বৈশ্বিক ভ্রমণ পুনরায় চালু করতে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে ও কত সময় লাগবে?
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : তীব্র অর্থনৈতিক চাপে ভাইরাসের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেই সচল হচ্ছে দেশগুলো

করোনা ভাইরাস, এক মারণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের নাম যার বিধ্বংসী বিষ্ফোরণে টানা কয়েক মাস ধরে অচল হয়ে আছে পুরো বিশ্ব। সংক্রমণ ঠেকাতে লাগাতার লকডাউন দেয়া হয়েছে দেশগুলোতে, সীমান্ত বন্ধ করা হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় স্থবির। পর্যটন শিল্প একেবারেই থমকে গিয়েছে। প্রায় শত বছরেও বিশ্ব এমন দুর্যোগের সম্মুক্ষীন হয়নি বলা চলে। এর ভয়াবহ আঘাতে ধস নেমেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। সম্প্রতি কিছু দেশ মারণাত্মক ভাইরাসকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলে লকডাউন তুলে নিয়ে সামাজিক সম্পর্ক পুনস্থাপনের চেষ্টা করতে শুরু করে। আকাশপথ চালু করে, সীমান্ত খুলে দিয়েছে, স্থানীয় পর্যটকদের ওপর স্বাস্থ্যবিধি বহাল রেখে বিধিনিষেধ তুলে দিতে চেষ্টা করেছে। এমনকি অনেক দেশ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্যেও তাদের দ্বার খুলে দিতে শুরু করেছে। তবে, অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণের আরেকটি বিষ্ফোরণের আমদানি যাতে না হয় সেজন্য সচেতন দৃষ্টি রাখছে প্রবেশদ্বারগুলোতে, আরোপ করেছে কড়া স্বাস্থ্যবিধি।
বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অবস্থা :

এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া অন্য সব দেশের জন্যে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও ১৫ই মে থেকে একে অপরের মধ্যে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড তাদের নিজেদের মধ্যে ভ্রমণ পুনরুদ্ধার করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে ফিজি, ইসরায়েল এবং কোস্টারিকা যোগ দেয়ার দাবি করছে।
আরও জানতে : এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিনের বিখ্যাত কিছু জায়গা
বেইজিং বন্ধ থাকলেও চীনের অন্যান্য শহরগুলোতে কর্পোরেট চার্টার ফ্লাইটগুলোর চলছে। পর্যটকদের সাইপ্রাসে প্রবেশ করতে হলে সাথে রাখতে হবে কোভিড-১৯ পরীক্ষার নেগেটিভ রিপোর্ট। এছাড়া নানা প্রণোদনা দিয়ে সচল হচ্ছে দেশটির পর্যটন শিল্প।
আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সবসময়ই জাতি এবং মানুষের মধ্যে আস্থার এক স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তবে মহামারিতে সবকিছু বিষাক্ত হলে আকাশপথও নিষেধাজ্ঞায় পড়ে যায়। খুব শিঘ্রই এই ভাইরাস থেকে মুক্তি না মিললেও রোগটির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে, তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নানান হিসাব নিকাষ কষে দেশগুলো সম্পর্ক পুনঃর্নির্মাণ করতে শুরু করেছে।
আরও জানতে : কোন কোন দেশের সীমান্ত পর্যটকদের জন্যে পুনরায় খুলতে শুরু করেছে?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমন
ঝুঁকি এবং পুরষ্কারের হিসাবে পার্থক্য থাকতে পারে তবে, এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু দেশ ভ্রমণকারীদের জন্যে তাদের দরজা না খুলে দিয়ে পারছে না। যদিও তারা এখনও ভাইরাসটি নিয়ে তীব্র সংকটেই আছে। নানাণ স্থানের লোকদের জন্য তাদের দরজা খোলার নিরাপদ উপায় খুঁজতে হচ্ছে, কারন দেশটির অর্থনীতিতে বাণিজ্য ও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ উত্স। প্রতিটি দেশের জন্য মহামারি ও মনোবিদ্যা উভয়ই জড়িত। ব্যবসায়িক কিংবা আনন্দ উপভোগ, উভয় ভ্রমণের জন্যেই ভ্রমণকারীদের নিরাপদ বোধ করতে পর্যাপ্ত বিধিনিষেধ থাকতে হবে। তবে এসব বিধিনিষেধে যেন কেউ বিরক্ত না হয় সেই দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক স্কট টাস্কার বলেন, ‘আমরা সবাই আবার গতিশীল হব, তবে অন্যভাবে। এটি বিশ্বব্যাপী বিমান ও পর্যটন শিল্পে একটি মারাত্মক ধাক্কা, যা আমরা আগে কখনও দেখিনি’।আরও পড়ুন : জিল্যান্ডিয়া : প্রশান্ত মহাসাগরে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ

কি কি মানতে হবে
মাস্ক ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা, জ্বর মাপা, কন্টাক্ট-ট্রেসিং অ্যাপ্লিকেশন ভ্রমণকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলবে। স্বাস্থ্যকর জাতিগুলো, যাদের মৃত্যুর হার কম এবং সংক্রমণের হার ও কম তাদের নিয়ে বিশ্ব পুনরায় খুলে দেয়া একটি শিশুসুলভ পদক্ষেপ। বাল্টিক দেশগুলো প্রথমে গতিশীলতা আনে এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড একই পথ অনুসরণ করছে। ভ্রমণকারীরা যেন ১৪ দিনের বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারে এমন একটা সিস্টেম কার্যকর করতে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সীমান্ত সংস্থা, বিমানবন্দর, বিমান সংস্থা এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এক মাসেরও বেশি সময় ব্যয় করে চলেছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই সিস্টেমটি চালু করতে পারবে বলে তারা আশাবাদী।অকল্যান্ড বিমানবন্দর কর্মকর্তা মি. তাস্কার বলেন, সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে ভাইরাসটির স্থানীয় সংক্রমণ যতটা সম্ভব নির্মূলের কাছাকাছি রাখা। এর বাইরে, ভ্রমণকারীরা বুকিং থেকে শুরু করে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে নতুন প্রটোকল আশা করতে পারে। উভয় দেশের মধ্যে অবস্থানের ডেটা শেয়ার করতে অস্ট্রেলিয়ার করোনভাইরাস ট্র্যাকিং অ্যাপ্লিকেশন, কোভিডসেইফ (COVIDSafe) ব্যবহার করা যেতে পারে।

ইউরোপিয় দেশে নিষিদ্ধ অতিথির তালিকা
এদিকে, অনেক ইউরোপিয় দেশও নিষিদ্ধ অতিথির তালিকা দিতে শুরু করছে। উদাহরণস্বরূপ, ডেনমার্ক এবং নরওয়ে প্রতিবেশি দেশ সুইডেনকে বাদ দিয়ে ১৫ই জুন থেকে একে অপরের মধ্যে যোগাযোগ সচল করতে শুরু করেছে। সুইডেন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের শুরু থেকেই লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বকে গুরুত্ব না দেয়ায় সেখানে ভাইরাসটি ক্রমেই বিস্তার লাভ কড়ছে।আরও জানতে : করোনা আতঙ্কের মধ্যেই সুইডেন চলছে লকডাউন ছাড়াই
অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী এবং অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে ভ্রমণে কাজ করা গ্রুপের সহ-সভাপতি মার্গি ওসমান্ড জানান, ‘ভ্রমণ পুনরায় সচল করা আগের মতো মুক্ত প্রবাহ এবং স্বতঃস্ফূর্ত হবে না। আমি জানি না যে এটি আরও ব্যয়বহুল হবে কিনা। তবে এর অর্থ হবে এই যে, গড় ভ্রমণকারীকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে’। ভ্রমণের সাথে জড়িত অন্য সবাইকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশ্বের বেশিরভাগ ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোতে, যেগুলোর ৯০ শতাংশ বা তার বেশি ফ্লাইট হ্রাস পেয়েছিল সেগুলো ফের সচল হচ্ছে। সেখানের সমস্ত কর্মীরা এখন মাস্ক এবং গ্লোভস পরেন। দুবাইয়ের বিমানবন্দরের বিশাল মলে আগত সব যাত্রীকে থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্ক্যান করতে দেখা যায়। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহণ কেন্দ্রগুলোতেও এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিমান সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে, তারা খাদ্য এবং পানীয় পরিষেবা হ্রাস এবং সবার জন্য মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করেছে। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ভ্রমণকারীদের সাথে কী করা উচিত তা নিয়ে ক্ষুদ্র আকারের সহযোগিতাও শুরু করেছে বিমান সংস্থাগুলো।

জুনে, তাইওয়ানের কর্মকর্তা এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার অংশ হিসাবে ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক সান ফ্রান্সিসকো থেকে তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেইতে যাবেন। যাত্রীদের আরোহণের আগে ভাইরাসটির পরীক্ষা করা হবে এবং পৌঁছনোর তিন, পাঁচ, সাত, ১০ এবং ১৪ দিনেও পরীক্ষা করা হবে। এর মাধ্যমে গবেষকরা যাচাই করে দেখবেন যে ঠিক কোন দিনে সর্বাধিক শনাক্ত হয়। বর্তমানে প্রচলিত ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনকে সংক্ষিপ্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এই গবেষণা চালানো হবে।
স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনে ফলাফল এবং প্রতিরোধ, সেন্টার ফর পলিসির পরিচালক ড জেসন ওয়াং বলেন, ‘সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হ'ল যাত্রীরা যেন ফের আকাশ ভ্রমণকে নিরাপদ বোধ করে এবং যে সমস্ত দেশ ভ্রমণকারীদের এমনটা অনুভব করাতে তাদের সীমান্ত রক্ষায় তাদের গ্রহণ করেছে, তারা একটি ভাল কাজ করেছে।’ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ সাধারণ পদচারণার গতি ফিরে আসার প্রত্যাশা করলে বিশেষজ্ঞরা অবাক হবেন না। নিউইয়র্কের বিনিয়োগকারী ব্যাংক কোওয়েনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিনিয়র এয়ারলাইন বিশ্লেষক হেলেন বেকার বলেন, ‘আমরা মনে করি আগামী দুই থেকে তিন বছরে স্বল্প-দূরত্বে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসবে, তবে দীর্ঘ দূরত্বের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে পাঁচ থেকে সাত বছর লাগবে’।

এমনকি এটি আশাবাদী হতে পারে। সিসিলি এবং জাপানের মতো ভ্রমণকারীদের নিকট আগ্রহের শীর্ষের জায়গাগুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিমান চালনা বা ভর্তুকির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তবে মাস্ক পরে এই দীর্ঘযাত্রার ফ্লাইটের জন্য আবেদন সীমিত।
আরও জানতে : অস্ট্রেলিয়ার সুন্দরতম কিছু ক্যাসেল
কর্পোরেট ভ্রমণে পুরনো অভ্যাসগুলো অবশেষে ফিরে আসবে, তবে কেবল নতুন নিয়ম এবং স্থিতিশীলতার উদ্ভবের পরে, বলে জানান জেট ব্লুয়ের প্রাক্তন প্রধান নির্বাহী ডেভিড বার্গার। তার মতে, ‘আপনি যদি সেই ব্যক্তি হন যিনি প্রচুর ভ্রমণ করেন তাহলে আপনি ভবিষ্যদ্বাণী চাচ্ছেন। নিশ্চিত হওয়া অবধি আপনাকে লোকেরা বলবে, আমি জুম কল করব, বা বছরে ছয়টি ট্রিপের পরিবর্তে আমি দু'বার ভ্রমণ করব'।

তাই দূরবর্তী ভ্রমণ এখনই স্বাভাবিক হচ্ছেনা। আপাতত বাড়ির কাছাকাছি ট্রিপ থেকেই পর্যটনের প্রত্যাবর্তন শুরু হবে, গাড়িতে। অদূর ভবিষ্যতে ভ্রমণকারীদের মধ্যে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আগের মতো স্বাভাবিক হবেনা বলেই গবেষকদের ধারণা। এই মধ্যবর্তী সময়ে ভ্রমণকারীরা সেই ৭০ এর দশকে ফিরে যাবে। স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে গাড়ি করে ছুটে যাবে পরিবার, ব্যাক সিটে বসে বাচ্চারা জিজ্ঞেস করবে, ‘আমরা কী এখনও সেখানেই আছি?’ নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ গ্রাহক এবং উচ্চমূল্যের দর্শনার্থীদের সেবা প্রদানের জন্য উত্সাহিত করতে এবং পর্যটন পুনর্নির্মাণের জন্য অর্থ সরকারিভাবে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। এদিকে, বিশ্বে বিলাসবহুল ভ্রমণের জন্যে পরিচিত ক্রুজ জাহাজের অতীত চিত্র ফিরে আসতে শুরু করেছে, যা করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারনে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তারা বোর্ডে থাকা প্রত্যেকের মধ্যে ব্যবধান বাড়ানোর মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে চেষ্টা করছে।

শুরুতে স্থানীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দিকে নজর দেয়ার মাধ্যমে দেশগুলো তাদের এই শিল্পকে গতিশীল করতে শুরু করেছে। আর এজন্য স্থানীয় সংস্থাগুলোকে অনেক দেশ বরাদ্দ ও দিচ্ছে। এখনই আন্তর্জাতিক ভ্রমণ স্বাভাবিক হচ্ছে না যেহেতু তাই ভ্রমণকে স্বাভাবিক রাখতে এই ব্যবস্থা। এর সাথে আন্তর্জাতিক ট্রাভেল সংস্থা, বিমান সংস্থা এবং পর্যটন শিল্পে জড়িতরা ভ্রমণকারীদের নিরাপদ বোধ করার জন্যে যাবতীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
নাবিলা বুশরা এস এম