চাও ফ্রায়া নদী তীরের রঙ্গিন শহরটি এশিয়ার অন্যতম প্রধান ভ্রমণ গন্তব্য

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : 'ওয়াট ফো' নামক একটি ঐতিহাসিক মন্দির থেকেই থাই ম্যাসাজের উৎপত্তি

চাও ফ্রায়া নদী তীরের ব্যাংকক শহর চাও ফ্রায়া নদী তীরের ব্যাংকক শহর। ছবি : এয়ার ফ্রান্স

শ্যামদেশের রাজধানী ব্যাংকক। দুনিয়াজুড়ে এই শহরের খ্যাতি ছড়ানো রয়েছে পর্যটকদের মুখে মুখে। থাই ম্যাসাজ হোক, আর থাই রেস্তোরাঁর স্বাদ মুখে লেগে থাকা খাবারই হোক, অথবা নজরকাড়া বৌদ্ধ-মন্দিরের জন্যেই হোক, প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটককে বিমোহিত করে রেখেছে আধুনিক দুনিয়ার এক জ্বলজ্বলে প্রতিকৃতি এই ব্যাংকক শহর। সভ্যতা আর সংস্কৃতির উৎকর্ষতায় স্থান পাওয়া ভুবনমোহিনী এই ব্যাংকক শহর ভ্রমণ সম্পর্কে চলুন দুটি কথা জেনে আসা যাক। শ্যামদেশ বা থাইল্যান্ডের রাজধানী শহর এই 'ব্যাংকক' থাইল্যান্ডের অধিক জনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে একটি। মধ্য থাইল্যান্ডের  চাও ফ্রেয়া নদীর ব-দ্বীপে ১৫৬৮ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার স্থানজুড়ে অবস্থিত এই শহরটি থাই ভাষায় 'ক্রুং থেপ মহা নাখন' অথবা শুধু 'ক্রুং থেপ' নামে পরিচিত। থাই ভাষার এই নাম থেকে কিভাবে 'ব্যাংকক' নামের উৎপত্তি হয়েছে তা সুস্পষ্ট নয়।

আকাশছোয়া দালানের রাজধানী শহর ব্যাংকক, থাইল্যান্ড, ছবিঃ অরেঞ্জ ফেয়ার ডট কম আকাশছোয়া দালানের রাজধানী শহর ব্যাংকক, থাইল্যান্ড, ছবি : অরেঞ্জ ফেয়ার ডট কম

'ব্যাং' একটি থাই শব্দ যার অর্থ 'স্রোতের ওপর একটি গ্রাম'। ধারণা করা হয়, নামটি 'ব্যাং কোহ' থেকে উদ্ভূত হয়েছে। 'কোহ' অর্থ 'দ্বীপ', যা শহরের জলাভূমিরূপ বৈশিষ্ট্য কিংবা চাও ফ্রায়া নদীমুখের কাছে এর অবস্থান থেকে এসেছে। অন্য মত অনুযায়ী, এটি 'ব্যাং মাকোক' এর সংক্ষিপ্তরূপ। মাকোক বলতে 'ইলিওকারপাস হাইগ্রোফিলাস' জাতীয় উদ্ভিদকে বুঝায় যা জলপাই সদৃশ ফল দেয়।

মূলত ওয়াট মাকোক নামক একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের নামও এই মতের সাথে সমর্থিত, যা বর্তমানে 'ওয়াট আরুণ' নামে পরিচিত। আধুনিক শহর এই ব্যাংককের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ পুরানো। পঞ্চদশ শতাব্দীতে 'আয়ুথাইয়া সম্রাজ্য'কালে ব্যাংকক চাও ফ্রায়ার তীরে অবস্থিত একটা ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। কৌশলগত অবস্থানের কারণে সময়ের সাথে শহরটি বেড়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে যথাক্রমে দু'টি রাজধানী শহর ১৭৬৮ সালে 'থনবুড়ি' এবং ১৭৮২ সালে 'রতনাকোসিন'-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।

ব্যাংককের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বীনি চাও ফ্রায়া, ছবিঃ এয়ার বি এন বি ডট কম ব্যাংককের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতস্বীনি চাও ফ্রায়া, ছবি : এয়ারবিএনবি ডট কম

উনবিংশ শতাব্দীতে শ্যামদেশ আধুনিকীকরণের প্রাণকেন্দ্র এবং বিংশ শতাব্দীতে থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহর। দেশটি তৎকালে রাজতন্ত্রকে বাতিল করে সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা জারি করে যার ফলে অসংখ্য অভ্যুত্থান ও বিদ্রোহের মত ঘটনা ঘটে, যার নেপথ্যে ছিল এই শহর এবং এই শহরের মানুষ। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশকের মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাংককের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে এবং শহরটি বর্তমান সময়ে থাইল্যান্ডের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে এশীয় বিনিয়োগের উত্থানকালে অনেক বহুজাতিক কর্পোরেশন ব্যাংককে তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে যার কারণে বর্তমানে আর্থিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ব্যাংকক একটি আঞ্চলিক শক্তির নাম রূপে আবির্ভূত হয়েছে।ওয়াট ফো বৌদ্ধমন্দিরে গৌতম বুদ্ধের শায়িত মূর্তি, ছবিঃ বুদ্ধিস্ট কালচার ওয়াট ফো বৌদ্ধমন্দিরে গৌতম বুদ্ধের শায়িত মূর্তি, ছবি: অরেঞ্জ ওয়ে ফেরার

রঙ্গিন শহর নামে পরিচিত এই ব্যাংককে রয়েছে দর্শনীয় বিভিন্ন স্থানের এক সমারোহ যা যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপিপাসু পর্যটকগণকে আকর্ষণ করে চলেছে। ব্যাংককের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় 'গ্র্যান্ড প্যালেস'-এর কথা। থাইল্যান্ডের অন্যতম  দর্শকপ্রিয় এই স্থানের অবস্থান চাও ফ্রায়া নদীর তীরে যে কারণে এখানে যেতে হয় নৌকার মাধ্যমে।

বিশাল এই 'গ্র্যান্ড প্যালেস' মূলত একটি রাজবাড়ি যা ১৭৮২ সাল থেকে থাইল্যান্ডের রাজা এবং রয়্যাল কোর্টের সরকারি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গ্র্যান্ড প্যালেসের ভেতরে রয়েছে 'ওয়াট ফ্রো কাইয়ো' নামক এক বৌদ্ধ মন্দির। বিশেষ ধরণের গাড় সবুজ বর্ণের এই মন্দির ব্যাংকক বাসীদের নিকট সবথেকে পবিত্র মন্দির হিসেবে পরিচিত যা একই সাথে অন্যতম পর্যটক আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। গ্র্যান্ড প্যালেসের ঠিক বিপরীতে চাও ফ্রায়ার অপর পাড়জুড়ে রয়েছে 'ওয়াট অরুণ' অথবা 'দ্যা টেম্পল অফ ডন'। চোখ ধাঁধানো এই সুবিশাল মন্দিরের স্থাপনাগুলোর ওপরে সকালের সূর্যকিরণ এসে প্রতিফলিত হয়ে অপরূপ এক মোহিনীমোহন সৌন্দর্যের অবতারণা করে যার কারণেই এই মন্দিরের নাম হয়েছে 'দ্য টেম্পল অফ ডন'

গ্র্যান্ড প্যালেসের ঠিক বিপরীতে চাও ফ্রায়ার অপর পাড়জুড়ে রয়েছে 'ওয়াট অরুণ' অথবা 'দ্যা টেম্পল অফ ডন' গ্র্যান্ড প্যালেসের ঠিক বিপরীতে চাও ফ্রায়ার অপর পাড়জুড়ে রয়েছে 'ওয়াট অরুণ' অথবা 'দ্যা টেম্পল অফ ডন'। ছবি : উইকিপিডিয়া

 থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেট কিংবা ভাসমান বাজারের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ব্যাংককের ফ্লোটিং মার্কেট দেখার জন্যে সারা দুনিয়া থেকে পর্যটকগণ এখানে ভিড় জমান। সুন্দর করে সাজানো কাঠের নৌকায় পসরা সাজিয়ে ভিড় করেন বিক্রেতারা, ক্রেতা-বিক্রেতার দামাদামিতে, কথায় কথায় জমে উঠে এই ভাসমান বাজার। কেউবা কেনাকাটার উদ্দেশ্যে আসলেও অনেকেরই উদ্দেশ্য থাকে শুধুমাত্র এই মার্কেট দেখা। থাইল্যান্ডের নামকরা একটি ফ্লোটিং মার্কেট 'খলোং লাট মায়োম' মার্কেটের অবস্থান এই ব্যাংককেই। ফ্লোটিং মার্কেটের মতই আরও একটি থাই ট্রেডমার্ক হচ্ছে থাই ম্যাসাজ। ব্যাংককের প্রায় সব রাস্তাতেই থাই ম্যাসাজ করার সুযোগ রয়েছে। ধারণা করা হয়, 'ওয়াট ফো' নামক একটি ঐতিহাসিক মন্দির থেকেই এই ম্যাসাজের উৎপত্তি হয়। এই ওয়াট ফ তে রয়েছে শায়িত বৌদ্ধমূর্তি যা পুরো থাইল্যান্ডের অন্যতম বিশাল মূর্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জগতজোড়া বিখ্যাত ব্যাংককের ফ্লোটিং মার্কেট, ছবিঃ অরেঞ্জ ফেয়ার ডট কম জগতজোড়া বিখ্যাত ব্যাংককের ফ্লোটিং মার্কেট, ছবি : অরেঞ্জ ফেয়ার ডট কম

 ব্যস্ত এই রাজধানী শহরের ইট কাঠ পাথরের স্থাপনার মধ্যেও রয়েছে 'লুম্বিনি পার্ক' নামক এক সবুজের সমারোহ, যাকে ব্যাংককের ফুসফুস হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ, গাছের কোমল ছায়া এবং টলটলে স্বচ্ছ জলের লেক মন ভালো করে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। এই স্থাপনাগুলো বাদেও ব্যাংকক শহরে ভ্রমণপিপাসুদের জন্যে আরও কিছু স্থান রয়েছে যেগুলোর মধ্যে চায়না টাউন/ইওওয়ারাট রোড, ব্যাংকক জাতীয় জাদুঘর, ব্যাংকক সাফারি ওয়ার্ল্ড, চাটুচাক উইকলি মার্কেট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ভ্রমণ, খাওয়া-দাওয়া আর কেনাকাটা এই তিনটা জিনিস যেন একে-অন্যের সাথে অবিচ্ছ্যেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ভ্রমণের জন্যে যেমন ব্যাংকক নাম লিখিয়েছে পর্যটকপ্রিয় গন্তব্যের তালিকায়, ঠিক তেমনই এই শহর এগিয়ে আছে পছন্দসই শপিং এবং বিশাল এক বিচিত্র খাদ্য ভাণ্ডারের সমারোহে। খাবার নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের সবরকমের সুযোগসুবিধাই পাওয়া যাবে এই ব্যাংকক শহরে। বিশ্বখ্যাত কেএফসি এবং ম্যাকডোনাল্ডের আউটলেট থাকলেও স্থানীয় থাই এবং চায়নিজ খাবারের জন্যে সবথেকে যে স্থানটি বিখ্যাত সেটি হচ্ছে 'চায়না টাউন'।

ব্যাংককের সুস্বাদু স্ট্রীটফুড, ছবিঃ লাইট স্ট্রিট ডট কম ব্যাংককের সুস্বাদু স্ট্রীটফুড, ছবিঃ লাইট স্ট্রিট ডট কম

 এখানকার গ্রিলড প্রন উইথ গ্লাস নুডলস, টম ইয়াং কুং, স্টিম রাইস উইথ গ্রিনহোল পিপারকর্ণ, প্লা পাও, খাও মুন গাই, ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস, কোকোনাট আইসক্রিম ইত্যাদি সব খাবারের স্বাদই মুখে লেগে থাকার মত। ব্যাংকক গিয়ে এসব মুখরোচক খাবারের স্বাদ নিয়ে না আসতে পারলে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

এসবের বাইরেও ফলের মধ্যে রয়েছে রোজ অ্যাপেল, ম্যাঙ্গোস্টিন ইত্যাদি। এছাড়াও সিয়াম প্যারাগন থেকে স্কাই ট্রেনে উঠে বিভিন্ন স্টেশনে দেখা মিলবে একেবারে বাঙালি রেস্টুরেন্ট সমূহের, যেখানে পাওয়া যাবে ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালি খাবার। ঐতিহ্য এবং উৎসবের শহর এই ব্যাংকক। এপ্রিল মাসের দিকে এখানে বসে 'সংরান' নামক উৎসবের আসর। অনেকটা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দোল উৎসবের মতই এই উৎসবে রঙের বদলে ছিটানো হয় পানি। আধুনিক ব্যাংকক ঘেরা রয়েছে আকাশছোঁয়া সব একেকটা ভবনে। একদিকে যেমন প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির, অন্যদিকে বহুতল এসব ভবন, এ যেন ব্যাংককের দ্বৈত সত্ত্বারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। স্থল ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে ককটেল হাতে পুরা ব্যাংকককে সাক্ষী রেখে সূর্যাস্ত দেখার জন্যে, কিংবা ফ্লোটিং মার্কেটে দরদাম করে জিনিস কেনার জন্যে, অথবা খাও সান রোডের উন্মুক্ত 'মুয়ে থাই' উপভোগ করার জন্যে হলেও আসতেই হবে এই প্রিয়তমা ব্যাংকক শহরে।মন্দিরে ভরা রঙ্গিন শহর ব্যাংকক, ছবি মন্দিরে ভরা রঙ্গিন শহর ব্যাংকক, ছবি : ব্যাংককএট্রাকশনস ডট কম


 কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে ব্যাংকক যাওয়ার বেশ কিছু এয়ারলাইন্স রয়েছে, যার মধ্যে এয়ার এশিয়া, লায়ন থাই এয়ার, নক এয়ার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়াও চিটাগাং শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকেও থাইল্যান্ডগামী বিমান ছেড়ে যায়। থাইল্যান্ডগামী বিমানগুলো ব্যাংককের 'ডন মুয়ান' অথবা 'সুবর্ণভূমি' বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে। ব্যাংকক ঘুরে দেখার জন্যে আগে থেকে হোটেল অথবা ট্যুর প্যাকেজ বুক করে নিলে স্বল্প খরচে ঘুরা সম্ভব।