উত্তরের রংপুর জেলাকে চেনেনা এমন কাউকে চেনা দায়। সেই রংপুর জেলার একটি উপজেলা তারাগঞ্জ। এই ছোট্ট উপজেলায়ও যে পুরনো ঐতিহ্যের খোঁজ পাব কখনও চিন্তা করিনি। প্লান মতো গত শনিবার এলাকার দুই ছোটভাইকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম তারাগঞ্জের ধোলাইঘাট নামক জায়গায়। যেখানে স্থানীয় দুইটি নদী ডালিয়া ও চিকলী নদীর মিলনস্থল। এই করোনাকালীন জায়গাটা ফাঁকা পাব ভেবেই ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম।
স্বাভাবিকভাবে তাই হলো, আমরা আমাদের বাসা থেকে সকাল দশটায় সাইকেলে করে রওনা দেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি আমরা তিনজন ছাড়া আর কোন জনমানব নেই। সঙ্গী হিসেবে আমাদের তিনজনের সাথে ছিলো কিছু গরু, ছাগল, মহিষ আর ভেড়া। অসাধারণ অনুভূতি হয়েছিলো সে সময়। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীতে ছিলাম। সেখান থেকে নিজ জেলায় এসেও হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলান ১৪ দিনের মতো। বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস নেবার জন্য মনটা কতোটা ব্যাকুল ছিল সেট ওখানে গিয়েই বুঝেছি।
ঘণ্টাখানিক ধোলাইঘাটেই সময় কাটালাম। তিনজন মিলে অসাধারণ মজা করেছি। ছোটভাইরা আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশিই ছিল। তাই ভ্রমণের শুরু থেকেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য ছিলাম। বেলা বারোটায় আমরা ভ্রমণ শেষে একটা স্থানীয় হোটেলে নাস্তা করে ফিরে আসতে চেয়েছিলাম নিজ গন্তব্যে। কিন্তু হোটেলে কিছু স্থানীয় লোকের সাথে গল্প করেই জানতে পারি শ্যামগঞ্জ নামক জায়গায় একটা পুরনো জমিদার বাড়ি রয়েছে।
শ্যামগঞ্জ জমিদার বাড়ির সম্মুখে লেখক
ধোলাইঘাট থেকে জমিদার দূরত্ব ৬ কিলোমিটারের মতো। তিনজনের স্বাদ জাগলো সেখানে যাবার জন্য। তিনজনের সম্মতিতেই রওনা দিলাম শ্যামগঞ্জের এলাহীবাজারে। সেখান থেকে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় আমরা আরিচা পাড়া গ্রামে সেই শতবর্ষী জমিদার বাড়ি পৌঁছাই।
পৌঁছানোর পর যা দেখলাম তা আসলেই মনকে ব্যথিত করবে। এই জমিদার বাড়িটা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। একটু রক্ষণাবেক্ষণ করলেই এই জমিদার বাড়িটি হতে পারতো পর্যটকদের নিদর্শন। আমাদের কাছে মনে হয়েছে আমরাই প্রথম সেই জমিদার বাড়িটিতে দেখার জন্য ২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে এসেছি।
স্থানীয়দের সহযোগিতায় জানতে পারি এই জমিদার বাড়িটি ১৮২৬ সালে তৈরি হয়েছিল। এখনও এই বাড়িটির কারুকার্য মুগ্ধ করার মতো। ছোট ছোট ইট দিয়ে কত নিখুঁতভাবে তিনতলা জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয়েছিল। জমিদার বাড়ির তিনটি ভবন ছিল। এখন সেখানে একটি ভবনের চিহ্ন বোঝা যায় ।
জমিদার বাড়ির অদূরেই রয়েছে একটি মন্দির। যেখানে এখনও স্থানীয় জনগণ পূজা করে থাকে। সময়ের সাথে সাথে এই পুরনো নিদর্শনগুলো এভাবেই অযত্নে-অবহেলায় হারিয়ে যায় কালের অতল গহ্বরে।
ধ্বংস্তুপে পরিণত হওয়া জমিদার বাড়িটি বর্তমানে এভাবেই ঝোপজঙ্গলে ঢাকা; ছবি : লেখক
আপনারা চাইলেও যেতে পারেন এই পুরনো নিদর্শনটা ঘুরে আসতে। আমরা নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শহর থেকে তিনজন সাইকেল নিয়ে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলোজির পাশ দিয়ে শাইল্যার মোড় নামক রোড দিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে।
শাইল্যার মোড় থেকে ১০ কিলোমিটার দূরেই ধোলাইঘাট। এরপর সেখান থেকে শ্যামগঞ্জ আরও ১০ কিলোমিটারের পথ। এলাহী বাজার থেকে বামে কিছুদূর এগিয়ে গেলেই মিলবে জমিদার বাড়ি। এছাড়া শাইল্যার মোড় থেকে সরাসরি অটোচালিত ভ্যান, ইজিবাইকে ৮০ টাকা ভাড়া দিয়েও সরাসরি যেতে পারবেন জমিদার বাড়ি। স্থানীয়রা এই জমিদার বাড়িকে ভাঙ্গা হিন্দুবাড়ি নামেই বেশি চিনে থাকে।