লাংটাং, নেপাল : ট্রেকারদের জন্যে বৈচিত্র্যময় পরিবেশের জনপ্রিয় ট্রেকিং স্থান

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো সৌন্দর্য আর রোমাঞ্চকর স্পট



জনপ্রিয় ট্রেকিং স্থান লাংটাং-এর শীর্ষদেশ। ছবি : কিমকিম ডট কম
ট্রেকিং-এর সাথে পরিচয় থাকলে লাংটাং শব্দটা আপনার কাছে বেশ পরিচিত হবার কথা। বেশ লম্বা একটা সময় ধরে ট্রেকারদের জন্য লাংটাং ট্রেকিং খুবই আকাঙ্ক্ষিত এক সফর হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এভারেস্ট আর অন্নপূর্ণা ট্রেকিং বাদ দিলে নেপাল তো বটেই সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেকিং রুটের একটি এই লাংটাং ট্রেকিং। তবে, বর্তমানে লাংটাং ট্রেকিং-এর চেয়েও বেশি পরিচিত হৃদয়বিদারক এক পরিণতির জন্যে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পে লাংটাং ও এর আশেপাশে ব্যাপক ভূমিধ্বস হলে এর মূল গ্রামটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আশপাশের কিছু গ্রাম রক্ষা পেলেও ৮,০০০ মিটার উঁচুতে থাকা লাংটাং ট্রেকিং-এর সবোর্চ্চ চুড়াটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। পাথর আর বরফের বিশাল স্তুপের নিচে চাপা পড়ে গ্রামের অসংখ্য বাড়িঘর। অনেক মানুষ নিহত হলেও লাংটাং-এর মানুষ ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারা আবার চেষ্টা করছে নিজেদের ফিরে পেতে।

ট্রেকিং-এর রাস্তা আবার চালু হয়েছে। থাকার জন্য লজও এখন খোলা। ফলে চাইলেই আবার এই উপত্যকায় হাঁটা যায়। চারপাশে এখনও ধ্বংসযজ্ঞের দেখা মিললেও তাতে বিচলিত হবার কিছু নেই। স্থানীয় লোকেরা সহানুভূতি চায় না। তারা চায় লাংটাং ফিরে আসুক আগের মত করে। লাংটাং আবার মুখরিত হোক পর্যটকের আগমনে।

কেন যাবেন লাংটাং? . অভূতপূর্ব সৌন্দর্য :



মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, লাংটাং জাতীয় উদ্যান, নেপাল। ছবি : নেপাল ট্রেকিং
সত্যি বলতে ভূমিকম্প লাংটাং থেকে অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। ৮,০০০ মিটারের সেই উঁচু চূড়া আর নেই। তবু এখনও আপনাকে প্রায় ৭০০ মিটার ট্রেকিং করতে হবে। এর পূর্ব দিকের চূড়াটিতে পৌঁছতে প্রায় ৩ কিলোমিটার ট্রেক করতে হয়। তবে এই স্বল্প পরিসরেই আপনি নিজের চোখ শীতল করা কিছু দৃশ্য অবশ্যই দেখবেন।

মূল গ্রামটি, যার নাম ক্যানজন গোম্পা, চারপাশের বরফে ঢাকা পাহাড়ের ঠিক মাঝে অবস্থান করছে। এসব পাহাড়ের দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করে দিতে সক্ষম। এছাড়া আপনি যদি আরও খানিক এগিয়ে লাংশিসা খাকরার চূড়ায় যেতে পারেন মুগ্ধতা আরও অনেক বেশি বাড়বে একথা নিশ্চিত।

. সহজ রাস্তা লাংটাং ট্রেকিং যতটা সুন্দর, এর ট্রেকিং পথ ঠিক ততটাই সহজ। আপনি চাইলেই কাঠমুন্ডু থেকে হেঁটে লাংটাং যেতে পারেন।  হেলাম্বু পেরিয়ে লাংটাং হয়ে গোসাইনকুন্ডের পবিত্র দীঘি পর্যন্ত অসাধারণ পরিবেশে আপনি যেতে পারেন। 



লাংটাং ভ্যালির ঝুলন্ত ব্রিজ। ছবি : নেপাল গাইড ইনফো
যদিও দীঘির অবস্থান মূল লাংটাং উপত্যাকারও পরে। তবে সৌন্দর্য পিপাসু হলে আপনার উচিত গোসাইনকুন্ডের দীঘি ঘুরে আসা। এছাড়া আপনি চাইলে জিপে করে সায়াব্রু বেশি পর্যন্ত যেতে পারেন। এটি লাংটাং উপত্যকার নিচের ভূমি। এখান থেকে তিনদিনের ট্রেকিং শুরু হয়। তিনদিনের বেশ সহজ পথ অতিক্রম করে লাংটাং হয়ে ক্যানজিন গোম্পা পর্যন্ত যেতে পারেন আপনি।

. অসাধারণ বৈচিত্র : হেলাম্বু যত অতিক্রম করবেন বা লাংটাং-এর দিকে যত এগোবেন পরিবেশের বৈচিত্র্য তত বেশি আপনার নজরে আসবে।ট্রেকিং এর শুরুতে আপনার পথের চারপাশে অসাধারণ এর বন দেখতে পাবেন। সেই সাথে প্রচুর পাখি আর বানর। দেখবেন তামাং গ্রামের মানুষের করা জুম চাষ। এরপর কিছুটা পথে ঝরনা আর পাইন বনের সমারোহ। আর লাংটাং উপত্যকার কাছে যেতেই চোখে আসবে বরফ আর খোলা আকাশ। একসাথে এমন কিছু অপার্থিব সৌন্দর্যের সন্ধান দেয়ার জন্যেই সম্ভবত লাংটাং ট্রেকিং বেশ জনপ্রিয়।

. নির্জনতা :



কৃষিনির্ভর পাহাড়ি আদিবাসীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ছবি : কমিউনিটি ট্রেক
লাংটাং বেশ নীরব একটা ট্রেকিং পথ। এখানে অন্নপূর্ণা ট্রেকিং-এর মত চায়ের দোকানে পর্যটকের কোলাহল নেই। খুব সহজেই তাই আপনি নিজের মত করে ঘুরতে পারবেন সব জায়গা। স্থানীয় সমাজ ট্রেকারদের খুবই সমাদর করে থাকে। তাই নির্জন হলেও বিপদের ঝুঁকি এখানে নেই। ভ্রমণটাও তাই অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

লাংটাং-এর বুক থেকে এখনও ক্ষত সরে যায়নি। তবু জীবনের তাগিদে স্থানীয়রা চাইছে নিজেদের আবার গড়ে তুলতে। চাইছে ট্রেকিং পরিবেশ ফেরাতে। লাংটাং-এর অপার্থিব সৌন্দর্যে ভাটা আজও পড়েনি। পুরো পথটা তাই এখনও আপনাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।