গৌরনদীর শচীন ঘোষের লাল দই, বরিশাল
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : ঐতিহ্যবাহী ও কৃত্রিমতা বর্জিত গৌরনদীর শচীন ঘোষের লাল দই

ইতিহাস ও ঐতিহ্য
বর্তমানে এসব দোকানের বেশিরভাগজুড়েই বসেছে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত দইয়ের কারখানা। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী দইয়ের স্বাদ টিকিয়ে রাখতে পারিবারিক ব্যবসা এখনও ধরে রেখেছেন কয়েকজন। এদের মধ্যে রয়েছেন গৌরনিতাই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সত্ত্বাধিকারী শচীন্দ্র নাথ ওরফে শচীন ঘোষ, শ্রী দূর্গা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের গৌরাঙ্গ দাস ও শ্রী গুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সুশীল ঘোষ। তবে, সকল দোকানের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে শচীন ঘোষের দই এবং মিষ্টি। শচীন ঘোষের 'লাল দই' নামে পরিচিত এই দই মূলত গরুর খাঁটি দুধে তৈরি বলে স্বাদে অতুলনীয়। বলা হয়ে থাকে, লাল দইয়ের জন্ম প্রায় ১৮০০ সালের দিকে। শুরুতে শচীন ঘোষের দাদা লাল ঘোল তৈরি করতেন এই অঞ্চলে।আরও পড়ুন : শত বছরের ঐতিহ্য : মাগুরার খামার পাড়ার দই
সেখান থেকেই লাল দইয়ের চিন্তা। ৮০ বছর বয়স্ক শচীন ঘোষ প্রায় ৫৫ বছর এই দোকানের সাথে জড়িত। পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রেখে এখনও এই লাল দই নিজেই তৈরি করেন তিনি। দুধ কেনা থেকে শুরু করে বাজারজাত প্রায় সবই নিজেই তদারকি করে থাকেন। তার হাতের ছোঁয়ায় পূর্ণতা পায় দোকানের এসব মিষ্টান্ন। বরিশাল মূল শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের শহর গৌরনদী। বাসস্ট্যান্ডে নামার পরে ডান দিকে মোড় নিয়ে সামনে এগুতেই চোখে পড়বে গৌরনদী থানা। এই থানার উত্তর পাশেই গৌরনদী বন্দর। এই বন্দরেই দেখা পাওয়া যাবে দই মিষ্টির দোকানের। বন্দরের পাশঘেঁষে গৌরনদী উপজেলা বাজারের দুধপট্টি। এখানকার দুধ দিয়েই বানানো হয়ে থাকে এসব দই কিংবা মিষ্টি।
এই দুধ বড় কড়াইতে জ্বাল করা হয় মাটির চুলাতে। ঠাণ্ডা করার পর দুধ থেকে বাঁশের চাক দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে মাখন তুলে ফেলা হয়। বাকি দুধের সাথে চিনি মিশিয়ে আবারো চুলায় জ্বাল করা হয়। এই মিশ্রণের রঙ নির্দিষ্ট পরিমাণে লালচে হবার পর নামিয়ে ফেলা হয়। এ এক কেজি থেকে ছয় কেজির বিভিন্ন মাটির হাঁড়িতে এই মিশ্রণ ঢালা হয় দই পাতার জন্য। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'চাণক'। এই দইয়ের হাঁড়ির চারপাশে কচুরিপানা দিয়ে ২৪-৩০ ঘণ্টা অবধি রাখা হয়। এরপরে জমাট বেধে দইয়ে পরিণত হলে শুরু হয় বাজারে পাঠানোর প্রক্রিয়া।
আরও পড়ুন : মহিষের ঐতিহ্যবাহী টক দই, ভোলা
বিভিন্ন পার্বণের এই বাংলাদেশে অনুষ্ঠান কিংবা উপলক্ষের অভাব নেই। বিয়ে, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী, ঈদ, পূজাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো গৌরনদীর দই, মিষ্টি এবং ঘি মানুষকে তৃপ্তি দিয়ে আসছে। এখানকার দই আবহাওয়া ও তাপমাত্রা ভেদে ৬-১০ দিন অবধি ভাল থাকে। সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় সারা দেশের বিভিন্ন মানুষ নানা উপলক্ষ হাতে নিয়ে ভিড় জমান এই দোকানে। শুকনো মিষ্টি প্রায় এক মাস অবধি টিকে থাকে আর ঘি বছরব্যাপী। সঙ্গত কারণেই বিভিন্ন মিষ্টির দোকান এবং মানুষের কাছে এর চাহিদাও বেশ ঊর্ধ্বগামী। প্রতিদিন এই বন্দর বাজার থেকেই সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয় এখানকার দই এবং মিষ্টি।
বি:দ্র: যে কোন জায়গায় ঘুরতে গেলে সেখানকার পরিবেশ দূষিত হয় এবং অধিবাসীদের ক্ষতির কারণ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকা আমাদের কর্তব্য।
জোহরা মহসীন এস এম