২০০ বছরের পুরোনো চট্টগ্রামের বেলা বিস্কুট

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: 'গণি বেকারি'র ঐতিহ্যবাহী বেলা বিস্কুট


বেলা বিস্কুট

আমাদের অনেকের শৈশবের স্মৃতির সাথেই জড়িত আছে এই বিস্কুটটি; ছবি : সংগৃহীত


চট্টগ্রাম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বেলা বিস্কুটকে মনে করা হয় উপমহাদেশের প্রথম বিস্কুট। ২০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে চট্টগ্রামের গণি বেকারিতে প্রথম তৈরি হয়েছিল বেলা বিস্কুট। সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা বিকেলের আড্ডায় চায়ের সাথে বেলা বিস্কুটের বিকল্প নেই চট্টগ্রামবাসীর কাছে। আর এখন বেলা বিস্কুট শুধু চট্টগ্রাম বা চট্টলাবাসীদের কাছেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে।

চট্টগ্রামের চন্দনপুরা কলেজ রোডের 'গণি বেকারি'-তেই প্রথম তৈরি করা হয় ছিল ঐতিহ্যবাহী বেলা বিস্কুট। ঠিক কবে থেকে বেকারিতে বেলা বিস্কুটের যাত্রা শুরু তা আজ আর সঠিক করে জানা যায় না। তবে বলা হয়ে থাকে, মোঘল আমলের শেষদিকে ও ইংরেজ আমলের শুরুতে বেকারির সূচনা হয়।

ইতিহাস

আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তাঁর ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রিই প্রথম চট্টগ্রামে তথা উপমহাদেশে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা ঘটান। তবে বেলা বিস্কুট তৈরির কৃতিত্ব আব্দুল গণি'র। তিনি বাংলায় আসা পর্তুগিজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম বেলা বিস্কুটের প্রচলন ঘটান।

বংশপরম্পরায় ১৮৭৮ সালে বেকারি শিল্পে যুক্ত হন আবদুল গণি সওদাগর। সেই হিসেবে বেলা বিস্কুটের বয়স আজ ২০০ পেরিয়ে গেছে। প্রথমে বেকারিতে শুধুমাত্র রুটি তৈরি করা হলেও পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয় পাউরুটি, কেক আর বেলা বিস্কুট। বেলা বিস্কুট বর্তমানে রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ নানান দেশে।

জনপ্রিয়তা 

বেকারি শিল্পের জন্য ব্রিটিশ আমলেও চট্টগ্রামের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ছিল বিস্কুট। চা আর বিস্কুট সকালের নাস্তায় বা বিকালের আড্ডায় এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে খুব অল্প সময়েই তা শহর ছাপিয়ে গ্রামে-গঞ্জেও ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক আহমদ মমতাজের মতে পর্তুগীজদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা ধরণের বেকারি পণ্য। তাদের মাধ্যমেই চট্টগ্রামে ও চট্টলাবাসীর খাদ্যাভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে বেকারির খাবার।

বেকারি শিল্পের প্রসার ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। তখন সৈনিকদের খাদ্য গণি বেকারিতেই তৈরি করা হতো। সেসময় থেকে পাকিস্তান শাসনামল পর্যন্ত ১৭টি বেকারিতে বেলা বিস্কুট প্রস্তুত করা হতো। গণি বেলা বিস্কুটের বিশেষত্ব হলো এর রন্ধন প্রক্রিয়া। আধুনিকতা এসে প্রাচীনকে সরিয়ে দিলেও গণি বেকারিতে বেলা বিস্কুট আজো আগের রীতিতেই তৈরি হয়। মাটির তন্দুরে বিস্কুট বানালেই কেবল এর স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মান বজায় থাকে।

সাহিত্যেও জায়গা করে নিয়েছে চট্টলার বেলা বিস্কুট। কথাসাহিত্যিক আবুল ফজলের (১৯০৩-১৯৮৩), ইতিহাসবিদ আবদুল করিমের (১৯২৮-২০০৭) মতো মানুষদের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে বেলা বিস্কুটের কথা। আবুল ফজল তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, 'ঘুম থেকে উঠে পান্তাভাতের বদলে খাচ্ছি গরম-গরম চা বেলা কি কুকিজ নামক বিস্কুট দিয়ে। কুকিজ ইংরেজি নাম, বেলা কিন্তু খাস চাটগেঁয়ে।'

মেজবানের মতোই বেলা বিস্কুটও চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের অংশ। আর তাই ২০০ বছর পাড়ি দিয়ে ফেললেও এর জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি এখনও। চট্টলাবাসীদের বিকালের নাস্তায় তাই আজো শোভা পায় বেলা বিস্কুট। শুধু চট্টলাবাসী কেন, প্রবাসীরাও চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে যাবার সময়ে মনে করে সাথে বেলা বিস্কুট নিয়ে যান।


ইন্দিরা বিশ্বাস এস এম

তথ্যসূত্র:

https://www.sunnews24x7.com/news/article/


Click Here To See More