বিভিন্ন জেলার সূর্যমুখী ফুলের বাগান

ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল: বাণিজ্যিক সুবিধার প্রসারের কারণে দেশের নানা জায়গাতেই চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী ফুল


সূর্যমুখী ফুল

দেশের বিভিন্ন স্থানেই বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী, পাশাপাশি এইসব জায়গায় বাড়ছে পর্যটকদের আনাগোনাও; ছবি : সংগৃহীত


নীল আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা প্রজ্বলিত সূর্যের দিকে মুখ তুলে হাসছে মিষ্টি হলুদ রঙের মায়াবতী সূর্যমুখী। সূর্যমুখী হাসে, আর তার হাসিতে প্রকৃতি অপরূপ রূপে সাজে। সূর্যের আলো পৃথিবীতে উঁকি দিলেই এই ফুল সূর্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে হেসে ওঠে। আর এই মায়াময়ী হলুদ ফুলের বাগানে খেলে, উড়ে বেড়ায় নানান রঙের প্রজাপতি। মৌমাছি ভনভন করে ভিড় জমায় মধু সংগ্রহের জন্য। তবে সূর্যমুখী যে শুধুই প্রকৃতির শোভা, সৌন্দর্য বাড়ায় তাই নয়, বরং এর রয়েছে আরও অনেক গুণাগুণ। এই ফুল থেকে যে তেল পাওয়া যায় তার গুণগত মান এক কথায় অনন্য। পুরো বিশ্বে সূর্যমুখী তেলের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। এই চাহিদার কথা বিবেচনা করেই ৬০ দশকের দিকে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছিলো সূর্যমুখী ফুলের চাষ।

আরও পড়ুন : সাবদি : যে গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ফুলের গাছ

এখন সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এই একবর্ষী সূর্যমুখী ফুলের চাষ। তবে উত্তরবঙ্গের জেলা গুলোতে সূর্যমুখীর চাষ তুলনামূলকভাবে বেশি। সূর্যমুখী ফুলের কোনও অংশই বলতে গেলে ফেলনা নয়। এই ফুল থেকে তেল ছাড়াও এর খৈল দিয়ে মাছের খাবার এবং এই ফুলের গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর এই ফুলের বীজে ৪০-৪৫ শতাংশ লিনলিক এসিড থাকে এবং এর থেকে তৈরি তেলে ইউরিক এসিড না থাকায় তা হার্টের রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। চাইলে এই সূর্যমুখী ফুলের বাগানগুলো ঘুরে দেখে আসতে পারেন।

মৌলভীবাজার 

সূর্যমুখী ফুল

ছবি: সংগৃহীত


মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পানিশালা গ্রামে প্রায় এক বিঘা জমিজুড়ে চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী ফুল। সৈয়দ জামাল হোসেন নামের একজন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বিনামূল্যে পান সূর্যমুখী ফুলের সার ও বীজ। তা নিয়েই এক বিঘা জায়গা লিজ নিয়ে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করছেন। সোনা রোদে এই সূর্যমুখীগুলোর হাসি দেখতে ঘুরে আসতে পারেন জামাল হোসেনের বাগান থেকে।

ফরিদপুর

ফরিদপুর শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে ডোমরাকান্দি গ্রাম অবস্থিত। এই গ্রামের পাশ দিয়েই তৈরি হয়েছে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক। আর এই মহাসড়কের পাশেই চোখে পড়বে দুই একর জায়গা বিস্তৃত নয়নাভিরাম সূর্যমুখীর হলুদ বাগান। সরকারি উদ্যোগেই এখানে সূর্যমুখী ফুলের চাষ হয়। বাগানটি তৈরি হয়েছে বীজ ভবনের নিজস্ব জমিতেই আর এর তত্ত্বাবধায়ক বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন। শুধুমাত্র বীজ সংগ্রহ করার লক্ষ্য নিয়েই প্রায় এক যুগ সময়কাল সূর্যমুখী ফুল চাষ করা হচ্ছে এখানে।

এই সূর্যমুখী বাগান থেকেই পুরো দেশের 'ডাল তেলবীজ' খামারগুলোতে সরবরাহ করা হয় বীজ। এই বাগান দেখা-শোনার সার্বক্ষণিক দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন মালী এনায়েত হোসেন। প্রায় এগারো বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। বাঁশ দিয়ে বানানো একটি চোঙা নিয়ে ভিন্ন রকম শব্দ করে পাখি তাড়ানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন তিনি। প্রায় ২০ হাজার সূর্যমুখী ফুলের এই বাগান বেলা বাড়তে থাকার সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে ওঠে দেখতে আসা লোকজনের আনাগোনায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া



ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় সূর্যমুখী ফুলের চাষ হচ্ছে; ছবি : সংগৃহীত


এই জেলার নয়টি উপজেলায় প্রায় ৩০০ বিঘা বা ৪০ হেক্টর জমিতে হাইসান-৩৩ জাতের সূর্যমুখী ফুলের চাষ করছেন কৃষকরা। সূর্যমুখী ফুল থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনই এই ফুল চাষ শুরুর মূল লক্ষ্য। আশুগঞ্জের বিভিন্ন সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নানান প্রদর্শনী প্লটে গিয়ে দেখতে পারবেন সূর্যমুখী ফুল। চারিপাশে চোখ ঘুরালেই দেখা যায় হলুদ ফুলের স্নিগ্ধ হাসি আর ফুলের মৌ মৌ গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে জড়ো হওয়া মুখরিত মৌমাছির দল। এটি যেন ফসলী জমি নয়, এ এক দৃষ্টি নন্দন বাগান। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকনে শুধু প্রকৃতি প্রেমীই নয় বরং যে কারো হৃদয় কাড়বে।

আরও পড়ুন : সূর্যমুখী ফুলেদের সাথে একদিন

কুড়িগ্রাম

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর মাধবরাম গ্রামে প্রায় সাত একর পতিত অনাবাদী জমিকে কাজে লাগিয়ে সূর্যমুখী ফুল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। এই গ্রামে চাষ করা সূর্যমুখী ফুল থেকে তেলের পাশাপাশি তৈরি হয় পাখির খাবারও। দ্বীপ এবং চরগুলোতে কৃষি বিভাগের প্রণোদনার মাধ্যমে বেশ খানিকটা জমিকে সূর্যমুখী ফুল চাষ করে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে এলাকার চিত্র। প্রতিদিনই এখানে সূর্যমুখী ফুল দেখতে চলে আসেন পর্যটকরা।

রাঙামাটি 

সূর্যমুখী ফুল

রাঙামাটিতে কাপ্তাই হ্রদের পাশেই রয়েছে এই সূর্যমুখী ফুলের বাগান; ছবি : সংগৃহীত


রাঙামাটির বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণা এলাকার কাপ্তাই হ্রদের পাড়ঘেঁষে প্রায় ৬০ হেক্টর জমির বাগানে সকালবেলা নরম রোদে চোখ মেলে ঝলমল করে ওঠে সূর্যমুখী ফুলগুলো। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মাইলের পর মেইল দিগন্তজোড়া ক্ষেতে চাষ হয় সূর্যমুখী ফুল। কম খরচে বেশি লাভ! এই আশা নিয়েই সূর্যমুখী ফুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন বরকল উপজেলার কৃষকরা। এখানকার কৃষকরা তামাকের চাইতে এখন সূর্যমুখী চাষের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। কারণ সূর্যমুখী ফুলের ফল এবং বীজ দুটোই বিক্রি করে তারা উপার্জন করতে পারেন।

খুলনা 

খুলনা জেলার উপকূলবর্তী উপজেলা কয়রায় সূর্যমুখী ফুলের চাষে সফলতা এসেছে লবণাক্ত পতিত জমিতে। স্বল্প খরচেই বাম্পার ফলনের মাধ্যমে লাভবান হওয়ায় আশাবাদী কৃষকরা। ধান লাগানোর পর আমন মৌসুমে জমিগুলো এমনিই পড়ে থাকতো। পরবর্তীতে কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগিতায় সেই পড়ে থাকা জমিগুলোতে শুরু হয় সূর্যমুখী ফুলের চাষ। ফলনও বেশ ভালোই হয় দেখে এলাকার বাকি কৃষকরাও সূর্যমুখী ফুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কৃষি বিভাগের মতে, সূর্যমুখী চাষে অনাবাদী জমির পরিমাণ তো কম্বেই সাথে স্থানীয় সূর্যমুখী তেলের চাহিদাও পূরণ হবে। কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের চন্ডীপুর গ্রাম এবং দুই নম্বর কয়রার এক হেক্টর জমিতে শোভা পেয়েছে হলুদের অপরূপ সৌন্দর্য।

ফারিয়া এজাজ   এস এম 


Click Here To See More