বিশাল। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার মাইজচর ইউনিয়নের হাওরাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্যে ২০১১ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্পের (এসইএমডিপি) আওতায় সরকারি অর্থায়নে তিনতলা ভবনের এই মডেল উচ্চ বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়।

এরপর ২০১৩ সালে পুরোদমে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বিদ্যালয়টিকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে বানভাসিদের দুর্যোগকালীন কোনো আশ্রয়শিবির। চারদিকে থৈথৈ পানি। এর মধ্যেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি তিনতলা ভবন। যেন পানিতে ভাসছে ভবনটি। এই ভবনে যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা।

ভাসমান বিদ্যালয়

ভাসমান বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ। ছবি : সংগৃহীত


দূর থেকে আশ্রয়শিবির মনে হলেও এটি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এখানে নিয়মিতই চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হাজিরাও অন্য যেকোনো বিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি। বাজিতপুর উপজেলার মাইজচর ইউনিয়নের এই নয়নাভিরাম বিদ্যালয়টির নাম, বাহেরবালী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়ের চতুর্দিকে বছরের ৯ মাসই পানি জমে থাকে

এই বিদ্যালয়ের চতুর্দিকে বছরের ৯ মাসই পানি জমে থাকায় যাতায়াতের জন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই একটি নৌকার ব্যবস্থা রেখেছে। এভাবেই এই হাওর এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে বিদ্যালয়টি। ভবনটি দেখতেও দৃষ্টিনন্দন। হাওর অঞ্চল সম্প্রতি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণের স্থান হয়ে উঠেছে, আর এমন সুন্দর বিদ্যালয় সেই আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

স্কুল ভবন

তিনতলা ভবনটির নিচতলা পুরোটাই খালি, যা বছরের অধিকাংশ সময় হাওরের পানিতে তলিয়ে থাকে। একমাত্র দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। হাওরঘেঁষা এই প্রত্যন্ত জনপদে আর কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য এটিই হয়ে ওঠে শিক্ষার নির্ভরযোগ্য পাদপীঠ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ১৪টি সুপরিসর শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। বিদ্যালয়টিকে সাজানোও হয়েছে চমৎকারভাবে। ভবনের ছাদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শ্রমে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফুলের অসাধারণ বাগান।

ওপর থেকে দেখলে মনে হবে যেন সবুজের সমারোহ। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাসের অবসরে বিদ্যালয়ের এই ছাদবাগানে পড়াশোনা করে থাকে। স্কুলটিতে শিক্ষাদানের জন্যে রয়েছেন ৯ জন অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক, তাদের তত্ত্বাবধানে এবং অভিভাবকদের চেষ্টায় ও শিক্ষার্থীদের আপ্রাণচেষ্টায় বছরশেষে বিদ্যালয়ের ফলও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। হাওরবেষ্টিত বাহেরবালি, পুড়াকান্দা, আয়নারগোপ, শিবপুর ও বোয়ালী গ্রামের তিন শতাধিক ছেলেমেয়ে এখানে পড়াশোনা করছে।

বাহেরবালী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাসেম জানান, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য আরও অন্তত দুটি নৌকার ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমানো যেত। শিক্ষার্থীও বাড়ত। এছাড়া ছাদবাগানের চারপাশে রেলিং না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ছাদবাগানের চারপাশে রেলিং স্থাপনের ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

স্কুল ছুটির পর নৌকায় ভেসে ভেসে বাড়ি ফেরে শিশুরা

স্কুল ছুটির পর নৌকায় ভেসে ভেসে বাড়ি ফেরে শিশুরা। ছবি : সংগৃহীত


বিদ্যালয়টির বার্ষিক ফল সব সময়ই অনেক ভালো হয়। প্রতি বছর জেএসসিতে শতভাগ পাস করে থাকে। এসএসসিতে পাসের হার ৮০ শতাংশ। প্রত্যন্ত হাওরের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের এমন ফল তিনি যথেষ্ট ইতিবাচক মনে করেন বাজিতপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহজাহান সিরাজ জানান। বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কিশোরগঞ্জ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ভাসমান এই বিদ্যালয়টির সাফল্যে বিস্মিত। এর উন্নয়নে আরও অনেক কিছু করতে হবে বলে জানান তারা। বিদ্যালয়টির উন্নয়নে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা অব্যাহত রাখার ও তাগিদ দেন। এমন নয়নাভিরাম বিদ্যালয়টি ঘুরে আসতে যেতে হবে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে। 

 নাবিলা বুশরা   এস এম


Click Here To See More