প্রত্যেক দেশের স্বতন্ত্র একটা প্রতীক থাকে, যা সেই দেশটিকে তুলে ধরে বিশ্ব দরবারে। এই যেমন ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, ব্রাজিলের ক্রাইস্ট ডে রিদিমার। ঠিক তেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামের সঙ্গে এমন একটি প্রতীক জড়িত। দেশটির নামের সাথে সবার কল্পনায় ভেসে ওঠে একটি ভাস্কর্যের ছবি। নিউ ইয়র্ক হারবারের বুকে ৩০৫ ফিট ৬ ইঞ্চি উঁচু ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ ভাস্কর্যটি পারতপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনন্য এক নিদর্শন হিসেবেই আমাদের মনস্পটে ভেসে ওঠে।
শত শত বছরের কালো ইতিহাসকে পেছনে ফেলে বিশ্বের বুকে আমেরিকার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক বার্তাই যেন দেয় এই ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটি 'স্ট্যাচু অফ লিবার্টি' নামে পরিচিত হলেও এর প্রকৃত নাম 'লিবার্টি এনলাইটেনিং দ্য ওয়ার্ল্ড'।
এযাবতকালে বহু লোকের নিরলস পরিশ্রম ও ধৈর্যের ফসল এই ভাস্কর্য আজ মার্কিনীদের জাতীয়তাবোধের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ভাস্কর্যটি মার্কিনীদের স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেই আজ দাঁড়িয়ে আছে। এটি ছিল বন্ধু রাষ্ট্র ফ্রান্সের জনগণের পক্ষ থেকে মার্কিনীদের জন্য একটি উপহার।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্ক। ছবি : পিন্টারেস্ট
ইতিহাস
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ১৭৬৫ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত চলা মার্কিন স্বাধীনতা সংগ্রামে সময়টিতে সাহায্য করেছিল ফ্রান্স। সেই সহযোগিতার স্মৃতি হিসেবে আমেরিকার স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তিতে এটি নির্মাণ করা হয়। আর সেই মূর্তিই আজ পরিণত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবিতে।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি ছিল ফ্রান্স ও আমেরিকার যৌথ প্রয়াস, দু'দেশের মানুষের মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্বের স্মরণ করার উদ্দেশ্যে। আনুমানিক ১৮৬৫ সালের দিকে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির সাথে সাথে ফরাসি রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী এডওয়ার্ড ডে ল্যাবুলে বলেন, ‘যদি আমেরিকার স্বাধীনতা সম্পর্কিত কোনো স্মৃতিফলক তৈরি করা হয়, তাহলে তা হওয়া উচিত আমেরিকা এবং ফ্রান্সের একটি সম্মিলিত প্রকল্প।’
এডুয়ার্ড দে ল্যাবুলে তার দেশের সরকারের কাছে একটি মূর্তি তৈরি করে উপহার দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি কমিশন গঠন করা হয় এবং ফ্রান্সের তৎকালীন লার্জস্কেল ভাস্কর্যের জন্য পরিচিত ভাস্কর ফ্রেডরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হোন।
এডুয়ার্ড দে ল্যাবুলে (ডানে) এবং ফ্রেডরিক অগাস্ট বার্থোল্ডি (বামে)। ছবি : সংগৃহীত
মূর্তির জন্য তহবিল সংগ্রহ
এডওয়ার্ড ল্যাবুলে ছিলেন এক কথায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধভক্ত। আমেরিকাকে তিনি দেখতেন ভালো এবং উৎকৃষ্ট কিছুর উদাহরণ হিসেবে। তৎকালীন আমেরিকার গৃহযুদ্ধের ফলাফল, দাসপ্রথার বিলুপ্তি এবং ৪ মিলিয়ন ক্রীতদাসের মুক্তির ব্যাপারে তিনি ছিলেন অনেক উচ্ছ্বসিত। স্বাভাবিকভাবেই তিনি দেশটির জন্য কিছু করবার তাগিদ অনুভব করছিলেন।
মূর্তির জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কারণে ১৮৭৫ সাল নাগাদও ভাস্কর্যের কাজ শুরু হয়নি। বার্থোল্ডির ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি এনলাইটেনিং দা ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক ভাস্কর্যে এক নারী তার ডান হাতে টর্চ ধরা আর অন্য হাতে একটি ট্যাবলেট চিত্রিত করা। ট্যাবলেটের ওপর ৪ঠা জুলাই, ১৭৭৬ সাল তারিখটা খোদাই করা আছে। এই তারিখে আমেরিকার স্বাধীনতাপত্রটি গৃহীত হয়েছিল।
এরপরে ১৮৭৫ সালে ল্যাবুলে 'ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান ইউনিয়ন' গঠনের মাধ্যমে ২ লক্ষ ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার বার্থোল্ডির হাতে তুলে দেন ভাস্কর্যের কাজ শুরু করার জন্য। বার্থোল্ডি তখন গুস্তাভে আইফেলের সাথে পরামর্শ করে এর গঠন ও আকার ঠিক করেন। তবে, এই ২ লক্ষ ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার কিন্তু এত সহজে আসেনি।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্ক। ছবি : সংগৃহীত
ফ্রাঙ্কো-আমেরিকান ইউনিয়ন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, মূর্তির ভিত গঠনের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন, তা তোলা হবে মার্কিনীদের কাছ থেকেই এবং জনবল সরবরাহ করবে ফ্রান্স। কিন্তু মার্কিন নাগরিকদের থেকে আশানুরূপ সাড়া মিলছিল না। বিশেষ করে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের এ ব্যাপারে যেন কোনো আগ্রহই ছিল না।
১৮৭৬ সালে মার্কিনীদের আগ্রহী করে তোলার জন্য বার্থোল্ডি মূর্তিটির হাত এবং মশাল পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় একটি প্রদর্শনীতে উন্মোচন করেন। সেখানকার লোকেরা এর ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখান। তারা জানতে চান, মূর্তিটির বাকি অংশ কবে শেষ হবে। তাদেরই আগ্রহের কারণে পেনসিলভেনিয়ার মেডিসন স্কয়ারে হাত এবং মশালের আরেকটি প্রদর্শনী করেন। সেখানকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পেয়ে তিনি বরং ভাবতে লাগলেন, স্বপ্নের ভাস্কর্যটি নিউ ইয়র্কের বদলে পেনসিলভেনিয়াতেই স্থাপন করা যায় কিনা।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্ক। ছবি : সংগৃহীত
ফ্রান্সের কিংবদন্তী আলেক্সান্দ্রে গুস্তাভে আইফেল বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার নির্মাণের জন্য স্টিলের একটি কাঠামো তৈরি করেছিলেন। কিন্তু স্ট্যাচু অফ লিবার্টি নির্মাণের জন্য বার্থোল্ডি হাতুড়ে তামার শিট দিয়ে মূর্তিটি তৈরি করে আমেরিকায় পাঠান।
স্থাপন
এরপরে নিউ ইয়র্ক উপসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপে আমেরিকান-নকশাকৃত পাদদেশের উপরে স্থাপন করা হয়েছে ভাস্কর্যটি। বর্তমানে এই দ্বীপটি লিবার্টি দ্বীপ হিসাবে পরিচিত। ১৮৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডকে উত্সর্গ করা হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী নিকটবর্তী এলিস দ্বীপ হয়ে আমেরিকা এসে পৌঁছায়, যার সাক্ষী হয়ে আছে এই এই মূর্তিটি।
প্রায় ২০৪ মেট্রিক টনের এই মূর্তিটি ৯৩ মিটার লম্বা। পুরো মূর্তির মধ্যদিয়ে একটি সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়েছে যেটা দিয়ে মাটি থেকে একদম ওপরের মশাল পর্যন্ত যাওয়া যায়। প্রতিবছর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ স্ট্যাচু অব লিবার্টি দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে আসেন। এই মূর্তিটির মাথায় অলংকারের মত দেখতে সাতটি সূচালো লোহা বের হয়ে আছে, এগুলো আদতে সাতটি মহাসমুদ্রের প্রতি ইঙ্গিত করেই তৈরি করা হয়েছে।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্ক। ছবি : সংগৃহীত
১৯৮৪ সালের দিকে এই মূর্তিটির মশালটি পরিবর্তন করা হয়েছিল। পূর্বের সাধারণ লোহার পরিবর্তে সেখানে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি একটি মশাল প্রতিস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৮৬ সালে যখন এই মূর্তিটি স্থাপন করা হয় তৎকালীন এই স্ট্যাচু অব লিবার্টি ছিল পৃথিবীর সবচাইতে বড় লোহার তৈরি মূর্তি।
এই স্ট্যাচুর আরেকটি মজার বিষয় হল ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে কোনও ঝড়ো বাতাস যখন এই মূর্তির গায়ে আছড়ে পড়ে তখন মূর্তিটি ৩ ইঞ্চি ও টর্চটি ৫ ইঞ্চি পর্যন্ত নড়তে থাকে। প্রতিবছর স্ট্যাচু অফ লিবার্টি প্রায় ৬০০ বজ্রপাত সহ্য করে টিকে আছে। আর এই চমৎকার দৃশ্যটি ২০১০ সালের দিকে একজন ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন।
স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্ক। ছবি : সংগৃহীত
স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে ইমিগ্রেশন এর প্রতীকও বলা হয়ে থাকে, কেননা উনিশ শতকের দিকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ সমুদ্রপথে যখন যুক্তরাষ্ট্র পাড়ি জমান তখন এই মূর্তিটির সবার প্রথমে চোখে পড়ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রগামী পর্যটকদের একটা বড় অংশের আগ্রহের কেন্দ্র এই ভাস্কর্যটি। বিশেষ করে নিউ ইয়র্কে যাওয়া ভ্রমণকারীদের অধিকাংশই এই ভাস্কর্য ঘুরে দেখতে ভোলেন না।