জয়পুরহাটের ঐতিহ্যবাহী লকমা রাজবাড়ি
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : লকমা রাজবাড়ি

আজ তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ির কথা জানাবো। লকমা রাজবাড়ি এই জমিদার বাড়িটির নাম। জয়পুরহাটের এই লকমা রাজবাড়ি প্রাচীন সেই জমিদারি ইতিহাসকে ধারণ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিচিহ্ন হয়ে। উত্তরবঙ্গের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা জয়পুরহাট। আর এই জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার কড়াই গ্রামে লকমা জমিদার বাড়িটি আজো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে ভারত সীমান্তবর্তী স্থানে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি অনেকটা বিলীন হবার পথে হলেও এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব রয়েছে অনেক। এই জমিদার বাড়িটি স্থানীয়দের মাঝে চৌধুরী বাড়ি নামেও ব্যাপক পরিচিত।
লকমা রাজবাড়ি
ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়িটি ধ্বংস-প্রায় অবস্থায় এসে গেলেও এর অনিন্দ্য সৌন্দর্য খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। সময়ের কষাঘাতেও এটি রূপশোভা বিস্তার করে কালের নিদর্শন হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে । প্রায় ১৫ একর জমির ওপর জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সীমান্তঘেঁষা এই জমিদার বাড়ির উত্তরাংশে ভারত সীমান্ত। পশ্চিমবঙ্গের জামালপুর, সতনা, চেঙ্গেসপুর, শিয়ালা, মজাতপুর, মথুরাপুর, শালপাড়া এবং বাংলাদেশের জয়পুরহাট ও পাঁচবিবির অংশ নিয়ে এই জমিদার বাড়ি বিস্তৃত ছিল। এখন ভারতীয় এলাকায় পড়েছে খিড়কির পুকুর, স্কুল হাট, জমিদার বাড়ির উপর নির্ভরশীল কিছু বসতি। জমিদার বাড়িটি কবে নির্মাণ করা হয়েছিল তার একদম সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও অনেকেই ধারণা প্রায় চার-পাঁচশত বছর আগে জমিদার হাদী মামুন চৌধুরী এটি নির্মাণ করেছিলেন। লকমা গ্রামে জমিদার হাদি মামুন জমিদারি শাসন শুরু করার পর নওগাঁ জেলার পশরার জমিদার তনয়াকে বিয়ে করেন।একসময় এই জমিদার বাড়িটি তার প্রতাপ-প্রতিপত্তিতে ছিল অতুলনীয়। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদার বাড়ির ছিল ঝলমলে অতীত। সময়ের সাথে হারিয়ে যাওয়া জাঁকজমকের ছোঁয়া এখনো এর অবকাঠামোতে খুঁজে পাওয়া যায়। এই বাড়িটিতে রয়েছে ২৫- ৩০টি কক্ষ। যার ভেতরে আরও ছোটো ছোটো কামরা দেখতে পাওয়া যায়। অনেকটা কুঠুরির মত। চুন, সুরকি ও চ্যাপ্টা ইট দিয়ে তিন তলা এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। একসময় এখানে হাতিশালা, ঘোড়াশাল, কাচারিবাড়ি সবই ছিল। এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাওয়ার জন্য ছিল পথ। স্বাভাবিক দরজা ছাড়াও এখানে দেখতে পাওয়া যায় ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ চোরা দরজা। মূল ভবনটির সাথে লাগোয়া চন্দ্রাকৃতির ছাদের ঘর আছে। এটি বেশ লম্বা। এটি মূলত সুড়ঙ্গ ছিল। লোকমুখে শোনা যায়, এই জমিদার বাড়ির মেয়েরা কারও সামনে আসতো না।
লকমা রাজবাড়ি
জমিদার বাড়ির কাছেই চমৎকার দেয়ালঘেরা পুকুর ছিল। বাড়ির মেয়েরা মূল ভবন থেকে এই সুরঙ্গ পথেই পুকুরে যেত এবং নৌকা ভ্রমণ করত। এই সুড়ঙ্গের এখন আর অস্তিত্ব নেই। বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণে পুকুর পাড়ে দেখতে পাবেন কাছারি বাড়ি। এই কাছারি বাড়িটি বর্তমানে বেশ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এই জমিদার বাড়ির পশ্চিমে নতুন কবরস্থান তৈরি করা হয়েছে। আগের মসজিদের জায়গায় নতুন মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদটিতে নিয়মিত নামায আদায় করা হয়। এই জমিদার বাড়িকে ঘিরে নানান কিংবদন্তি রয়েছে। লোকমুখে শোনা যায় নানান কাহিনী। একসময় জমিদার বাড়িতে নিয়মিত বিচার সালিশ বসত। জনশ্রুতি আছে, জমিদার যদি কারও ওপর রুষ্ট হতেন তাহলে তার কপালে জুটত গুপ্তকুঠির নির্যাতন।এসব নির্যাতনের নানা কাহিনী এখনও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়। বিভিন্ন উৎসব ও পার্বণে জমিদারের আয়োজনে এখানে বিরাট মেলা বসত। মেলায় বসত পালা গানের আসর। এছাড়াও মেলায় পাওয়া যেত বিভিন্ন রকমের সুদৃশ্য মাটির তৈজসপত্র। এসব মাটির তৈজসপত্রে এলাকার বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রবাদ বচন লেখা থাকত, শিশুদের খেলনা ও হাঁড়ি-পাতিলে, সরার গায়ে আঁকা হতো নানা ধরনের বর্ণিল ছবি। এই মেলায় দূর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন এলাকার লোকজন এসে যোগ দিত। আর মেতে উঠত উৎসব-আনন্দে। জমিদার প্রথা বিলোপের পর এই বাড়ির জমিদারির অবসান ঘটে। আর এই পরিবারের সদস্যরা অন্যান্য জায়গায় বসতি স্থাপন করে এই স্থান ছেড়ে চলে যান।
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে শ্যামলী, হানিফ, কেয়া, এস আরসহ বেশ কিছু পরিবহণের বাসে করে আপনি জয়পুরহাট যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। পাঁচবিবি শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দুরে এই জমিদার বাড়িটি অবস্থিত। পাঁচবিবি থেকে টেম্পু, রিক্সা অথবা ভ্যানে করে সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন লকমা রাজবাড়িতে।আরো পড়ুন ঃ ভ্রমণ কেন শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও সুখী-সমৃদ্ধ জীবনে অত্যাবশ্যকীয়?
ফেসবুক পেইজঃ ট্রাভেল বাংলাদেশ
রুবাইদা আক্তার এস এম