ঐতিহাসিক রাজা হরিশ্চন্দ্র পাঠ, নীলফামারী

ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই হরিশ্চন্দ্র পাঠ



হরিশ্চন্দ্র পাঠ, নীলফামারী

ছবি : সংগৃহীত


নীলের দেশ নামে খ্যাত নীলফামারী জেলা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি জেলা। প্রায় ২০০ বছর পূর্বে এই অঞ্চলে নীলের চাষ শুরু হয়। নীল চাষের উপযুক্ত হওয়ায় এখানে ইংরেজ নীলকরেরা জড়ো হয় এবং নীলকুঠী স্থাপন করে। ধারণা করা হয়, নীলফামারী নামকরণের পেছনে রয়েছে নীল চাষের প্রাচুর্যতা এবং নীলকুঠী। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় নানান ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থাপনা রয়েছে। হরিশ্চন্দ্র পাঠ এর মধ্যে একটি। রাজা হরিশ্চন্দ্রের নাম অনুসারে নামকরণ-কৃত হরিশ্চন্দ্র পাঠ নীলফামারী জেলার একটি গ্রাম। গ্রামটি জলঢাকা উপজেলার খুটামারা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। কথিত আছে, রাজা হরিশ্চন্দ্র নামে এক রাজা এখানে রাজত্ব করতেন। স্থানীয়দের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিলো দানবীর হিসেবে।

জনকল্যাণে নিয়োজিত রাখা এই রাজার আমলের নানা ইতিহাস ছড়িয়ে আছে এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার মধ্যে। তার মধ্যে একটি হরিশ্চন্দ্রের পাট বা ধাপ নামে পরিচিত। চড়াল কাটা নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত রাজা হরিশ্চন্দ্রের পাঠ। প্রায় ১ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত উঁচু মাটির একটি ঢিবি বলে মনে হয়। শোনা যায়, এক সময় এই ঢিবি নাকি উচ্চতায় ৫০-৬০ ফুট পর্যন্ত ছিলো। বিবর্তণের ধারায় সেটা এখন প্রায় ১০ ফুটের মতো উচ্চতা ধারণ করে আছে। উঁচু এই স্থানটি ৫টি কালো পাথর খণ্ড দিয়ে ঘেরা। রাজা হরিশ্চন্দ্র এখানে একটি শিব মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু করলেও সেটা অসমাপ্ত থাকে। এক সময় এখানে কিছু মূর্তি ছিলো বলে শুনা যায়। যদিও এখন আর তা নেই। শিব মন্দিরে বছরে তিনবার করে পূজা অর্চনা ও উৎসব পালন করা হয়।

লোকমুখে প্রচলিত ঘটনা

এই শিব মন্দির নিয়ে এখানে কিছু কিংবদন্তিও শোনা যায়। প্রাচীন অনেক স্থাপনা নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত এসব ঘটনা যুগের পর যুগ বংশপরম্পরায় মানুষের মুখে মুখে পরিবর্তিত ও আরও রসালো হয়ে বেঁচে থাকে যেমন। তেমনই এই মন্দির নিয়েও কিংবদন্তি এখানে মানুষের মনে বিশ্বাস এর জায়গা নিয়ে নিয়েছে। শোনা যায়, এই মন্দির সংলগ্ন জায়গা হতে কেউ যদি কোন মাটির টুকরা, ইট বা পাথর যাই নিক না কেনো সে ব্যক্তি অভিশপ্ত হয়। তার নাক মুখ দিয়ে রক্তপাত হয় এবং তাতে সে মৃত্যুবরণ করে। আরও একটি ঘটনা প্রচলিত আছে। তা ব্রিটিশ শাসন আমলের। ব্রিটিশ সরকার এখানে কানে খননের জন্য ১২৫ জনকে নিযুক্ত করলে খননের ৩য় দিন তারা এখানে মন্দিরের দরজা খুঁজে পান।

৮ জন লোক দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দরজার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনার পরদিন খনন কাজ বাদ দিয়ে তারা ফিরে যান তবে মন্দিরে বন্ধী ঐ ৮ জনের কি হয়েছিলো সেটা আর জানা যায় নি। হরিশ্চন্দ্র পাঠ ছাড়াও নীলফামারীর উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে নাটখানা নীলকুঠী, খ্রিষ্টান সমাধিক্ষেত্র, আঙ্গোরা মসজিদ ও মাজার, চিনি মসজিদ, হাজী তালেঙ্গা বসুনীয়া মসজিদ, ক্যাথলিক গির্জা, মর্তুজা ইন্সটিটিউট, নীলফামারী জাদুঘর ও নীল সাগর সহ অন্যান্য। (উল্লেখ্য যে, ঢাকার সাভারেও রাজা হরিশ্চন্দ্রের প্রাসাদ নামে একটি রাজবাড়ী বা ঢিবি রয়েছে। এটি খ্রিস্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতকে নির্মিত একটি রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। নীলফামারীতে অবস্থিত হরিশ্চন্দ্রের পাঠ আর সাভারের হরিশ্চন্দ্রে ঢিবি বা রাজবাড়ী একই রাজার কিনা সে ব্যাপারে ইন্টারনেটে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় নি।)

যেভাবে যাবেন :

ঢাকার কলেজগেট, গাবতলী ও মহাখালী হতে বাস বা কমলাপুর রেলওয়ে ষ্টেশন হতে ট্রেনে করে নীলফামারী যেতে পারেন। জেলা শহর থেকে তারপর বাস/সি এন জি বা অটোরিকশায় খুটামারা ইউনিয়নের হরিশ্চন্দ্র পাঠে যেতে পারেন।  

সাখাওয়াত হোসেন   এস এম