পাহাড় আর সমুদ্রের সৌন্দর্যের নগরী চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আতিথেয়তার জন্যও বিখ্যাত। চট্টগ্রামের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে চেয়ে যেই খাবারের আবদার সবাই করে তা এক কথায় মেজবান। মেজবান বলতে গেলে খাবার কম, খাবারের উৎসবই বেশি।
উৎসব ও নয় বরং চট্টগ্রামের ঐতিহ্য মেজবান।
প্রথমেই আসি মেজবানের নামকরণ প্রসঙ্গে। মেজবান একটি ফারসি শব্দ। যার অর্থ নিমন্ত্রণকর্তা। 'মেজমান' থেকে 'মেজবান' শব্দটি রূপ নিয়েছে। ১৫০০ এবং ১৬০০ শতাব্দীর পুঁথিতে 'মেজোয়ানি' শব্দটি পাওয়া যায়। মেজোয়ানি শব্দটির অর্থ আপ্যায়নকারী আর মেজমান শব্দটির অর্থ আপ্যায়ন। আমরা চট্টগ্রামের মানুষরা অতিথিপরায়ণ হিসেবে বেশ খ্যাত। মেজবান যে আমাদের ঐতিহ্য হবে সেটা তো বলাই বাহুল্য।
মেজবান হচ্ছে তাই আপ্যায়ক এবং মেজবানি হচ্ছে যাদেরকে আপ্যায়ন করা হচ্ছে তাদের জন্য ভোজের ব্যবস্থা। উইকিপিডিয়ার মতে এই হলো মেজবান শব্দের উৎপত্তির পিছনের কাহিনী। শুদ্ধ ভাষায় একে মেজবান বললেও আমাদের চট্টগ্রামের ভাষায় সেটি হচ্ছে, 'মেজ্জান'।
মেজবান কি সবসময় হয়? বা বিশেষ কোন উপলক্ষে? হ্যাঁ অবশ্যই। চট্টগ্রামের মানুষ যেকোনো উপলক্ষ পেলেই তার আশেপাশের মানুষকে আপ্যায়ন করতে ভালোবাসে। আর আপ্যায়ন করতে মেজবানের তো জুড়ি নেই।
কারও মৃত্যুর পর কুলখানি, মৃত্যুবার্ষিকী, শিশুর জন্মের পর আকিকা, জন্মদিবস উপলক্ষে, ব্যক্তিগত সাফল্য, নতুন কোনও ব্যবসা আরম্ভ, নতুন বাড়িতে প্রবেশ, পরিবারে আকাঙ্ক্ষিত শিশুর জন্ম, বিবাহ, খাৎনা, মেয়েদের কান ছেদন এবং ধর্মীয় ব্যক্তির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সুযোগ পেলেই মেজবানির আয়োজন করা হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট উপলক্ষ ছাড়া বা কোনও শুভ ঘটনার জন্যও মেজবান করা হয়।
বাবুর্চিরা মেজবানি রান্নায় ব্যস্ত; ছবি : উইকিপিডিয়া
মেজবান অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ সাধারণত প্রতিবেশীদের এবং আশপাশের লোকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে শহরাঞ্চলে নিমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে অতিথিদের মাঝে বিলি করা হয়। তবে অধিকাংশ সময়ই মেজবানের নির্দিষ্ট অতিথির সীমা থাকেনা। যেকেউই যেকোনো সময় এসে পেটপুরে খেয়ে যেতে পারে মেজবান।
একই টেবিলে বসে, একই শামিয়ানার নিচে ধনী-গরীব, ছোট বড় সবাই মিলে খায়। যেহেতু চট্টগ্রামের মানুষ ধর্ম-পরায়ণ তাই মহিলাদের জন্যও থাকে আলাদা ব্যবস্থা। অতিথির আপ্যায়নে আয়োজক কখনো পিছপা হননা।
এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তো অতিথিদের হাত ধোয়ার জন্যও গরম পানি আর লেবুর ব্যবস্থা করা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে মেজবানি অনুষ্ঠান সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে, তবে আধুনিক কালে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্তও ভোজনের উৎসব চলতে দেখা যায়। মাঝেমাঝে মেজবানের আগের দিনও চলে আগ-দাওয়াতি বা মেজবানের প্রস্তুতি মূলক দাওয়াত।আগের দিন রাত থেকেই শুরু হয় মসলা-বাটাসহ সকল আয়োজন, পান খেতে খেতে আর গল্পের ছলে কখন যে ভোরের আলো ফুটে খেয়ালই থাকেনা।
মেজবানের প্রধান আকর্ষণ খাওয়াদাওয়ায় চলে আসি। পোলাও কিংবা বিরিয়ানি নয় বরং ধোয়া ওঠা সাদা গরম ভাতের সাথেই পরিবেশিত হয় গরুর মাংস। গরুর মাংসকে বলে গোশতো। এই গরুর গোশতো অবশ্য নির্দিষ্ট অংশের নয় বরং মাংস, হাড়, কলিজা সবকিছুরই মিশ্রণ থাকে এতে। গরুর মাংসের সাথে গরুর পায়ের হাড়ের ঝোল (চট্টগ্রামের ভাষায় 'নলা কাজি' বলা হয়) ও বুটের ডাল পরিবেশন করা হয়।
মেজবানের অন্যতম অনুষঙ্গ ডাল; ছবি : রোর মিডিয়া
রন্ধন প্রণালী
কিছু ক্ষেত্রে মাছ ও মুরগির মাংসও পরিবেশন করতে দেখা যায়। মেজবানের গরুর মাংসের স্বাদ এর খ্যাতির কারণ। মেজবানে রান্নার একটি বিশিষ্ট শৈলী রয়েছে সাথে রয়েছে নির্দিষ্ট রন্ধন প্রণালী। যেখানে সঠিকভাবে মেজবানি মাংসেরে পরিমাণের একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা দাবি করে; উদাহরণস্বরূপ মরিচ ও মসলা সহযোগে রান্না করা ঝাল গরুর মাংশ। গরুর নলা দিয়ে কম ঝাল, মসলা সহযোগে রান্না করা শুরুয়া বা কাঁজি, যা নিহারী কাঁজি নামে পরিচিত।
মাষকলাই ভেজে খোসা ছাড়িয়ে ঢেঁকিতে বা মেশিনে গুড়ো করে এক ধরনের ডাল রান্না করা হয় যাকে ঘুনা বা ভুনা ডাল বলে; কলাই ডালের পরিবর্তে বুটের ডালের সাথে গরুর হাঁড়, চর্বি ও মাংস দিয়ে হালকা ঝালযুক্ত খাবার তৈরি করা হয়। মেজবানি রান্নার জন্য আসলে পাতিল থেকে শুরু করে মসলা কিংবা বাবুর্চি সবই আলাদা।
কম পরিমাণে নয় বরং মণ মণ মাংশ চড়ানো হয় চুলোয়। মসলাও হয় একদম আলাদা যা মেজবানের মূল সিক্রেট, এমনকি ব্যবহৃত হয় সরিষার তেল। আর নির্দিষ্ট বাবুর্চি ছাড়া মেজবান রান্না কিন্তু যাকে তাকে দিয়ে হয়না। আর হলেও সেই স্বর্গীয় স্বাদ পাওয়া যায়না।
মেজবান শুধু খাবার না,চট্টগ্রামবাসীর জন্য মেজবান হলো আবেগ। তাইতো মানুষের মনের পাশাপাশি চট্টগ্রামের সাহিত্যেও স্থান পেয়েছে মেজবান :
"কালামন্যা ধলামন্যা
আনের আদা জিরা ধন্যা
আর ন লাগে ইলিশ-ঘন্যা
গরু-খাসি বুটর ডাইলর
বস্তা দেখা যায়-
মেজবানি খাতি আয়..."
তাই কোন চাঁটগাইয়া বন্ধু যদি নাও থাকে মেজ্জাইনা বাড়ি, মেজ্জান খাইলে আইয়ুনসহ রেস্টুরেন্টে পাবেন আপনার রসনা বিলাসের সুযোগ। আর একবার মেজবান এর স্বাদ নিয়ে নিলে সারাজীবনের মত শুধু জিহবায়ই না মনের মধ্যেও গেঁথে থাকবে এর স্বাদ।